আগামীকাল ঘোষণা

নতুন বাজেটে ১২ চ্যালেঞ্জ

নতুন বাজেটে ১২ চ্যালেঞ্জ

যুদ্ধের ডামাঢোলে অনেকটাই টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি। যার প্রভাব পড়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে। এমন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সরকারকে হাঁটতে হচ্ছে বড় ব্যয়ের পথে। দিতে হচ্ছে বড় বাজেট। যার মধ্য দিয়ে অর্থনীতির আকার বাড়ছে সাড়ে সাত শতাংশ হারে। লক্ষ্য অচেনা চ্যালেঞ্জের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়ানো। প্রতিবছর বাজেট বাস্তবায়নের রাস্তায় অনেক চ্যালেঞ্জ থাকে সরকারের। কিন্তু এবারের চ্যালেঞ্জের গতি-প্রকৃতি অনেকটাই আলাদা। বিশ্ব অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার। আগামীকাল অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন। এই বাজেটে সামনের দিনগুলোর জন্য যে বেশ বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, এর আভাস দিয়েছেন খোদ অর্থমন্ত্রীও। নতুন বাজেটের চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম সমন্বয়, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, ব্যাংকের সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে রাখা, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, বাজেট ঘাটতি কমানো, ভর্তুকির লাগাম টেনে ধরা, কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়ন করা, নিত্যপণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা, নতুন দারিদ্র্য ঠেকানো এবং প্রবাসী আয় বাড়ানো। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বর্তমান বিশ্ববাজার পরিস্থিতি নিয়ে একটি রূপরেখা তৈরি করেছে। সেই রূপরেখার একটি অংশে উলেস্নখ করা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাজারের পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ জন্য আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে খাদ্য, জ্বালানি ও সারের আমদানির জন্য ভর্তুকি সরকারকে বেশ চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কারণ, আগামী অর্থবছরে বিভিন্ন খাতের মোট ভর্তুকি প্রাক্কলন করা হচ্ছে ৮২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৯ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি ইউরিয়া সারের দামও বেড়েই চলেছে। সয়াবিন তেল ও গম আমদানিতেও খরচ বেড়েছে। শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্য ও পরিবহণের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ভর্তুকির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। আগামী বাজেটে সরকারের জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। এর পাশাপাশি রয়েছে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম। এখনই জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ালেও যুক্তি দেখিয়ে অদূর ভবিষ্যতে দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে। ভর্তুকির টাকায় কীভাবে লাগাম টেনে ধরা যায়, তা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতি ডলারের নতুন দাম বেঁধে দিয়েছে ৯১ টাকা ৯৫ পয়সা। ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের থেকে ডলার কিনেছে ৯৩-৯৪ টাকায়। আর খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে ৯৫-৯৬ টাকায়। ব্যাংক ও খোলাবাজারে ডলারের বিনিময় হারের এই পার্থক্য বৈধভাবে প্রবাসী আয় দেশে ফেরানোর বড় বাধা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্যাংকে টাকা কম পেলে প্রবাসীরা হুন্ডিতে রেমিট্যান্স পাঠাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এতে তারা ডলারপ্রতি দুই-তিন টাকা বেশি পান। এখন হুন্ডি থেকে বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় ফেরানোটাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে এ ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলে চলমান অর্থনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ হুন্ডির কাছে টিকছে না উলেস্নখ করে মালয়েশিয়া প্রবাসী আবদুল জাব্বার বলেন, 'বিদেশ থেকে টাকা পাঠাতে হলে ব্যাংক কর্মকর্তারা যেসব প্রশ্ন করেন, এর উত্তর দেওয়ার ভয়ে অনেকে ব্যাংকে যেতে চান না। তার কাছে তখন সহজ সমাধান হয়ে ওঠে হুন্ডি। এখন এটা আরও সহজ। দেশে হুন্ডির স্থানীয় এজেন্টরা টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে পাঠিয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়া এতটাই সহজ যে, এতে করে সরকারি প্রণোদনাও অনেকে প্রয়োজন মনে করেন না। কারণ, হুন্ডিতে ওই বাড়তি টাকা তার পরিবার পেয়েই যায়। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ডক্টর জাহিদ হোসেন বলেন, বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দামে অনেক দিন ধরে অস্থিরতা চলছে। যেসব পণ্য আমাদের আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়, স্বাভাবিকভাবে সেগুলোর আমদানি খরচও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের স্বস্তি দিতে হলে তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একটি হলো- আমদানি করা যেসব নিত্যপণ্যে রোজার আগে শুল্ক-করে ছাড় দেওয়া হয়েছে, তা আরও কিছু সময় অব্যাহত রাখা। দুই. নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে ঋণপত্র খোলা ও আমদানি ব্যয় মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ডলারের বিনিময় মূল্য ঠিক রাখা। তিন. সরবরাহ ঠিক রাখতে পদক্ষেপ নেওয়া। এই তিন বিষয় নিশ্চিত করা গেলে পণ্যের দামে কিছুটা হলেও স্বস্তি মিলতে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও বাজেটে তিন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এগুলো হলো- সরবরাহ ব্যবস্থাপনার উন্নতি করা, চাহিদার চাপ কমানো ও গরিব মানুষের জীবিকার সংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়া। আর ডলারের সংকট কাটাতে এর দর বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই সর্বোত্তম বিকল্প। কয়েক মাস ধরেই মূল্যস্ফীতি বেশ চড়েছে। গত ফেব্রম্নয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের ওপরে আছে। গত পাঁচ-ছয় বছরে এমন দেখা যায়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর (বিবিএস) সর্বশেষ গত এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। এটি গত দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ হয়েছিল। আগামীকাল নতুন অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোর জন্য আমদানি খরচ কমাতে ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখাটাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, ডলারের দাম বেঁধে দিলে হুন্ডি বা অন্য কোনো চ্যানেলে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেড়ে যেতে পারে। অপরদিকে করোনাকালে দেশে তিন কোটির বেশি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েছিল। করোনার প্রকোপ কমায় এই সংখ্যা কমে যায়। তবে সাম্প্রতিক সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় দেশে ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েছে। বেসরকারি সংগঠন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (বিআইজিডি) গবেষণায় এই চিত্র পাওয়া গেছে। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিলস্নুর রহমান বলেন, 'করোনার পর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। নতুন দরিদ্র মানুষের পরিস্থিতির উন্নয়ন হচ্ছে না। দরিদ্র মানুষ টিকে থাকার চেষ্টা করছে স্বশোষণ করে। খাওয়া কমিয়ে, কাজের সময় বাড়িয়ে এই প্রচেষ্টা চলছে। বাজেটে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। এক বছরে সরকার যত টাকা খরচ করে, এর রূপরেখা জাতীয় সংসদে পেশ করা হয় বাজেটে। আসছে অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন ঋণের সুদ পরিশোধ আর ভর্তুকিসহ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় খরচ ধরা হয়েছে চার লাখ ৩১ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। আর উন্নয়ন কর্মকান্ডে বরাদ্দ রাখা হয়েছে দুই লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট হতে পারে ছয় লাখ ৭৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। যা চলতি বছরের চেয়ে ৭৪ হজার কোটি টাকা বা সোয়া ১২ ভাগ বেশি। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, আসছে অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরকে তিন লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য দেওয়া হবে। আর কর ব্যতীত আয় আসবে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। সব মিলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজেটে আয়ের সংস্থান ধরা হয়েছে চার লাখ ৩৩ হজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে বাজেটের দুই লাখ ৪৪ হজার ৮৬৪ কোটি বা মোটের এক তৃতীয়ংশই ধার করে মেটাতে হবে সরকারকে। সরকারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির আকার হবে ৪৪ লাখ ১২ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। আর জিডিপির লক্ষ্য ধরা হতে পারে ৭ দশমিক ৫ ভাগ। সেই সঙ্গে মূল্যস্থিতি ৫ দশমকি ৫ ভাগে আটকে রাখার পরিকল্পনা থাকবে। আগামীকাল অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করবেন। এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম হতে যাচ্ছে 'কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন'।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে