মেধা বিকাশে মাদক নির্মূল করা জরুরি

মেধা বিকাশে মাদক নির্মূল করা জরুরি

গত ২৬ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত 'বঙ্গবন্ধু সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতা-২০২২'-এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে জাতির জনকের সুযোগ্য তনয়া প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-গবেষণালব্ধ জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে আগামীতে নেতৃত্ব দানে প্রস্তুত হওয়ার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, 'আমাদের সোনার ছেলেমেয়েরা তোমরা তৈরি হও আগামীতে দেশকে নেতৃত্ব দিতে। সর্বক্ষেত্রেই তোমরা তোমাদের মেধার বিকাশ ঘটাবে এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। যেন বাংলাদেশ আর পিছিয়ে না থাকে, বাংলাদেশ এগিয়ে যায় এবং উদ্ভাবনী শক্তিতে আমাদের ছেলেমেয়েরা আরও উন্নত হয়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তোমাদের চলতে হবে এবং প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের যে বিকাশ ঘটছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।' তিনি আরও বলেন, 'আজকের শিশুরা ভবিষ্যতে এ দেশের কর্ণধার হবে। তারাই তো আমার মতো প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী-শিক্ষক-বড় বড় কর্মকর্তা হবে এবং প্রশাসন, সাংবাদিকতাসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকে দেশের উন্নতি করবে। কাজেই সেভাবে তারা তৈরি হোক।' বক্তব্যে তিনি কৃষি-বিজ্ঞান-স্বাস্থ্য খাতসহ বিভিন্ন গবেষণার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন আজকের মেধাবীরাই আগামীর বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। জনশ্রম্নতি মতে দুঃখজনক হলেও সত্য যে; শিক্ষার চলমান পরিপ্রেক্ষিত পর্যালোচনায় এটি সুস্পষ্ট কতিপয় ক্ষেত্রে নূ্যনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও উচ্চ শিক্ষা বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ-শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ পদায়নে নানামুখী অপকৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। নামধারী এ সব শিক্ষকের হাতে শিক্ষার্থীরা যথার্থ শিক্ষাগ্রহণ ও দেশপ্রেম-মনন-প্রগতি-যুক্তি-জ্ঞাননির্ভর সমাজ নির্মাণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার ব্যাপারে জনমনে ব্যাপক সংশয় তৈরি হয়েছে।

এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য; বাংলাদেশসহ বিশ্বে নরপশুতুল্য মাফিয়াচক্রের কদর্য লোভ-লালসার নতুন সংস্করণ হচ্ছে মাদক আগ্রাসন। ইতিমধ্যেই সমগ্র জনগোষ্ঠী বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মাদকাসক্তির পরিসংখ্যান করোনা অতিমারির চেয়েও ভয়ঙ্কররূপ পরিগ্রহ করেছে। বাংলাদেশও কিন্তু এর বাইরে নয়। অতিপ্রাচীন কাল থেকে সুরা বা মদপান-সুরাসক্তি সমাজে প্রচলিত রয়েছে। পাশ্চাত্য সমাজে বিভিন্ন সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান-অতিথিদের আপ্যায়ন-উৎসব উদযাপনে মদপান একটি আনুষঙ্গিক রীতি। প্রাচ্যের অনেক দেশে এ ধরনের মদপানের সংস্কৃতি স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। যেমন জাপানে জন্মোৎসব-বিবাহ-বিভিন্ন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়-আনন্দ-শোকাবহ অনুষ্ঠানাদি পালন 'সাকে' নামের দেশীয় মদ ছাড়া প্রায় অসম্ভব বটে। প্রাপ্ত বয়স্ক যে কোনো ছেলেমেয়ে প্রতিনিয়তই আড্ডা-অভিষেক-সমাবর্তন ইত্যাদি পর্বকে আনন্দময় করার জন্য মদপান অত্যন্ত সাবলীল ও গ্রহণযোগ্য সামাজিক কৃষ্টিতে পরিণত। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে; প্রায় ৯০ শতাংশ পবিত্র ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী ধর্মপ্রাণ মুসলমান পরিবারে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দেশে সুরা-মদ-মাদক ব্যবহারের ব্যাপকতা চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে। যথাযথ প্রায়োগিক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যত্যয় ঘটলে বেপরোয়া এই মাদক আগ্রাসন থেকে তরুণ প্রজন্মকে উদ্ধার করে সমৃদ্ধ মানবসম্পদ রূপান্তর কঠিন থেকে কঠিনতর পর্যায়ে উপনীত হবে- নিঃসন্দেহে তা বলা যায়।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মাদকের মধ্যে ৩২ ধরনের মাদকের সন্ধান পাওয়া যায়। এ সব মাদকের মধ্যে রয়েছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাই-দেশি-বিদেশি মদ, দেশি-বিদেশি বিয়ার, রেক্টিফাইড স্পিরিট, ডিনেচার্ড স্পিরিট, তাড়ি, প্যাথেডিন, বুপ্রেনরফিন (টিডি জেসিক ইঞ্জেকশন), ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বনোজেসিক ইঞ্জেকশন), মরফিন, আইচ পিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন ইত্যাদি। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আবির্ভাব হয়েছে এলএসডি, ব্রাউনি, ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, এমফিটামিন পাউডার, ডায়েমেখিল ট্রাইপ্টেমিন, এস্কাফ ও ম্যাজিক মাশরুমের মতো ভয়ানক আরও বেশকিছু মাদক। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের রুট 'গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল' (মিয়ানমার-থাইল্যান্ড-লাওস) এবং 'গোল্ডেন ক্রিসেন্ট' (পাকিস্তান-আফগানিস্তান-ইরান)-এর মাঝামাঝি অবস্থানে হওয়ায় প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে অরক্ষিত সীমান্ত পথে সবচেয়ে বেশি মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাদকের প্রবেশপথ হিসেবে বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন ৩২টি জেলাকে ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্ত দিয়ে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা এবং মিজুরামের চারটি পয়েন্ট দিয়ে সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিলস্না এবং ফেনীতে মাদক ঢুকছে। সাম্প্রতিক এ সব রুটে ভয়াবহ মাদক হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদকের পাচার রোধে বাংলাদেশের আহ্বানে ভারত সীমান্তের ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে ফেনসিডিল ও ফেনসিডিল তৈরির উপকরণ সরবরাহ-বহন বন্ধে যথার্থ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে দেশে বর্তমান মাদকসেবীর কোনো যথার্থ তথ্য-উপাত্ত না থাকলেও বেসরকারি সংগঠন মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা 'মানস'র সূত্রমতে দেশে ৭০ লাখের উপর মাদকসেবী রয়েছে। যাদের ৮০ শতাংশই যুবক।

দেশের অর্থনীতিতেও মাদকের বিপুল প্রভাব পরিলক্ষিত। অবৈধ মাদক আমদানির জন্য দেশ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে অবৈধ মাদক আমদানিতে প্রতি বছর কত টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে এর সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব কারও পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। মাদকাসক্তের উপর পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে একজন মাদকাসক্তের ১৫০ টাকার মাদক প্রয়োজন। এই হিসাবে বছরে খরচ হয় ৫৪ হাজার ৭৫০ টাকা। ২৭ ফেব্রম্নয়ারি ২০২১ প্রকাশিত গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত ব্যক্তি ও সংগঠনের ধারণা অনুযায়ী বর্তমানে সারা দেশে সেবনকারীরা প্রতিদিন গড়ে ২০ কোটি টাকার নেশা গ্রহণ করছে। বছরের হিসেবের পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

গত ২৬ জুন ২০২২ 'মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার-বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস' উপলক্ষে আলোচনা সভায় সম্মানিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশের যুবসমাজ ও তাদের মেধা টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বসহকারে ব্যাপকভাবে ডোপ টেস্ট চালু করার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির নিয়োগের ক্ষেত্রে অধিক কার্যকর এই ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা করা হবে। ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে ডোপ টেস্ট করে অনেক মাদকাসক্ত কর্মকর্তাদের চাকরিচু্যত হওয়ার সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি আরও বলেন, 'দেশকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতিকে সামনে রেখে আমরা কাজ করছি। পুলিশ, বিজিবি,র্ যাব, কোস্টগার্ড, আনসার ও ভিডিপির পাশাপাশি নোডাল এজেন্সি হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তরের সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন ও জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। মাদক অপরাধীদের কঠোর আইনের শাস্তির আওতায় আনার জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ এবং অন্যান্য বিধিমালা যুগোপযোগী করে সংশোধনসহ অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০২২ প্রণয়ন করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোতে লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানো হয়েছে। চারটি বিভাগীয় শহরে টেস্টিং ল্যাব নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।'

সামগ্রিক প্রায়োগিক প্রেক্ষাপটে বলা যায় মাদক একটি সামাজিক অভিশাপ। যুব সমাজকে ধ্বংস করার অন্যতম হাতিয়ার। মাদকের রাহুগ্রাস থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। এই সচেতনতা পরিবার থেকে তৈরি হওয়া দরকার। একটি দেশের গতিপ্রকৃতিকে স্বাভাবিক ধারায় প্রবাহিত করার লক্ষ্যে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে পরিপুষ্ট উদ্যমী-কর্মঠ-দক্ষ-যোগ্য কর্মবীরের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। দক্ষ কর্মবীর তৈরি ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সরকারের প্রস্তাবিত উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয়ে আদর্শ-উদ্যমী কর্মবীর সৃষ্টিতে অবশ্যই অবদান রাখবে।

মাদক নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হলে মেধার বিকাশ ও সৃজনশীল মানবসম্পদ উৎপাদন ব্যাহত হবে।

মূলত মুক্তির মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে সোনার মানুষ তৈরিতে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক গুণগত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। গবেষণার নামে নামমাত্র কিছু প্রকল্পের অবতারণা এবং জালিয়াতি-প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ-অপচয়ের বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। শূন্যমেধা-প্রজ্ঞা-অভিজ্ঞতাবিহীন কথিত শিক্ষক-গবেষকদের পুস্তক রচনা-প্রকাশনাও ছলচাতুরী আশ্রিত কিনা তাও তদন্তের দাবি রাখে। নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত এ সব আপাদমস্তক দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নে লিপ্ত ব্যক্তি বিশেষের ক্ষেত্রে শুধু ডোপ টেস্ট নয়; ডিএনএ পরীক্ষাও জরুরি বলে বিজ্ঞজনরা মনে করেন।

লেখক : শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য,

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে