বোরো আবাদ :ফলন বৃদ্ধির গুরুত্ব ও করণীয়

বোরো আবাদ :ফলন বৃদ্ধির গুরুত্ব ও করণীয়

ধান উৎপাদনে বোরো মৌসুম সর্বাধিক উৎপাদনশীল। একথা অনস্বীকার্য বোরোর ওপর ভিত্তি করেই দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি রচিত হয়েছে। দেশের মোট উৎপাদনের ৫৮ ভাগ আসে এ মৌসুম থেকে। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বোরো ধানের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৫ থেকে ২.০ টন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব- যা জাতীয় উৎপাদনে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। স্বাধীনতার পর পরই দেশের ৩০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতিপূরণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক আমদানির মাধ্যমে এবং স্বল্প মেয়াদে উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত বীজ, সেচ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করেন এবং কৃষি ঋণ মওকুফ, সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার ও খাসজমি বিতরণ করে কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা করেন।

বঙ্গবন্ধু বলতেন, 'একটা স্বল্প সম্পদের দেশে কৃষি খাতে অনবরত উৎপাদন হ্রাসের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে না। দ্রম্নত উৎপাদন বৃদ্ধির সব প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। চাষিদের ন্যায্য ও স্থিতিশীল মূল্য প্রদানের নিশ্চয়তা দিতে হবে।' তিনি কৃষিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। উন্নত বীজ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেন, উচ্চতর কৃষি গবেষণা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য ১৯৭৩ সালের মধ্যেই ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষি অবকাঠামো পুনর্নিমাণ ও কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য হ্রাসকৃত মূল্যে ৪০ হাজারটি শক্তিচালিত লো-লিফট পাম্প, ২৯০০টি গভীর নলকূপ ও ৩০০০টি অগভীর নলকূপ স্থাপনের মধ্য দিয়ে দেশে বোরো আবাদ বাড়ানোর ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এক সময় দেশের বোরোর আবাদ কম হলেও সেচ ব্যবস্থা প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবাদ বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে যোগ হতে থাকে অব্যাহতভাবে ফলন বৃদ্ধির নতুন নতুন উন্নতর জাত। ফলশ্রম্নতিতে উৎপাদনের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে থাকা বোরো ক্রমশ প্রথম অবস্থানে উঠে আসে- যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে আরো সুদৃঢ় করেছে এবং করছে।

বোরো ধান নিয়ে এক ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা আছে যে, বোরো ধানের আবাদে পানি বেশি লাগে। অনেকে বলেন, এক কেজি ধান উৎপাদন করতে ৩০০০-৫০০০ লিটার পানি লাগে। কিন্তু ব্রি ও অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর এগ্রিকালচারাল রিসার্চ কর্তৃক এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, সেচের পানির হিসেবে কৃষক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রিত সেচ ব্যবস্থাপনায় প্রতি কেজি ধান উৎপাদন করতে ১২০০-১৫০০ লিটার পানি লাগে। অপচয় বাদ দিয়ে শুধু ধানের উৎপাদনে প্রকৃত পানির খরচ হিসাব করলে প্রতি কেজি ধান উৎপাদন করতে ৫৫০-৬৫০ লিটার পানিই যথেষ্ট। বোরো আবাদ বাড়ানোর জন্য এ ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা বিপরীতে জন-সচেতনতা গড়ে তোলার কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে এবং পাশাপাশি বোরো চাষে পানির অপচয় রোধে কৃষকদের সচেতনতা বাড়াতে হবে।

আরেকটি নেতিবাচক প্রচারণা আছে, বোরো চাষে কৃষকের লোকসান হয় কিন্তু ২০০১-২০১৯ পর্যন্ত গত ১৯ বছরের বোরো ধান চাষের অর্থনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কৃষকরা বোরো ধান চাষ করে প্রতি বছর হেক্টরপ্রতি গড়ে ৫০২ টাকা হারে লাভ করছেন। যদিও কোনো কোনো বছরে লাভের তারতম্য আছে, কিন্তু কৃষকরা সাধারণত বোরো ধান অর্থকরী ফসল (ঈধংয ঈৎড়ঢ়) হিসেবে চাষ করেন। যা তারা প্রয়োজন মাফিক বিক্রি করে দৈনন্দিন চাহিদা মিটিয়ে থাকেন। কৃষকদের আয়ের একটি বড় অংশ বোরো ধান থেকে আসে। যদি বোরো ধান চাষ না করা হয় তাহলে কৃষকের আয় অনেকাংশে কমে যাবে এবং তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যেতে পারে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বোরো ধান চাষ অত্যন্ত জরুরি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মাননীয় কৃষিমন্ত্রীকে বোরোর উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছেন এবং বোরোর চাষযোগ্য কোনো জমি যাতে খালি না থাকে সে ব্যাপারে কৃষকদের উৎসাহ দেয়ার কথা বলেছেন। বোরোর উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে মাঠ থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সব কর্মকর্তাকে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়ে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, যে করেই হোক চলতি বোরোর যে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তা অর্জন করতে হবে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কৃষকের পাশে থাকতে হবে। এমনিতেই এ বছর ধানের ভালো দাম পাওয়ায় চাষিরা খুশি ও উৎসাহ-উদ্দীপনায় আছে। অন্যদিকে আমরা কৃষকদের যে বোরো ধানের উন্নত বীজ, সার, সেচসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ এবং বন্যার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় প্রণোদনা দিচ্ছি তা সুষ্ঠুভাবে বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।

উলেস্নখ্য, গত বোরো মৌসুমে ৪৭ লাখ ৫ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। চলতি বোরো মৌসুমে গত বছরের চেয়ে ৫০ হাজার হেক্টর জমি বাড়িয়ে ৪৮ লাখ ৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অঞ্চল হিসাবে সিলেটে, বরিশাল, ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, ফরিদপুর, দিনাজপুর, বগুড়াও ময়মনসিংহে ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ সম্প্রসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। লক্ষ্য অর্জনে হাইব্রিড চাষও বাড়ানো হচ্ছে। গত বছর ৯ লাখ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধান চাষ হয়েছিল। এবার ১১ লাখ হেক্টরে হবে হাইব্রিড ধানের চাষ। এ বছর দুই লাখ হেক্টরে বাড়তি হাইব্রিড জাতের ধান চাষের জন্য ১৫ লাখ কৃষককে মাথাপিছু এক বিঘা জমির জন্য দুই কেজি করে বীজ বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, এবার বোরো মৌসুমে হাইব্রিডসহ দুই কোটি ছয় লাখ টন চাল উৎপাদন হবে। যা গত বছরের তুলনায় ৫ লাখ টন বেশি।

সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বোরো ধানের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৫ থেকে ২.০ টন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব- যা জাতীয় উৎপাদনে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের কৃষকরা বোরো আবাদে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন। ফলে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফলন পান না। অধিক ফলন প্রাপ্তির জন্য জাত নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে সঠিক ফসল ব্যবস্থাপনা একান্তই অপরিহার্য। ভালো বীজে ভালো ফলন, ভালো বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব।

বাংলাদেশে আবাদযোগ্য জমি ৩০টি বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে বিভক্ত। ধান এমন একটা ফসল যা দেশের প্রায় সব পরিবেশ অঞ্চলে চাষাবাদ করা গেলেও কৃষি পরিবেশ অঞ্চলভেদে এর অভিযোজনশীলতায় কিছুটা তারতম্য রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকরা অনেক সময় এলাকাভিত্তিতে সঠিক জাত নির্ধারণ করতে পারেন না। যেমন- কোনো জমিতে ১৫০ দিনের কম জীবনকাল সম্পন্ন জাত ভালো হবে কিন্তু না জানার কারণে সেখানে কৃষকরা ১৫০ দিনের বেশি জীবনকাল সম্পন্ন জাতনির্বাচন করেন। বোরো ধানের দীর্ঘ মেয়াদি (১৫০ দিন) জাতসমূহ হচ্ছে- ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৬৯, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২। স্বল্প মোয়াদি (১৫০ দিন) জাতের মধ্যে রয়েছে- ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৫,ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৯৬, ব্রি হাইব্রিড ধান৩ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৫। প্রিমিয়াম কোয়ালিটি জাতগুলো হচ্ছে ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৮১ এবং উচ্চ মাত্রার জিংকসমৃদ্ধ (২৪ পিপিএম) জাতসমূহ হচ্ছে- ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪। নিম্নোক্ত তালিকা অনুযায়ী কৃষি ইকোসিস্টেম ও ভূমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে সঠিক জাত নির্বাচন করতে হবে।

কৃষকরা নানান কারণে বেশি বয়সের চারা মাঠে রোপণ করে, ফলে বেশি বয়সের চারা হতে বেশি কুশি হয় না এবং পরবর্তী সময়ে ফলন কমে যায়। বোরো মৌসুমে অবশ্যই ৩৫-৪৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করতে হবে। সাধারণত ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। অনেক এলাকার কৃষকরা সুষম মাত্রায় সঠিক সার, যথা-ডিএপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক ব্যবহার করে না। কিন্তু গাছের বাড়-বাড়তির এবং পর্যাপ্ত কুশি উৎপাদনের জন্য সুষম সার প্রয়োগ করা খুবই জরুরি।

আগাছা সঠিক সময়ে দমন না করলে বোরো মৌসুমে প্রায় ৩০-৪০ ভাগ পর্যন্ত ফলন কমে যায়।

দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাবনা, বগুড়া, নাটোর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় সেচ কাজ বিঘ্ন হচ্ছে। হাওর এলাকার এপ্রিল-মে মাসে কিছু স্থানে ভূ-উপরিস্থ (ছোট নদী, খাড়ি, নালা ইত্যাদি) পানির অভাবে বোরো ফসলের শেষ পর্যায়ে সেচ প্রদানে সম্ভব না হওয়ায় প্রায়শই ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানির জন্য এবং উপকূলীয় অলবণাক্ত এলাকায় সেচ অবকাঠামোর অভাবে বোরো চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। বরেন্দ্র এলাকায় সেচ সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং পানি সাশ্রয়ী শস্যবিন্যাস প্রচলন করতে হবে।

লেখক: মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে