• বুধবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ১৩ মাঘ ১৪২৭

ফলগাছের সাধারণ সমস্যা ও প্রতিকার

মৌসুমি ফলগাছে অনেক রোগ ও পোকামাকড়ের সমস্যা ছাড়াও বেশ কিছু সাধারণ সমস্যা দেখা যায়। সেসব সমস্যার মধ্যে প্রধান প্রধান কিছু সমস্যা ও তার প্রতিকারে কী করণীয় সেসব বিষয়ে জানা থাকলে সহজেই প্রতিরোধ করা যায়। বাংলাদেশে জনপ্রিয় ফলের মধ্যে আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, কুল, নারিকেল, কলা, পেঁপে, লেবু, আমড়া, বেল, কতবেল, জামরুল, লটকন, জলপাই অন্যতম। এসব ফলে সাধারণত যেসব সমস্যা দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- অনিয়মিত ফল ধারণ, ফল ঝরেপড়া রোগ এবং পোকামাকড়ের উপদ্রব। এসব সমস্যার লক্ষণ ও প্রতিকার বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন -কৃষিবিদ খোন্দকার মো. মেসবাহুল ইসলাম
ফলগাছের সাধারণ সমস্যা ও প্রতিকার

বা ংলাদেশে প্রায় ৫০ প্রকারের দেশি-বিদেশি ফলের চাষ হয়। এসব ফলের অর্ধেকেরও বেশি ফল পাওয়া যায় গরমকালে অর্থাৎ এপ্রিল মাস থেকে শুরু করে আগস্ট মাস পর্যন্ত সময়ের মধ্যে। তবে বর্ষার পর শীতের শুরুতে বা শীতেও বেশ কিছু ফল পাওয়া যায়। আবার এ সময়ের মধ্যে গরমকালের ফলগাছগুলোতে মুকুল বা ফুল বা কুঁড়ি আসাও শুরু হয়। এসব ফলগাছে অনেক রোগ ও পোকামাকড়ের সমস্যা ছাড়াও আরো বেশ কিছু সমস্যা দেখা যায়। সেসব সমস্যাগুলোর মধ্যে প্রধান প্রধান কিছু সমস্যা ও সেসব সমস্যার প্রতিকারে কি কি করণীয় সেসব বিষয়ে জানা থাকলে সহজেই প্রতিরোধ করা যায়। বাংলাদেশে জনপ্রিয় ফলের মধ্যে আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, কুল, নারিকেল, কলা, পেঁপে, লেবু, আমড়া, বেল, কতবেল জামরুল, লটকন, জলপাই অন্যতম। এসব ফলে সাধারণত যেসব সমস্যা দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- অনিয়মিত ফল ধারণ, ফল ঝরেপড়া এবং রোগ ও পোকামাকড়ের উপদ্রব।

অনিয়মিত ফল ধারণ সমস্যাটি প্রধানত দেখা যায় আমগাছে। নিয়ম মাফিক ছাঁটাই ও সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সেচ প্রদান করে এ সমস্যা অনেকটাই দূর করা যায়। তবে কোথাও কোথাও বিশেষ কিছু হরমোন ব্যবহার করে প্রতি বছর ফল ধরানোর ব্যবস্থা করা হয়। এটি একটি সাময়িক ব্যবস্থা, এতে গাছের বেশ ক্ষতি হয় ও খুব দ্রম্নতই গাছ ফল ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ না করলে বা মাটিতে বোরনের ঘাটতি হলে বা মাটিতে রসের অভাব হলে বা বাতাসের আর্দ্রতা কম ও তাপমাত্রা বেশি হলে অনেক সময় ফলের মুকুল ও গুটি ঝরা সমস্যা দেখা যায়। আম, লিচু, পেয়ারায় ফল ঝরা সমস্যা বেশি দেখা যায়। বোরনের অভাবে পেঁপে, নারিকেলের গুটিও ঝরে পড়ে। প্রতি লিটার পানিতে ১-২ মিলিলিটার হারে বোরিক অ্যাসিড বা সলুবর মিশিয়ে স্প্রে করলে সুফল পাওয়া যায়।

নারিকেলের ভেতরে অনেক সময় পানি হয় না বা নারিকেল ফেটে যায়। এটি গাছে পটাশের অভাবজনিত কারণে হয়। নিয়মিত বছরে দুইবার সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগের সময় পটাশ কিছু পরিমাণে বেশি প্রয়োগ করলে এ সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। বিভিন্ন ফলে বিভিন্ন রোগের কারণে ফল উৎপাদন কমে যায় বা ফলনে বিপর্যয় দেখা দেয়। ফলগাছের কচি পাতায় ফোস্কা পড়া রোগ বা এনথ্রাকনোজ রোগ দেখা দিলে কচি পাতা কালো হয়ে কুঁকড়ে যায় এবং গাছের শাখার বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, কলায় এনথ্রাকনোজ রোগ দেখা যায়। এ রোগে প্রথমে পাতা আক্রান্ত হলেও পরে তা কচি শাখা বা ডালে আগামরা ও পরে ফলে ফলপচা হিসেবে দেখা যায়। মেনকোজেব বা প্রপিকোনাজল জাতীয় ছত্রাকনাশক স্প্রে করে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

আম ও কাঁঠাল গাছের পাতা লাল মরিচা রোগে প্রথমে বাদামি রং ধারণ করে পরে কালো হয়ে ছোট ছোট ছিদ্র হয়ে যায়। কপার যুক্ত ছত্রাকনাশক স্প্রে করে লালমরিচা রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফলগাছে সাদাগুঁড়া রোগ বেশ সমস্যার সৃষ্টি করে। আম ও কুল গাছে যখন ফুল আসে এবং ফল যখন কচি অবস্থায় থাকে তখন সাদাগুঁড়া রোগে ফলের বেশ ক্ষতি হয়ে থাকে। ৮০% সালফার জাতীয় ছত্রাকনাশক স্প্রে করে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

কাঁঠালের মুচিপচা একটি সাধারণ সমস্যা মনে হলেও অনেক সময় এ কারণে গাছে কাঁঠালের সংখ্যা উলেস্নখযোগ্য হারে কমে যায়। আসলে পুরুষ মুচিগুলোতে একটা নির্দিষ্ট সময় পরে পরাগরেণু নষ্ট হয়ে পচন শুরু হয়। কাঁঠাল গাছে বয়স অনুযায়ী সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ এবং ফল সংগ্রহের পর পুরনো মরা, চিকন ও গাছের ভেতরের দিকের ডাল হালকা ছাঁটাই করলে গাছে পুরুষ ও স্ত্রী মুচি মোটামুটি একই সময়ে আসে এবং পরাগায়নের মাধ্যমে ফল ধারণ হয়। এ ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের পর পচামুচি গাছ ও গাছের নিচ থেকে সংগ্রহ করে পুঁতে ফেলতে হয়। পেয়ারা, লেবু ফল স্ক্যাব ও ক্যাংকার রোগে আক্রান্ত দেখা যায়। স্ক্যাব ও ক্যাংকার রোগে ফলে দাগ পড়ে ও ক্ষত তৈরি হয়। এতে ফলের বাজারমূল্য কমে যায়। কপার যুক্ত ছত্রাকনাশক স্প্রে করে লালমরিচা রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

আম, কাঁঠাল, লিচু, কুল, ডালিম ও পেয়ারাসহ অনেক ফলেই ফল ছিদ্রকারী পোকার উপদ্রব দেখা যায়। ফল যখন ছোট থাকে তখন পোকা ফলের গায়ে ডিম পেড়ে যায় এবং ডিম থেকে কীড়া বের হয়েই কচি ফলের ভেতরে ঢুকে শাঁস খেয়ে নষ্ট করে। গাছের মরা বাকল, ডাল ও গাছের নিচের আবর্জনার মধ্যে এ পোকার কীড়া সুপ্তকাল কাটায়। এ জন্য ফল সংগ্রহের পর ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে গাছের ভেতরে আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করলে এবং গাছের নিচের আবর্জনা ও আগাছা পরিষ্কার করলে এ পোকার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কচি ফল আক্রান্ত হলে ও ঝরে পড়লে গাছে প্রতি লিটার পানির সঙ্গে ২ মিলিলিটার হারে ফেনিট্রথিয়ন জাতীয় কীটনাশক ১৫ দিন পর পর দুইবার স্প্রে করতে হয়। কাঁঠাল গাছে এ সমস্যা দেখা দিলে ঘন হয়ে থাকা কাঁঠাল ফল ছাঁটাই করে পাতলা করে দিলে এ পোকার আক্রমণ কমে।

আম যখন পুষ্ট হয় তখন ফলে মাছি ও পোকার আক্রমণ দেখা যায়। এ মাছি ও পোকার আক্রমণে প্রায় সংগ্রহযোগ্য আম নষ্ট হয়ে যায়। নষ্ট বা পোকা আক্রান্ত ফল সংগ্রহ করে মাটিতে গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হয়। বিষটোপ বা ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে এ পোকা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। গ্রীষ্মকালে গরম বেশি পড়লে লিচু ও নারিকেল গাছে মাকড়ের সমস্যা দেখা যায়। লিচুর পাতা বাদামি রংয়ের হয়ে কুঁকড়ে যায়। পাতার নিচের দিকে মখমলের মতো হয়। ৮০% সালফার জাতীয় ছত্রাকনাশক স্প্রে করলে মাকড় নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কলার বিটল পোকা থেকে ফলকে রক্ষা করতে কাঁদি বের হওয়ার পরপরই ফলের কচি অবস্থায় সাদা বা নীল রংয়ের পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হয়।

পেয়ারা গাছের পাতার নিচে সাদামাছি পোকা জালের মতো আস্তরণ তৈরি করে পাতা থেকে রস চুষে খায়। এতে পাতা বিবর্ণ হয়ে ঝরে পড়ে ও গাছ দুর্বল হয়। আক্রান্ত গাছে ফুল ও ফল কম হয়। প্রাথমিক অবস্থায় পাতা ছিঁড়ে পায়ের তলায় পিষে এ পোকা মেরে ফেলা যায়। আক্রমণ বেশি হলে সামান্য কেরোসিন মিশ্রিত পানি পাতার নিচের দিকে খুব জোরে স্প্রে করে এ পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এ পোকা আলোক ফাঁদ স্থাপন করেও মেরে ফেলা যায়।

লেখক: উদ্যান বিশেষজ্ঞ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রংপুর অঞ্চল, রংপুর।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে