অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করছে কৃষি

প্রকাশ | ২১ জানুয়ারি ২০২৪, ০০:০০

কৃষিবিদ আব্দুল আজিজ
বাংলাদেশ আয়তনের দিক দিয়ে বিশ্বের ৯৪তম দেশ। তবে এফএওর হিসাবে দেখা যায়, প্রাথমিক কৃষিপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৪তম। শীর্ষে রয়েছে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, আয়তনে ছোট হলেও কৃষিপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ ভালো। ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া ও ভূমির ধরনের কারণে আমাদের দেশে বেশিরভাগ ফসলের উৎপাদন বাড়ছে। সরকারও কৃষিতে ভর্তুকি দিচ্ছে। নতুন জাত উদ্ভাবন, সম্প্রসারণ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণে জোর দেওয়া হয়েছে। এতে অনেক ফসল উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষ দশে জায়গা করে নেওয়ার মতো ফলাফল আমরা পাচ্ছি। অর্থনীতির চাকাকে আরও গতিশীল করবে কৃষি। বাংলাদেশ ২২টি কৃষিপণ্য উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে চাল, মসুর ডাল, আলু, পেঁয়াজ, চায়ের মতো পণ্য যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফল। গত এক দশকে কুমড়া, ফুলকপি ও সমজাতীয় সবজির মতো কিছু পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষ তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের পরে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন। সেই বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশে সব থেকে বড় সাফল্য এসেছে কৃষিতে। চার দশক ধরে খাদ্যে ঘাটতি থাকলেও দেশ এখন এ খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষিতে এগিয়ে বাংলাদেশ। বিশ্বে প্রথমবারের মতো জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশের কৃষি গবেষকরা। মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং অব্যবহিত পরে প্রায় সাত কোটি মানুষের খাদ্য উৎপাদন করতেই হিমশিম খেতে হয়েছে দেশকে। তখন আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হতো। অথচ এখন দেশের লোকসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি, পাশাপাশি আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এরপরও আমন, আউশ ও বোরো ধানের বাম্পার ফলনে বছরে প্রায় চার কোটি টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। কৃষক ও কৃষিবিদদের অসামান্য অবদানের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উৎপাদনে ৩য়, সবজি উৎপাদনে ৩য়, আম উৎপাদনে ৭ম, আলু উৎপাদনে ষষ্ঠ, পেয়ারা উৎপাদনে ৮ম, চা উৎপাদনে ৪র্থ, পাট উৎপাদনে ২য়, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের মাছ উৎপাদনে ৩য় এবং ইলিশ উৎপাদনে ১ম স্থানে অবস্থান করে বিশ্বপরিমন্ডলে সমাদৃত। বর্তমানে বিশ্বে দানাদার শস্য উৎপাদনে তৃতীয় অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। ২০০৯ সালে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৩৩ হাজার টন। ২০২১ সালে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৪৪ হাজার টন। কৃষি, কৃষক ও কৃষিবিদদের নিরলস প্রচেষ্টায় আজ কৃষিতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। কৃষির এই অভাবনীয় সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, লবণাক্ত, খরা, জলমগ্নতা সহনশীল ও জিংকসমৃদ্ধ ধানসহ ১২৩টি উচ্চফলনশীল জাত ধান উদ্ভাবন করা হয়েছে। যার কারণে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন চতুর্থ অবস্থানে। ২০২৩ অর্থবছরে এক কোটি ৫৯ লাখ ৫৪ হাজার মে. টন সবজি, ১২ লাখ ৮৮ হাজার মে. টন আম উৎপাদিত হয়েছে। আলু উৎপাদনেও সাফল্য অভাবনীয়। এ ছাড়া দেশে ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন ফসলের ৫৮৪টি উচ্চফলনশীল নতুন জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। আর ৪৪২টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। কৃষিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কারও কৃষকদের উৎসাহিত করেছে। সামাজিক, রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পালটে গেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ছিল এক সময়ে এ অঞ্চলে। কিন্তু সেই কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে ক্রমশ বেরিয়ে এসে শিল্প ও সেবা খাতমুখী হয়েছে আমাদের অর্থনীতি। বাংলাদেশেও একটি ছোটখাটো শিল্পবিপস্নব হয়েছে। বিস্ময়কর অগ্রগতি ঘটেছে কৃষি খাতে। খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পরও উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে যেখানে খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ২৮ লাখ ৯৬ হাজার টন, সেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪ কোটি ৭৭ লাখ ৬৮ হাজার টন হয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে চাল ৩১৩.১৭ টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪০১.৭৬ টন। একই সময় গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, তেলবীজ, সবজির উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ বেশি। বিগত ১৫ বছরে ভুট্টা উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে প্রায় ৯ গুণ, আলু ২ গুণ, ডাল ৪ গুণ, তেলবীজ ২.৫ গুণ ও সবজি ৮ গুণ। ফলে বাংলাদেশের কৃষির সাফল্য বিশ্বে সমাদৃত হয়েছে। দেশের ২২টি কৃষিপণ্য উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে ধান উৎপাদনে তৃতীয়, সবজি ও পেঁয়াজ উৎপাদনে তৃতীয়, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি এবং দেশে-বিদেশে বিজ্ঞানীদের উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কারণে এ অর্জন সম্ভব হয়। এ ১৫ বছরে বৈরী পরিবেশে সহনশীল জাতসহ মোট ৬৯৯টি উচ্চফলনশীল জাতের ফসল উদ্ভাবন ও ৭০৮ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ সময় ধানের ৮০টি জাত উদ্ভাবন করা হয়। বিশেষ করে লবণাক্ত সহনীয় জাত ৯, জলমগ্নতা ও জলাবদ্ধতা এবং খরা সহনীয় ৩, জোয়ার-ভাটা সহনীয় ২টি, প্রিমিয়ার কোয়ালিটি ৭, জিঙ্কসমৃদ্ধ ৭টি জাত রয়েছে। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) বিগত ১৫ বছরে ১৯টি ধানের জাতসহ বিভিন্ন ফসলের মোট ৮৬ জাত উদ্ভাবন করেছে। বিনা উদ্ভাবিত ধানের জাত হচ্ছে, স্বল্প জীবনকালীন ধান, লবণসহিষ্ণু বোরো ধানের ২টি, জলমগ্নতা ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাতের বিনা ধান। এ ছাড়া বিনা গম-১টি, সরিষা, তিল, চিনাবাদাম ও সয়াবিন রয়েছে। মসুর, মুগ, ছোলা, মাষকলাই, খেসারি, টমেটোর বেশ কিছু জাত উদ্ভাবন করা হয়। জিনম সিকু্যয়েন্সিং আবিষ্কারের মাধ্যমে বিশ্বে সর্বপ্রথম তোষা পাটের জীবন রহস্য উন্মোচন করেন দেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা। পরবর্তী সময়ে পাটসহ পাঁচ শতাধিক উদ্ভিদের বিধ্বংসী রোগের জন্য দায়ী ছত্রাকের ও দেশি পাটের জীবন রহস্য উন্মোচন হয়। ২০১৮ সালে ধইঞ্চার জীবন রহস্যের উন্মোচন করা হয়েছে। ১৯৭০ সাল থেকে দেশি জাতকে উন্নত করে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা উচ্চফলনশীল (উফশী) জাত উদ্ভাবনের পথে যাত্রা করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বারি), বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই), বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) কৃষিজ জাত উদ্ভাবনে ক্রমাগতভাবে সফলতা দেখিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে এতগুলো প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনের দিক থেকেও বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষে। কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তি, বীজ, সার এবং যন্ত্রের ব্যবহার উৎপাদন বাড়ার পেছনে প্রধান উজ্জীবক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। তারসঙ্গে বিশেষ অবদান রয়েছে আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর নিবিষ্ট গবেষণায় উচ্চফলনশীল, কম সময়ে ঘরে তোলা যায় এমন জাত ও পরিবেশ সহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবন। ধান, পাটের পাশাপাশি খাদ্যশস্য, শাকসবজি, রকমারি ফল, সমুদ্র ও মিঠাপানির মাছ, গবাদিপশু, পোলট্রি মাংস ও ডিম, উন্নতজাতের হাঁস-মুরগি, দুগ্ধ উৎপাদন অনেক বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ব উৎপাদন তালিকায় শীর্ষত্বের লড়াই করছে বাংলাদেশের কৃষি। বাংলাদেশের জনগণের একটা বিশাল অংশ তাদের জীবনধারণের জন্য কৃষির ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশে ৩-৪ বছর ধরে আবহাওয়ার অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান থাকা এবং মাঠ পর্যায়ে কৃষি বিভাগের তৎপরতায় কৃষক ভালো বীজ, জমিতে সুষম সারের ব্যবহার বৃদ্ধি ও পরিমিত সেচের কারণে বর্তমানে পর্যাপ্ত ধান উৎপাদন হচ্ছে। তবে কৃষি গবেষকদের মতে, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এ মুহূর্তে ধানের আবাদ কমানো যাবে না। প্রধান ফসল ধানের আবাদ ঠিক রেখে অন্যান্য ফসলের (গম, ভুট্টা, ডাল, তৈল, সবজি) আবাদ বৃদ্ধি করতে হবে। অবশ্য বর্তমানে ধানের কুঁড়া থেকে রাইস বার্ন অয়েল উৎপাদনের ফলে সয়াবিন তৈরি আমদানি দিন দিন কমে যাচ্ছে। সরিষার আবাদ বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। নতুন নতুন সরিষার জাত উদ্ভাবিত হয়েছে- যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ডালের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ফলে ডাল জাতীয় ফসলের উৎপাদন এরই মধ্যে উলেস্নখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ডালের মূল্য ও আমদানির পরিমাণ কমেছে। এ সময়ে চাহিদার ৫০ শতাংশ ডাল দেশে উৎপাদন হচ্ছে। চাষিরা মূল্য পাওয়ায় পেঁয়াজ-রসুনের আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে এবং আমদানিও কমেছে। সারা বছরব্যাপী ফল উৎপাদন বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কলা, পেঁপে, থাই পেয়ারা, আপেলকুলের চাষ বেড়েছে। আংশিক বৃষ্টিনির্ভর আউশ ও পুরো বৃষ্টি নির্ভর রোপা আমন চাষে সরকার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ব্যবসায়িক ভিত্তিতে কৃষি খামার স্থাপন, খামার যান্ত্রিকীকরণ ও সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিরলস প্রচেষ্টা বর্তমান কৃষিকে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ অবস্থানে নিয়ে যাবে। যেখানে কৃষি, কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষিত হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে আরও গতিশীল করে সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।