ইউটিউবে গ্রহণযোগ্য নীতিমালার দাবি

ইউটিউবে গ্রহণযোগ্য নীতিমালার দাবি

কথায় বলে, 'এক মণ দুধের মধ্যে একফোঁটা চোনা ফেললে পুরো দুধটাই নষ্ট হয়ে যায়।' আজকে বেপরোয়া ইউটিউব যেন তেমনটাই হয়ে উঠেছে। গত এক দশক ধরে সারা পৃথিবীতেই শোবিজে একটা বড়োসড়ো পরিবর্তন এসেছে। আর এই পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় যুগান্তকারী ভূমিকায় রয়েছে ইউটিউব তথা অনলাইন পস্ন্যাটফর্ম। বাংলাদেশেও এর ঢেউ গত তিন-চার বছরে বেশ ভালোমতোই পড়েছে। টেলিভিশন এবং সিনেমার পাশাপাশি মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ইউটিউবের প্রতি। নিজেদের সময়, পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং ব্যক্তিগত চাহিদার স্বাধীনতা অনুযায়ী যে কোনো বিষয় দেখার সুযোগ আছে ইউটিউবে। যে সুযোগ অন্য কোনো মাধ্যমেই নেই। এই শর্টকাট বা সহজ সুযোগ কাজে লাগিয়েই অনেকে বেপরোয়াভাবে যার যেমন ইচ্ছা নিজেরাই ভিডিও তৈরি করে ইউটিউবে ছেড়ে দিচ্ছেন। সাবস্ক্রাইবার বাড়াতে অনলাইনের যেখানে-সেখানে ঢু মারছেন, কন্টেন্টের প্রতি প্রলুব্ধ বা উৎসাহী করছেন। যার যেমন তারকামূল্য ও তার প্রকাশের অভিনবত্ব সে অনুযায়ী জোগাড় হচ্ছে এ সব সাবস্ক্রাইবার। আবার এই সাবস্ক্রাইবার বাড়াতে কেউ এমন সব মাথাগরম করা ছবি বা কন্টেন্ট আপলোড করছেন যাতে তার সাইটে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কোটি কোটি মানুষ তা দেখছেন, লাইক, কমেন্টস পড়ছে লাখ লাখ। এভাবে তারা রাতারাতি বনে যাচ্ছেন ইউটিউব স্টার। তবে সব কন্টেন্টই মানুষকে প্রলুব্ধ করার জন্য, এমন নয়। এখানে অসংখ্য স্বচ্ছ বিনোদনমূলক বা শিক্ষামূলক কন্টেন্টও অনেকে ব্যবহার করেন। যারা এ সব কন্টেন্ট তৈরি করেন তাদের অনেকে আছেন শুধু শখের বসে করছেন। অনেকের আবার পেশাই এটা। আর সেই পেশাদার ইউটিউবারদের মধ্যে যার চ্যানেলে যত বেশি সাবস্ক্রাইবার থাকবে সে হিসেবে ইউটিউব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের অর্থের চুক্তি হবে। সে জন্যও তারাও যথেচ্ছ সাবস্ক্রাইবার বাড়াতে অস্বচ্ছতারও আশ্রয় নিয়ে থাকেন। লাইক, কমেন্টসে-এও অস্বচ্ছতার আশ্রয় নিয়ে থাকেন। মানুষের চারটি মৌলিক চাহিদা মিটলেই যে জিনিসটাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় সেটা বিনোদন। তবে এ সব কন্টেন্ট দেখে মানুষ বিনোদিত হলেও কিছু কন্টেন্ট আছে যা দেখে মানুষ তীব্র প্রতিক্রিয়াও করে থাকেন। আর ওইসব ভিডিওর নিচের কমেন্টগুলো দেখলেই তা স্পষ্ট হয়। ইউটিউবে অন্যান্য বাণিজ্যিক বা আদর্শিক সাইট নিয়েও যেমন অভিযোগ আছে, তেমনি বিনোদনকে কেন্দ্র করেও দেশের জনসাধারণে বিস্তর অভিযোগ আছে। প্রথম অভিযোগ হচ্ছে, ব্যাপক অশ্লীলতা ও নোংরামির ছড়াছড়ি। তারপর সমাজের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ, অশ্রদ্ধা ও সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়া বিষয়ক কন্টেন্ট। এ জন্য দেশের জনসাধারণ তো আছেই, শোবিজের বিশিষ্ট শিল্পী ও নির্মতারাও চাচ্ছেন এ ব্যাপারে একটা সরকারি নীতিমালা ও আইনের স্বচ্ছ প্রয়োগ হোক। কিন্তু এগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারিভাবে কোনো ব্যবস্থা নেই। কোনো পর্যবেক্ষণও নেই। অথচ অন্যান্য সাইট নিয়ে গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে কিন্তু সরকারিভাবে ঠিকই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যেমন- সম্প্রতি 'ইভ্যালি'র ক্ষেত্রে যা ঘটেছে। সিনেমা হোক আর ইউটিউবই হোক বিনোদনও অন্যান্য বিষয়ের মতোই বাণিজ্যিক। পাশাপাশি আদর্শিকও। কিন্তু এটা কীভাবে করা হচ্ছে, তাতে কোনো স্বচ্ছতা আছে কিনা, নীতিমালা আছে কিনা, দেশীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও জনস্বার্থের উপযোগী কিনা- এর জন্য সরকারি পর্যবেক্ষণ থাকবে না? যেমন- অন্যান্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আছে? ইউটিউবের বিনোদন বিষয়ক কন্টেন্টের উপর সরকারি আইন, নীতিমালা ও পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি থাকা উচিত কিনা- এ নিয়ে কথা হয় শোবিজের বিশিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি সোহানুর রহমান সোহান বলেন- 'এটা আমি শতভাগ সমর্থন করি। আমি মনে করি, এই বিষয়ে সরকারি পর্যবেক্ষণ, নীতিমালা থাকা অত্যাবশ্যক। ইউটিউবে কে কোন কন্টেন্ট আপলোড করছে এর স্বচ্ছতা অবশ্যই থাকা দরকার। এখানে বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরে এবং বিশ্ববাসী বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহী হয় এমন কন্টেন্টই আপলোড করতে হবে। এর বাইরে দেশীয় সমাজ-সংস্কৃতিবিরোধী, মিথ্যা, অসঙ্গতিপূর্ণ হলে তার কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।' ডিরেক্টরস গিল্ড-এর সভাপতি সালাহউদ্দিন লাভলু বলেন, 'হঁ্যা, ইউটিউবটা আসলে এত উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে, বেপরোয়াভাবে যে যা ইচ্ছা বানাচ্ছে, আপলোড করছে। ব্যাপারটা সুখের নয়, ভালো লাগার নয়। এ ব্যাপারে আমি যতদূর জানি, সরকারও বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে। একটা পর্যবেক্ষণ বা আইনের আওতায় আনতে বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছে। আমি মনে করি, ইউটিউবে এমন অনেক কন্টেন্ট আছে যেটা দর্শক মেনে নিতে পারছেন না। আসলে এরকম কন্টেন্ট কিছুতেই ছাড়া উচিত নয়।' এদিকে বিশিষ্ট অভিনেতা, অভিনয় শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব নাসিম বলেন, ইউটিউবে যে সব কন্টেন্ট আপলোড হচ্ছে সে সম্পর্কিত সরকারের একটা পর্যবেক্ষক কমিটি থাকা আবশ্যক। বাংলাদেশে তো এটার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই। যদিও কোনো নিয়ন্ত্রণ শিল্পের জন্য সুখকর নয়। তারপরও এর একটা ভালোমন্দ আছে। কাজেই এখানেও একটা জবাবদিহিতা থাকা উচিত। নীতিমালা থাকা দরকার। যাতে শিল্পের স্বাধীনতার নামে বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারিতার প্রকাশ না ঘটে। সে জন্য ইউটিউবেও একটা সেল্ফ সেন্সরশিপ থাকা দরকার।' এদিকে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, 'সরকার এমন কিছু প্রযুক্তি আনতে যাচ্ছে, যেটা থেকে শনাক্ত করা যাবে- কে কোথায়, কী ধরনের ভিডিও আপলোড করেছে, কারা এসবের পেছনে জড়িত। আমাদের নিরাপদ থাকার জন্য যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার, সেসব ব্যবস্থা আমরা নেব।'

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে