logo
রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৫ আশ্বিন ১৪২৭

  মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী   ২৯ আগস্ট ২০২০, ০০:০০  

আইনের শাসন ও ক্রমবর্ধমান অপরাধপ্রবণতা

সুস্থ জীবনযাপনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একজন মানুষ যখন বিধিবদ্ধ নিয়ম ও সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠে, তখন তার জীবন নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ থাকে না, সেটি কল্পনায়ও আসে না। সে ধরনের অবস্থায় প্রতিষ্ঠান ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন উন্নত দেশের বিকাশমান ধারার পথেই অগ্রসর হতে পারে।

আইনের শাসন ও ক্রমবর্ধমান অপরাধপ্রবণতা
আমাদের সমাজে এখন অবিশ্বাস্য বেশকিছু অপরাধের ঘটনা প্রায় নিয়মিতই ঘটতে দেখছি। দেশে অপরাধ দমন নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা গণমাধ্যমে উঠে আসছে। প্রতিদিন কিছু না কিছু অপরাধের খবর মানুষের নজরে আসছে। এতে অনেকে ভীত হচ্ছে, আবার অনেকেই নানা ধরনের ক্ষোভ ও হতাশায় নিমজ্জিত। তাদের কাছে এটাকে অনেকটা যেন নিয়তির বিষয় হিসেবে দেখে যেতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আবার অনেকে আছে, যারা এর জন্য রাষ্ট্রের দিকে আঙুল তুলছে, কথায় কথায় রাষ্ট্রই একা সব যেন পুষছে, আবার রাষ্ট্রই যেন তা নির্মূল করতে পারে- এমন ভাষণ দিয়ে দায়িত্ব পালন করছে। প্রতিদিন বিশেষ করে ধর্ষণ, হত্যা, সন্ত্রাস, দুর্ঘটনা, আগুনে পুড়িয়ে মারা, প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা, গাছে বেঁধে নির্যাতন করা- এসব লোমহর্ষক ঘটনা মানুষকে শুধু হতবাকই করে না, বিচলিত বোধ করতেও ভূমিকা রাখছে। এসব অপরাধমূলক কর্মকান্ডের বাইরেও ঘুষ, দুর্নীতি, দখল, নির্যাতন, মানবপাচার, দালাল শ্রেণির প্রতারণা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনার শিকার হওয়া, বখাটেদের উৎপাতে মেয়েদের নাজেহাল হওয়া ইত্যাদি অসংখ্য মনুষ্যসৃষ্ট ঘটনা সাধারণ নিরীহ নিরপরাধ মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত ভয়, আতঙ্ক, গ্রাস করে চলছে। ফলে শান্তিতে বসবাস করা, কাজ করা কিংবা জীবনযাপন করা, যেন এক প্রতিনিয়ত চোখে চোখ রেখে চলা জীবন। কোনো দিক থেকে কখন কে কার দ্বারা আক্রান্ত হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিংবা মারা যেতে পারে- এর যেন পূর্বপ্রস্তুতি কারও জন্যই থাকে না। কথা হচ্ছে, এভাবে চলতে চলতে আমরা কোথায় যাচ্ছি?

আমরা কিছু কিছু ধর্ষণের কথা শুনেছি। তাতে ক্ষুব্ধ হয়েছি। বিচার চাওয়া হয়েছে। কোথাও হয়েছে, কোথাও দেরি হয়েছে, কোথাও কী হয়েছে জানা নেই। কিন্তু আমরা কি কখনো কল্পনা করতে পেরেছি যে একজন স্কুলশিক্ষক ও একজন মাদ্রাসা অধ্যক্ষ যে প্রতারণার মাধ্যমে ছাত্রী ও অভিভাবকদের ধর্ষণে বাধ্য করত- এমন বিষয়টি কি আমরা ধর্ষণের অভিজ্ঞতার ইতিহাসে কল্পনা করতে পেরেছি? কিংবা ফেনীর নুসরাতকে যৌন হয়রানির সঙ্গে মাদ্রাসা অধ্যক্ষ যে ধরনের অপরাধ, অপকর্ম ও অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ঘটনার নায়ক হতে পারে, তেমন ধারণা কি আমরা সহজে অনুমান করতে পারি? আবার বরগুনার রিফাত কি ভাবতে পেরেছিলেন, তাকে এভাবে নয়ন বন্ডরা প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করতে পারে! আবার এটাও কি আমাদের কাছে খুব প্রশ্ন ছুড়ে দেয়নি যে একজন স্ত্রী তার স্বামীকে বাঁচানোর জন্য হাহাকার করছেন; কিন্তু তাকে বাঁচানোর জন্য দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন এগিয়ে তো আসেইনি, ধর ধর বলে একবারের জন্য চিৎকারও করেনি।

মনে রাখতে হবে আমরা একটি উত্তরণকাল-পর্ব অতিক্রম করছি। অর্থাৎ সমাজ বিকাশের ইতিহাস যারা কমবেশি জানে, তারা এটি বুঝতে পারে যে একটি সমাজব্যবস্থা যখন উন্নয়নের এক ধাপ থেকে আরেক ধাপের দিকে প্রবেশ করে, তখন তাকে বেশকিছু অবিশ্বাস্য সমস্যার যন্ত্রণা অতিক্রম করতেই হয়। কিন্তু অভিজ্ঞতা হচ্ছে, অনেকেই সমাজবিজ্ঞানের এই বাস্তবতার অভিজ্ঞতাকে মনে রাখতে চায় না কিংবা বিশ্বাসও করে না। সমাজ ও রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করছেন, তারা যদি উত্তরণকালের যন্ত্রণাগুলো সম্পর্কে কমবেশি অবহিত কিংবা জ্ঞাত থাকেন এবং এই সময় যেসব অস্বাভাবিক প্রবণতায় সমাজ আক্রান্ত হতে পারে, সেগুলোর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে রাখেন; তাহলে উত্তরণকালের যন্ত্রণা প্রশমনের ব্যবস্থা কমবেশি কার্যকর হতে পারে। বিষয়টি একটু সহজভাবে বলার চেষ্টা করছি। আমরা একটি অনুন্নত সমাজব্যবস্থা থেকে এখন উন্নয়নশীল সমাজে প্রবেশ করেছি। এরপর আমরা উন্নত সমাজে প্রবেশ করব। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, অনুন্নত থেকে উন্নয়নশীল সমাজে উত্তরণকালে একদিকে অর্থনীতিতে নানা ধরনের পরিবর্তন আসতে থাকে, সমাজে সম্পদ উপার্জনের সুযোগ আগের চেয়ে অনেক গুণ বাড়তে থাকে। আগে যেখানে মানুষ হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও দুবেলার অন্ন জোটাতে পারত না কিংবা পেটে ক্ষুধা থাকলেও তা নিবারণের জন্য কাজ পাওয়া যেত না; তখন মানুষ অনেকটাই নিয়তি তথা অদৃষ্টবাদের ওপর ছেড়ে দিয়ে সান্ত্বনা খুঁজত। সেই সমাজটিও যে অনুন্নত থাকার কারণ রয়েছে বা ছিল, সেসব অনুন্নয়নের কার্যকারণ সমাজ ব্যাখ্যা অর্থনীতির নিয়ম-কানুন তার জানার কোনো সুযোগই ছিল না। তার না ছিল লেখাপড়া লাভের সুযোগ, না ছিল প্রয়োজনের চেয়ে একটু সম্পদ আহরণের সুযোগ। সেই সমাজে সে বংশপরম্পরা যুগ যুগ ধরে দরিদ্র পরিবারের তিলক কপালে নিয়ে বেঁচে ছিল। আবার মুষ্টিমেয় কয়েকজন বংশপরম্পরা অর্থ-সম্পদে অপেক্ষাকৃত ধনী মানুষ হিসেবে সবার নমস্য ছিল। এটি ছিল অনুন্নত সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য।

আমরা আজ থেকে ৫০-৬০ বছর আগের মানুষের মুখে এসব অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুনি। এটি অনেকটাই প্রথাগত সমাজ। সেখানে সমাজ পরিবর্তনের কোনো আইন, নিয়ম, বিধি-বিধান কার্যকর ছিল না। তবে প্রথাটি ছিল যুগ যুগ ধরে যেভাবে এসেছে সেভাবে চলার। ফলে এক ধরনের নীরবতা পালন করেই সেই যুগের অনুন্নত সমাজব্যবস্থায় শতকরা ৯০-৯৫ শতাংশ মানুষ জীবন ধারণ করেছিল। তাদের অপরাধ করার শক্তি খুব কমই ছিল। বড়জোর ক্ষুধা বেশি লাগলে রাতের বেলা কারও ঘরে সিঁধ কেটে চুরি করে কিছু চাল-ডাল, কাপড়-চোপড় নিয়ে বের হয়ে আসা। অথবা কারও না দেখার অবস্থার সুযোগ নিয়ে টুকটাক কিছু গাছের ফল বা মাঠের ধান কেটে নিয়ে যাওয়া। এর বেশি অপরাধ খুব কমই ঘটত, পারিবারিক কিছু কলহে কিছু দুর্ঘটনা ঘটত। তবে ছোটখাটো অপরাধে ধরা পড়লে সমাজের বিত্তবানদের কেউ কেউ এসে বিচারকের আসনে বসে অপরাধীকে হয় শারীরিক নির্যাতন, নয়তো সামাজিকভাবে বয়কট করার নির্দেশ দিতেন। এটি অনুন্নত সমাজব্যবস্থার সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

আমরা এখন উন্নয়নশীল আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় চলছি। গত প্রায় চার-পাঁচ দশক ধরে আমাদের এই যাত্রা বেগবান হচ্ছে; রাষ্ট্র অবশ্যই কিছু কিছু আইন বিধি-বিধান প্রণয়ন করছে, কার্যকরও করছে। বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প-কলকারখানা, সরকারি-বেসরকারি নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এ ছাড়া এই পাঁচ দশকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, এনজিও, বহুজাতিক কোম্পানি, দাতব্য সেবাপ্রতিষ্ঠান, নানা ধরনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে আসা। ধর্মীয় রাজনৈতিক সংস্থার ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানও এই সমাজের ভেতরে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু সব প্রতিষ্ঠান পরিচালনারই আইন, নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান, ব্যবস্থাপনা কীভাবে উন্নয়নের গতিপথকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে, সেভাবে সব সময় সব সরকার সমানভাবে গুরুত্ব দিতে পেরেছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। অথচ এই উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের গ্রামের সেই সাধারণ মানুষটি থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সর্বস্তরের মানুষ, যারা নিজেদের দারিদ্র্য ঘুচিয়ে উন্নত জীবনের যে হাতছানি দেখা গেছে, তাকে ধরতে সবাই কমবেশি ছুটে এসেছে। কিন্তু সবাইকে শিক্ষা-দীক্ষায় গড়ে তোলার বিষয়টি রাষ্ট্র ১৯৭২-৭৫ সালে যেভাবে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে নতুন শিক্ষা কমিশনের মাধ্যমে মেধা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতায় নতুন প্রজন্মকে গড়ার লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়েছিল, সেটি কিন্তু ১৯৭৫ সালেই থমকে যায়।

গত চার-পাঁচ দশকে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কলকারখানা বিশ্ব বাস্তবতার কারণেই এবং কোনো কোনো সরকারের দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ভিশনারি-মিশনারি পরিকল্পনার কারণে একটি ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হলেও এই অর্থনীতিকে গতিশীল, মানব কল্যাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক ঘাটতি। সেখানে মালিক, শ্রমিক, কর্মজীবী প্রশাসনসহ বিভিন্ন কাজে যারা যুক্ত হয়েছে, তারা তাদের এই অর্থনৈতিক গতির প্রবাহকে সমাজ বিকাশের উচ্চতর ধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে যতটা না ভেবেছে, তার চেয়ে বেশি পূর্ববর্তী ধ্যান-ধারণায় অভ্যস্ত মানুষ হয়ে লুটপাট, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ইত্যাদিতেই বেশি ভূমিকা রেখেছে। যারা বিষয়গুলোতে আধুনিক দুনিয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ইত্যাদিতে অংশ নিয়েছে, তারা অনেক প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে হলেও কিছু নিয়ম-শৃঙ্খলায় উৎপাদনব্যবস্থাকে উন্নয়নশীল দেশ ও সমাজের অপরিহার্য অংশ হিসেবে এগিয়ে নিতে ভূমিকা নিচ্ছে। কিন্তু অনেকেই তেমন দৃষ্টিভঙ্গিতে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়নি।

সুস্থ জীবনযাপনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একজন মানুষ যখন বিধিবদ্ধ নিয়ম ও সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠে, তখন তার জীবন নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ থাকে না, সেটি কল্পনায়ও আসে না। সে ধরনের অবস্থায় প্রতিষ্ঠান ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন উন্নত দেশের বিকাশমান ধারার পথেই অগ্রসর হতে পারে।

এখন যে বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে তা হচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে আধুনিকতার নিয়মনীতি, আইন-কানুন, শৃঙ্খলা ইত্যাদিকে দৃঢ়ভাবে কার্যকর করা গেলেই অপরাধপ্রবণ সমাজ কল্যাণমুখী হয়ে উঠতে পারে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে