‘২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিউট্রাল দেশে রূপান্তরে নেতৃত্ব দিতে হবে বাংলাদেশকে’

প্রকাশ | ১৭ এপ্রিল ২০২১, ১৬:৫০

যাযাদি রিপোর্ট

 

 

 

 

ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (সিভিএফ)-এর সদস্য দেশগুলোকে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিউট্রাল দেশে রূপান্তরের নেতৃত্ব দিতে হবে বাংলাদেশকে। নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন অংশীজনের আকাক্সক্ষা এবং প্যারিস এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী এনহ্যান্সড এনডিসি তৈরি করে কার্বন নিউট্রাল বিশ্ব গঠনেও বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখতে হবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

বৃহস্পতিবার সকালে ‘সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ (সি.পি.আর.ডি) এবং ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়া-বাংলাদেশ-এর যৌথ উদ্যোগে ‘এনহ্যান্সড এনডিসি’কে প্যারিস এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী তৈরীকরণ এবং সভাপ্রধান রাষ্ট্র হিসেবে ‘ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামে বাংলাদেশের ভূমিকা’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বিশেজ্ঞরা এসব কথা বলেন।  এ সময় এনহ্যান্সড এনডিসি প্রণয়ন চূড়ান্তকরণের জন্য সুপারিশ করেন তারা।

 

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সি.পি.আর.ডি.’র নির্বাহী প্রধান সামছুদ্দোহা। এ সময় লিখিত বক্তব্যে সামছুদ্দোহা বলেন, প্যারিস চুক্তির মূল লক্ষ্যই ছিল পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে বৈশি^ক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে শিল্প বিপ্লব পূর্ব সময়ের থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে সীমাবদ্ধ রাখা এবং এটি একমাত্র অর্জন করা সম্ভব। যদি রাষ্ট্রগুলো তাদের এনহ্যান্সড এনডিসি যথাযথভাবে তৈরি করে জমা দেয়। এক্ষেত্রে বৈশি^ক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এনহ্যান্সড এনডিসি ডকুমেন্ট চূড়ান্তকরণে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর রাষ্ট্রসমূহকে অবশ্যই প্যারিস এগ্রিমেন্টের সব লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে বিবেচনায় রাখতে হবে। ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিউট্রাল পৃথিবী গড়তে হলে রাষ্ট্রসমূহকে দ্রুত কার্বন নির্গমণের রেখাচিত্রের সর্বোচ্চ সীমাটিতে পৌঁছাতে হবে এবং তাকে কমানো শুরু করতে হবে। এজন্য প্যারিস চুক্তির কার্বন উদগীরণ নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলায় রেজিলিয়ান্ট কমিউনিটি বিনির্মাণ এবং লস অ্যান্ড ড্যামেজসহ প্যারিস চুক্তির সকল লক্ষ্য এবং সুযোগগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের এনহ্যান্সড এনডিসি তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে।

 

সামছুদ্দোহা আরও বলেন, বাংলাদেশ এরই মধ্যে ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামে (সি.ভি.এফ.)-এর চেয়ার করছে। ফলে বাংলাদেশের সুযোগ রয়েছে সি.ভি.এফ. ভুক্ত দেশগুলোকে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিউট্রাল অর্থনীতির রাষ্ট্র হওয়ার পথে নেতৃত্ব দিতে।

 

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এরই মধ্যে ‘মুজিব ক্লাইমেট পারসপেক্টিভ প্ল্যান-২০৩০’ ঘোষণা করেছে যেটি অবশ্যই প্রশংসনীয়, এটিকে অবশ্যই প্যারিস ক্লাইমেট গোলের সাথে সংযুক্ত করা উচিত। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ভার্চুয়াল জলবায়ু সম্মেলন বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এবং সিভিএফ রাষ্ট্রসমূহকে এই সম্মেলনে উন্নত রাষ্ট্রসমূহের অর্থনৈতিক সক্ষমতার আনুপাতিক হারে তাদের এনহ্যান্সড এনডিসিতে কার্বন নির্গমণ হ্রাস এবং বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ক্লাইমেট ফান্ড গঠনে চাপ প্রয়োগ করতে পারে।

 

সিডিপির নির্বাহী প্রধান সৈয়দ জাহাঙ্গীর হাসান মাসুম বলেন, বাংলাদেশ যদি তার আনকন্ডিশনাল টার্গেটগুলোকে পূরণ করতে চায় তাহলে অবশ্যই বাংলাদেশকে এনডিসির সঙ্গে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় উন্নয়ন এবং এনডিসিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

 

এনভাইরনমেন্ট জার্নালিস্ট ফোরামের সভাপতি কামরুল ইসলাম চৌধুরি বলেন, এনডিসি একটি জাতীয় ডকুমেন্ট আমরা দেখছি এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে কিছুটা সম্পৃক্ত করা গেছে কিন্তু সিভিল সোসাইটিকে এখনো সম্পৃক্ত করা হয়নি। এনডিসির মতন একটি জাতীয় ডকুমেন্ট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সিভিল সোসাইটিকে বাইরে রাখার বিষয়টি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ বৈশি^ক কয়েকটি প্লাটফর্মে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে এবং আগামীতে আরও সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা যদি একটি গ্রহণযোগ্য এবং সময় উপযোগী ঘউঈ তৈরি করতে না পারি তাহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ধরে রাখা কঠিন হবে।

 

সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল ভদ্র বলেন, আমরা দেখছি এনডিসি বাস্তবায়নে ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠী এবং যারা এটি নিয়ে গবেষণা করে এবং মাঠে কাজ করে তাদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না। কিন্তু তাদের যুক্তকরা না হলে আমরা একটি অংশগ্রহণমূলক জাতীয় ডকুমেন্ট পাব না।

 

ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরামের সভাপতি কাউসার রহমান বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এরই মধ্যে অনেক অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। আমরা এরই মধ্যে অনেক জাতীয় ডকুমেন্ট তৈরি করেছি। আমাদের এনডিসি কে একটি অংশগ্রহণমূলক এবং ইউএনএফসিসিসি-এর নির্দেশনা অনুযায়ী তৈরি করতে হবে। বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর আমরা যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক নীতির পরিবর্তন হতে দেখছি এই প্রেক্ষিতে অধিক কার্বন উদগীরণকারী দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে এটি বাংলাদেশের জন্য নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

 

বিশেষ অতিথির বক্তেব্যে পিকেএসএফর ক্লাইমেট চেঞ্জ ইউনিটের পরিচালক ড. ফজলে রাব্বি সাদেক আহমেদ বলেন, আমরা দেখছি এনহ্যান্সড এনডিসি প্রণয়নে অধিক কার্বন উদগীরণকারী দেশগুলোর অনীহা রয়েছে। অনেকে তাদের আগের ডকুমেন্টই জমা দিতে দেখা যাচ্ছে, এটা একটি বড় চিন্তার বিষয়। বাংলাদেশকেও একটি গ্রহণযোগ্য এনহ্যান্সড এনডিসি তৈরি করতে হবে। কিন্তু আমরা জানি বাংলাদেশ বৈশি^ক কার্বন উদগীরণের মাত্র ৩০০ ভাগের এক ভাগ করে এবং আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেক নিচের দিকে। ফলে আমাদের দারিদ্র্যবিমোচনও করতে হবে একই সঙ্গে এই জনগোষ্ঠীকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে বাঁচাতে হবে এবং বৈশি^ক উদ্যোগের সাথেও থাকতে হবে।

 

সিএএনএসএ বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজি কমিটির চেয়ারপারসন রাবেয়া বেগম অংশগ্রহণমূলক এবং ইউএনএফসিসিসি-এর নির্দেশনা অনুযায়ী এনহ্যান্সড এনডিসি ডকুমেন্টের প্রত্যাশার কথা জানান।

 

এনহ্যান্সড এনডিসি প্রণয়ন চূড়ান্তকরণে জন্য সুপারিশে বল হয়

 

এনহ্যান্সড এনডিসি চূড়ান্তকরণে বিশেষজ্ঞ অংশীজন, নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ জরুরি। এনহ্যান্সড এনডিসি দলিলটি তৈরিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় যেমন- সড়ক ও পরিবহণ, শিল্প, গৃহায়ন এবং গণপূর্ত, কৃষি, রেলওয়ে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, টেক্সটাইল এবং পাট, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি অংশীদারিত্বপূর্ণ সম্পর্ক হওয়া প্রয়োজন। এনডিসি তৈরি এবং বাস্তবায়নে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় স্ট্র্যাটেজি কমিটি থাকা প্রয়োজন। এনডিসি নথিটিকে জাতীয় অন্যান্য পরিকল্পনা এবং কর্মকৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যভাবে তৈরি করা প্রয়োজন। এনহ্যান্সড এনডিসি চূড়ান্তকরণে জাতীয় সংসদে নথিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন জরুরি। দেশের কার্বনঘন খাতগুলোকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন (যেমন- যোগাযোগ, নির্মাণ খাত, গৃহায়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, সিমেন্ট এবং স্টিল ইন্ডাস্ট্রি, ইট ভাটা ইত্যাদি) তাদেরকে এনহ্যান্সড এনডিসিতে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। কার্বন নির্গমণ কী পরিমাণে হ্রাস করা হচ্ছে তার একটি সংখ্যাগত হিসাব উপস্থাপন করা এবং তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া উপস্থাপন করা যেতে পারে।

 

যাযাদি/এস