কৃচ্ছ্রসাধন এদেশে কেন দরকার

বেশ কিছুদিন ধরেই যুদ্ধের হাত ধরে একদিকে লাগামছাড়া মুদ্রাস্ফীতি অন্যদিকে ক্রমে ক্রমে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা যেন ধীরে ধীরে সত্যি হতে যাচ্ছে। শ্রীলংকা ও পাকিস্তানে তো বেশ কিছুদিন ধরেই অস্থিরতা জেঁকে বসেছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু পরিস্থিতির পরিবর্তন কতটুকু হচ্ছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
কৃচ্ছ্রসাধন এদেশে কেন দরকার

দেশে আবার বিদু্যতের সংকট তৈরি হয়েছে। বিদু্যৎ উৎপাদনে ঘাটতির কারণে সারা দেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে। অন্যদিকে জ্বালানির অভাবে উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও বিদু্যৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি খাত বিশেষ করে তেল ও গ্যাসের যে টালমাটাল অবস্থা তৈরি হয়েছে তার ধাক্কা লেগেছে বিশ্বের সর্বত্র। তেলের পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম একলাফে আকাশচুম্বী হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বিকল্প হিসেবে পশ্চিমারা উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনে নিজেদের ঘাটতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের তুলনায় পশ্চিমাদের সেই সক্ষমতা একটু বেশিই আছে। তারপরও আসছে শীতে পরিস্থিতি কতটুকু সামাল দেওয়া যাবে সেই আশঙ্কা থেকেই যায়। জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। অন্যদিকে আবার ফুলে-ফেঁপে উঠছে জীবাশ্ম জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ ও কোম্পানিগুলো।

বেশ কিছুদিন ধরেই যুদ্ধের হাত ধরে একদিকে লাগামছাড়া মুদ্রাস্ফীতি অন্যদিকে ক্রমে ক্রমে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা যেন ধীরে ধীরে সত্যি হতে যাচ্ছে। শ্রীলংকা ও পাকিস্তানে তো বেশ কিছুদিন ধরেই অস্থিরতা জেঁকে বসেছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু পরিস্থিতির পরিবর্তন কতটুকু হচ্ছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

সাম্প্রতিক খবর হচ্ছে নানামুখী চাপে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হচ্ছে, অনেক কিছুর মধ্যে করোনা মহামারি ও যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতি জনজীবনে যে অস্বস্তি তৈরি করছে তার ভূমিকাও আছে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা প্রকল্পের একটি ধারণা ছিল অর্থনৈতিক মন্দার কারণে রাশিয়ার জনগণ ভস্নাদিমির পুতিন রেজিমের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠবে। রাশিয়ায় এখনো তেমনটা দেখা না গেলেও এই সারিতে যে আরও অনেকেই থাকবে তা বলাই বাহুল্য। নানা কারণে আমাদের দেশেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রম্নত কমছে। এর পেছনে যেমন সরকারের ভুল নীতির দায় থাকতে পারে একই সঙ্গে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে উদ্ভূত অর্থনৈতিক অবস্থাও সমভাবে প্রযোজ্য।

বর্তমানে পরিস্থিতি উত্তরণে কৃচ্ছ্রসাধনে সবাইকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। দেশ ও বিশ্বের সামগ্রিক অবস্থায় যা খুবই যৌক্তিক। যুদ্ধ কবে শেষ হবে তা এখন যেমন বলা যাচ্ছে না এবং একই সঙ্গে ধনী দেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতা ও সম্পদ কুক্ষিগত করার দ্বন্দ্ব বন্ধের ভবিষ্যদ্বাণী করা যাচ্ছে না। এর বিকল্প উপায় হচ্ছে নিজেদের সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ও যথাযোগ্য ব্যবহার এবং এর মাধ্যমে সব মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকা।

এ তো গেল কৃচ্ছ্রসাধনের একটি কারণ, আপাত বিপদের আশঙ্কার পূর্বপ্রস্তুতি। অন্যদিকে কৃচ্ছ্রসাধনের আরেকটি বড় প্রয়োজন হচ্ছে ইচ্ছেমতো ভোগের প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করা। যার মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছাচার শোষণ বন্ধ, পরিবেশের সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রবণতা কমিয়ে আনা ইত্যাদি। পৃথিবীতে বেশ কিছুকাল ধরে সীমাহীন ভোগবাদিতার কারণে যেমন প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে; একই সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত উৎপাদন ও ভোগের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো পৃথিবীব্যাপী যেমন একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কাছে সম্পদ কেন্দ্রীভূত করছে এবং একই সঙ্গে তা ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। শিল্প বিপস্নব পরবর্তী অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেল, যে মডেলের এখন জয়জারকার, সেই মডেলের হাত ধরেই বিশ্বে প্রাকৃতিক পরিবেশের যে ধ্বংস সাধন হয়েছে তা পৃথিবীর কোটি কোটি বছরের ইতিহাসে বিরল।

জাতিসংঘের তথ্য মতে, পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য নষ্ট হয়ে যায় মূলত অপচয়ের কারণে। অন্যদিকে আমরা যদি বিদু্যৎ সাশ্রয়ী বাতি ব্যবহার করি তাহলে তা বছরে প্রায় ১২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাশ্রয়ের কারণ হবে। এই পরিমাণ টাকার জীবাশ্ম জ্বালানি কম পোড়ানো যাবে। কিন্তু একইভাবে যদি ভোগবিলাসের ধারা অব্যাহত থাকে তাহলে ২০৫০ সালে পৃথিবীর প্রায় সাড়ে ৯ বিলিয়ন জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটানোর জন্য আজকের মতো আরও তিনটা পৃথিবীর দরকার হবে। পাশাপাশি পুঁজিবাদের হাত ধরে ধনী-গরিবের মধ্যে বর্তমান বৈষম্য মহামারি আকার ধারণ করবে।

অনুরূপভাবে আমাদের দেশের অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি এরকম যে সম্পদ থাকলে যেমন ইচ্ছে তেমন ভোগ করা যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যক্তিগত সম্পদের সামষ্টিক দায়বদ্ধতার ধারণাটি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ব্যক্তির অফুরন্ত ভোগের ভুক্তভোগী হয় সমষ্টি, বিশেষ করে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক অংশ। বর্তমান পুঁজিবাদী কাঠামো বেশির ভাগ সময় এই বাস্তবতা শিকার করতে চায় না। অধিকন্তু এই কাঠামো বিশেষ কোনো জনগোষ্ঠীর প্রান্তিকতাকে তাদের অক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা হিসেবে সবার সামনে চিত্রিত করতে চায়।

আমাদের দেশেও এরকম একটি ধনিক শ্রেণি তৈরি হয়েছে যারা নিজেদের ভোগের ক্ষেত্রে যথেচ্ছ সম্পদের ব্যবহার করে থাকে, এটাকে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে দেখিয়ে থাকে। তাদের বিবেচনায় এতটুকু থাকে না যে তার এই ভোগের জোগানের পেছনে অন্যের অবদান কতটুকু এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের কতটুকু শোষণ করা হচ্ছে।

তবে বেশ কিছুদিন ধরেই জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদু্যৎ উৎপাদনে জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী বড় বড় জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির প্রভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের প্রযুক্তি এবং এর বিস্তৃতি এখনো সেভাবে সামনে এগোয়নি। কারণ বর্তমান পদ্ধতিতে ব্যবসা ন্যূনতম দুইভাবে, প্রথমত উৎপাদন যন্ত্রপাতি সরবরাহের মাধ্যমে, দ্বিতীয়ত ধারাবাহিক প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের মাধ্যমে। এই ব্যবসায়িক চক্র থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য আমাদের মতো দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর দেওয়া খুব প্রয়োজন। তা করা গেলে অন্তত এ ক্ষেত্রে আমাদের বাইরের প্রাথমিক জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হবে না। আর এতে যদি কোনো সীমাবদ্ধতা থাকেও তাহলেও তেল-গ্যাস আমদানির মাধ্যমে বিদু্যৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরকারকে যে ভর্তুকি দিতে হয় সেই ভর্তুকির একটা অংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে কেন দেওয়া যাবে না?

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও বর্তমান জ্বালানি সংকট একই সমস্যার দুটি ভিন্ন ফল। একে আমাদের সামনে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর সংকটের একটি খন্ডচিত্র হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই কৃচ্ছ্রসাধন শুধু বিশ্ব অর্থনৈতিক টালমাটাল অবস্থাকে সামাল দেওয়ার জন্যই নয়, বর্তমান অর্থনৈতিক চর্চার গতিধারা পাল্টানোর মাধ্যমে প্রকৃতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যও দরকার। আর আমরা যদি এটি করতে পারি, তাহলে এটা একদিকে যেমন প্রকৃতির সুরক্ষায় নিজেদের দায়িত্বশীল হিসেবে তৈরি করতে পারব, অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তায় আরও আত্মনির্ভরশীল হতে পারব।

বর্তমানের রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের ফলাফল ভালো কিছু হওয়া সম্ভবপর নয়, কিন্তু বর্তমান কাঠামোর নেতিবাচক দিকগুলো থেকে যদি কিছু শিক্ষা পাওয়া যায় সেটাই বা কম কিসে। এত কিছু নেতিবাচকের মধ্যে এই ইতিবাচকটুকুই না হয় আমরা ধারণ করি এবং নতুন দিনের প্রত্যাশা করি। আর এটাই হতে পারে গত কয়েশ বছরের অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি নতুন রূপান্তরের শুরু, আমরা জানি, যে কোনো সংকট থেকেই নতুনের শুরু হয়ে থাকে।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

ঢ়ংসরৎধু@ুধযড়ড়.পড়স

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে