রোববার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট

দেশের উন্নয়নের মূল নায়ক-কৃষক-শ্রমিক-খাদ্য উৎপাদক, রপ্তানি পণ্যের উৎপাদক, রেমিট্যান্স প্রেরক ব্যক্তিরা। তাদের সামনে রেখে আন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে। তাদের অর্থ মানুষ লুটপাট করে খাবে আর তারা কষ্ট করবে, তা দিনের পর দিন চলতে পারে না। এর পরিবর্তনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তবেই অসৎ ব্যবসায়ী, অসৎ রাজনীতিক ও অসৎ আমলাদের দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব হবে। সম্ভব হবে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় সমস্যার যুগপৎ সমাধান
ড. এম এম আকাশ
  ১৫ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০
বাংলাদেশে ডলারের মূল্যমান হঠাৎ করে বাড়েনি। মুদ্রার প্রয়োজনীয় সমন্বয় না করার ফলে সৃষ্ট দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা হঠাৎ যখন বাহ্যিক কারণে অতিরিক্ত ডলারের প্রয়োজন হলো তখন আর সামাল দেওয়া গেল না। অন্য দেশের মূল্যস্ফীতির তুলনায় একটি দেশের মূল্যস্ফীতি বেশি হলে সে দেশের মুদ্রা তুলনামূলক শক্তি হারাবে, এটা অর্থনীতির একটি মৌলিক নিয়ম। আমাদের মুদ্রাবিনিময় হার ডলারের সঙ্গে দীর্ঘদিন সমন্বয় করা হয়নি, দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে আমরা রপ্তানিকে উৎসাহিত করেছি, আমদানিকে করেছি নিরুৎসাহিত। জাতীয় শিল্পের স্বার্থে অতীতে আমরা টাকাকে দীর্ঘদিন অতিমূল্যায়িত রেখেছিলাম। বঙ্গবন্ধুর সময় ১ ডলারের অফিসিয়াল মূল্য কৃত্রিমভাবে ধরা হয়েছিল মাত্র ৪ টাকা ৭৬ পয়সা! আমাদের দেখা উচিত ছিল ডলারের প্রকৃত শক্তি কত? অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে ১ ডলার দিয়ে কতটুকু পণ্য পাওয়া যায়। ডলার সংকট শুরু হওয়ার আগের ১০ বছর দেশটিতে গড়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ১-২ শতাংশ আর বাংলাদেশে তখন মূল্যস্ফীতি ছিল ৫-৬ শতাংশ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের টাকা ডলারের বিপরীতে দীর্ঘদিন মান হারাচ্ছিল, কিন্তু বাংলাদেশ সেটিকে কৃত্রিম উপায়ে ধরে রেখেছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ৪-৫ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতিও এ সময়ে বেড়েছে। বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় প্রায় সব আমদানির দাম ও জাহাজের ভাড়া লাফ দিয়ে ডলারে বেড়ে যায়। আমরা তখন বেশি দামে আমদানি অব্যাহত রেখে দেশে মূল্যস্ফীতিও আমদানি করেছি। দ্রম্নত অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে বর্তমানে ৭-৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি, গুঁড়াদুধ, যন্ত্রাংশ ইত্যাদি প্রধান আমদানির ক্ষেত্রে দাম আরও অস্বাভাবিক বেড়েছে। আগে থেকেই আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল, এখন ঘাটতি আরও বেড়ে গেল। এজন্য হঠাৎ করে দ্রম্নত বড় ধরনের সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিল। ফলে আগে মুদ্রাবিনিময় হার সমন্বয় না করার একটি শাস্তি বাংলাদেশ পেল। আরেকটি শাস্তি হলো হঠাৎ সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকটের শাস্তি। ফলে আমাদের টাকার অবমূল্যায়নটা খুব দ্রম্নত করতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেরও এখন বড় সমস্যা মূল্যস্ফীতি, যা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এদিকে ধারাবাহিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়িয়ে যাচ্ছে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। ব্যাংকটি টানা তৃতীয়বারের মতো মূল সুদের হার তিন-চতুর্থাংশ বা শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়িয়ে তিন থেকে তিন দশমিক দুই পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত করেছে, যা ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ। এদিকে নীতিনির্ধারকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ২০২৩ সালের শুরুর দিকে সুদের হার আরও বাড়ানো হতে পারে, যা জুনের পূর্বাভাস থেকে অনেক বেশি। ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুদের হার বাড়ানোর ফলে ঋণের খরচ আরও বেড়ে যাবে। এতে ডলার আন্তর্জাতিকভাবে আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। ফেডের সুদের হার বাড়ানোয় বাংলাদেশের টাকার মান আরও কমে যাবে। চাহিদার তুলনায় ডলারের জোগান কম হলেই ডলারের মূল্যমান বাড়বে- অর্থনীতির সূত্র তাই বলে। আমাদের ডলার আয়ের বৈধ ক্ষেত্র হলো রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়। এখানে খুব বড় উত্থান-পতন দেখছি না। তাহলে সমস্যা কোথায়? ডলারের চাহিদার দিক থেকে সমস্যাটা হচ্ছে। একটি কারণ তো সবাই বলছে, আমাদের আমদানিকৃত পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। ফলে প্রকৃত চাহিদা বাড়েনি কিন্তু ডলার ব্যয় বেড়ে গেছে। ডলারের চাহিদা বেড়ে গেছে কিন্তু ক্রুড অয়েলের চাহিদা বেশি বাড়েনি। আমদানিকৃত পণ্যের প্রকৃত চাহিদাও বাড়েনি কিন্তু আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। এর জন্য ডলারের চাহিদার ওপর প্রভাব পড়বে সত্য। কিন্তু শুধু এর জন্য ডলারের চাহিদা বেড়েছে বিষয়টি তা নয়। আমরা যেসব পণ্য রপ্তানি করছি তারও তো দাম বাড়ার কথা। কিন্তু অসম বিশ্ববাজারে এবং আমাদের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা কম থাকায় সেটি যে বাড়ছে না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। রপ্তানিকারকরা আন্ডার ইনভয়েসিং করে রপ্তানি আয়ের অর্থটা বিদেশে রেখে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গেস্নাবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি রিপোর্টে বলা হয়েছে। আবার আমদানি পণ্যের দাম বেশি দেখিয়েও অর্থ বাইরে রেখে দেওয়া হতে পারে। এসব বিষয় অবশ্যই খতিয়ে দেখা দরকার। আমাদের যে বলা হচ্ছে আমদানি পণ্যের দাম ৩৬ শতাংশ বেড়েছে সেটি কোন কোন পণ্যে বেড়েছে। সব পণ্যেরই তো ৩৬ শতাংশ বাড়েনি, বাড়ার কথাও না। তাহলে কি বাড়তি ব্যয় দেখিয়ে ওভার ইনভয়েসিং করে অর্থ বিদেশে রেখে দেওয়া হচ্ছে? এ সন্দেহটি আগে থেকেই ছিল এবং বেশকিছু তদন্তে এটি ধরাও পড়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারে। ২০০০ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের মানুষের আমানত ছিল ৪৯৩ কোটি টাকা। ২০২১ সালে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে আগে এটি বেড়েছে। ২০২৩ সালে আমাদের আরেকটি জাতীয় নির্বাচন আছে। তার আগেই ২০২১ সালে হঠাৎ করে এটি ৫৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। প্রশ্ন হলো- এ অর্থ কোথা থেকে গেল। কারা এটা কোথায় এতদিন ধরে জমিয়ে রেখেছিলেন? কেউ কেউ অবশ্য বলে থাকেন, বাইরে আমাদের যেসব বাংলাদেশি বসবাস করছেন এটা তাদের টাকা, তারাই এটা জমা রেখেছেন। কিন্তু তাহলে হঠাৎ করে এত বাড়ল কেন? আমার ধারণা সুইস ব্যাংকে দেশে অবস্থান করা বাংলাদেশিরাও আছেন। সরকার বলছে, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের তথ্য চেয়েছি, কিন্তু পাচ্ছি না। তবে বিষয়টি নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। এখন সরকারের পক্ষ থেকে হিসাবটা পরিষ্কার করা দরকার। এক্ষেত্রে রাখঢাক না করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। কেন কে টাকা পাঠাল। সরকার তো বলছে কেউ যদি টাকা না পাঠিয়ে এখানে বিনিয়োগ করে তবে তাকে কম কর দিতে হবে। আরও নানা সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে। তার পরও কেন তারা টাকা বাইরে পাঠাচ্ছে, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। তার মানে এখানে টাকা রাখাটা তারা নিরাপদ বোধ করছে না। সাধারণত নির্বাচনের আগে আগে ধনী রাজনীতিবিদরা এখানে টাকা রাখাকে নিরাপদ মনে করেন না। কিন্তু কেন? নির্বাচনের সময় চাঁদা তোলা হয় এবং যারা সবল ও দুর্বল উভয়কেই টাকা দিতে হয়। ফলে এ ভয়ে তারা টাকা বাইরে পাঠিয়ে থাকতে পারে। তাছাড়া নির্বাচনের পর নিজেরা হেরে গেলে এবং বিপরীত দল ক্ষমতায় এলে শাসকশ্রেণিই তাদের টাকা বাইরে পাঠিয়ে দিতে পারে। নির্বাচনের আগে আগে সুইস ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ আমানত জমা হওয়ায় প্রশ্ন উদয় হওয়াটা স্বাভাবিক। ফলে চলতি বছরেও আমদানি ব্যয় বেশি হওয়া এবং সুইস ব্যাংকে টাকা বেশি জমা হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এগুলো হচ্ছে সংকটের অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক কারণ। বর্তমান সরকারের সময় অনেক 'ক্যারোট' পলিসি গ্রহণ করা হয়েছে অর্থ পাচার রোধে এবং অবৈধ অর্থ অর্থনীতির মূল ধারায় আনতে। এগুলো করা হয়েছে কিন্তু তাতে কোনো সুফল মেলেনি। অথচ ২০০৭ ও ২০০৮ সালে 'স্টিক পলিসি' গ্রহণ করার মাধ্যমে বিপুল অর্থ তাৎক্ষণিক উদ্ধার হয়। ফলে এবারের বাজেটে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ উদ্ধারে যে পলিসি গ্রহণ করা হয়েছে তা কি আদৌ কার্যকর হবে সেটা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে। কারণ এখানে শুধু ক্যারোটের কথা আছে, কোনো স্টিকের কথা প্রায় নেই, থাকলেও সুশাসনের অভাবে তা কার্যকর হয় না। বস্তুত সেনাশাসনের অনাকাঙ্ক্ষিত অধীন ২০০৭ ও ২০০৮ সালের মতো অর্থ উদ্ধার আর স্বাভাবিক সময়ে কখনো হবে না বলেই মানুষের এক ধরনের বিশ্বাস জন্মে গেছে। এটা গণতন্ত্রের জন্য মোটেও শুভ নয়। ফলে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়, গণতন্ত্রকে ভবিষ্যতে রক্ষা করতে হলে কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে ক্যারোটের চেয়ে স্টিক অনেক বেশি ব্যবহার করতে হবে। তাই এখন সরকারের উচিত কিছু স্টিক ব্যবহার করা নিজের বিরুদ্ধে নিজের। বিশেষ করে অনুগত বিরোধী দল দিয়ে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। সরকার শুদ্ধাচারের আইন করেছে, কিন্তু অশুদ্ধাচার এর পরও ক্রমবর্ধমান। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মুদ্রার মানের ধনাত্মক সম্পর্ক বিদ্যমান। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে আর মুদ্রার মান স্থিতিশীল থাকবে সেটি হবে না। অন্যান্য দেশের সমতালে মূল্যস্ফীতি হলে দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন বেশি হওয়ার কথা নয়। প্রতিটি বিষয়ই কিছু সূত্র মেনে পরিচালিত হয়। এখানে সব জিনিসের দাম বাড়বে আর মুদ্রার মান শক্তিশালী হবে বা ক্রয়ক্ষমতা ঠিক থাকবে, তা তো হবে না। অন্যান্য জায়গায় ও বাংলাদেশে সমতালে মূল্যস্ফীতি বাড়লে তাহলে মুদ্রার মান ঠিক থাকবে। ডলারের চাহিদা ও সরবরাহ ছাড়াও উৎপাদনশীলতা, উৎপাদিত পণ্যের দামের স্থিতিশীলতা থাকতে হবে। আমাদের এখানে হয়েছে স্ট্যাগফ্লেশন। একদিকে করোনাপরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ হচ্ছে না, ফলে উৎপাদন বাড়ছে না। চাহিদা তো আর থেমে থাকছে না। সুতরাং উৎপাদন যদি স্থবির হয়ে পড়ে, তাহলে আবশ্যকীয় পণ্যের দাম এমনিতেই বাড়তে থাকবে। মূল্যস্ফীতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, উৎপাদক বেশি দাম দিয়ে কাঁচামালসহ অন্যান্য জিনিস কিনছে। পরিবহণ ব্যয় বাড়ছে ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং ফলে পণ্যের দাম বাড়ছে। স্ট্যাগফ্লেশনের পেছনে কাজ করছে মন্দা ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, একই সঙ্গে! সেটি কেইন্সীয় মুদ্রানীতির মাধ্যমে সমাধান করা যাবে না। সে কারণে সহসাই ডলারের মূল্য স্থিতিশীল না হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। এখন চ্যালেঞ্জ হলো- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। কীভাবে করব সেটিই দেখার বিষয়। দুটি উপায়ে দেশের ভেতরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। একটি হলো, সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া। বিশেষত কায়েমি স্বার্থকে ঘিরে যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে সেটি নিয়ন্ত্রণে তদারক জোরদার এবং বাজারে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করতে হবে। ব্যবসায়ীদের অনেক ক্যারোট দেওয়া হয়েছে। প্রণোদনা, স্বল্প সুদে ঋণ, শুল্ককর মওকুফ, ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ প্রভৃতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এসব সুবিধা নিয়েও অতিমুনাফার লোভ ত্যাগ করতে পারেননি। তারা মজুত করেছে এবং মাত্রাতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করছে। এতে বোঝা যাচ্ছে ক্যারোট পলিসি কাজ করছে না। তাই এখন স্টিক পলিসি গ্রহণ করা উচিত। সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া, মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা করলে শাস্তির ব্যবস্থা, অতিরিক্ত মজুত করলে তা জব্দ করা ইত্যাদি পলিসি নেওয়া প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করতে পারছেন না কেন? নিশ্চয়ই ঋণটি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হয়নি। করা হলে তো মুনাফা আসার কথা। অনুৎপাদনশীল বিনিয়োগে মুনাফা আসবে না। মেগা প্রকল্পে যে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে তাতেও নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অর্থ এখনই ব্যয় হয়ে যাবে কিন্তু ফলাফল আসবে অনেক দেরিতে। ফলে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির একটি চাপ তৈরি হবে। দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে। ছোট ছোট কিন্তু অর্থনীতির জন্য খুবই কার্যকর এমন প্রকল্পগুলো এখন বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। দুর্নীতি ও অপচয়ের কথা আর নাইবা বললাম। এগুলো দ্রম্নতই বন্ধ করা দরকার। লাখ টাকার পর্দা বা বালিশ কেলেঙ্কারি অথবা সড়ক-সেতু নির্মাণে রেকর্ড ব্যয়ের লাগাম অবশ্যই টেনে ধরতে হবে। এগুলো অবকাঠামোগত সমস্যা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা বিশ্বব্যাংকের ঋণ বাংলাদেশকে হয়তো কিছু সময়ের জন্য কুশন দেবে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা মোকাবিলা করতে যেসব অপ্রিয় সংস্কার করতে হবে তা স্থগিত রাখার সুবিধাও দেবে। এখন যদি বাংলাদেশ এ অর্থের বিনিময়ে সংস্কার থেকে সরে আসে তাহলে আখেরে ক্ষতি হবে। এটাকে বলা হয় সফট বাজেট সিনড্রোম। বাজেটে ঘাটতি হলো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নিলাম। আমরা এক আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋণ শোধ করতে পারলাম না আরেকটি আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে শোধ করলাম। তাদের জাতীয় স্বার্থবিরোধী শর্তগুলোও গিলে নিলাম। অর্থনীতি যে কারণে সংকটে পড়েছে সেটি ঋণ দিয়ে ঠেকা দেওয়া হলো। সংকটের উৎস অটুট থেকে গেল। বেসরকারি বিদু্যৎকেন্দ্র থেকে ২০০৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ২৫ শতাংশ বেশি দামে বিদু্যৎ কিনেছে সরকার। ইচ্ছা করলে সরকার ২৫ শতাংশ কম দামে বিদু্যৎ কিনতে পারত, কিন্তু তাদের সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকার এ অর্থ দিয়েছে। একে ড. মুস্তাক খান নাম দিয়েছেন 'অপ্রতিযোগিতামূলক সমঝোতা'। এতে সরকারের প্রতি বছর ভর্তুকি বাবদ ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার বাড়তি ব্যয় হয়েছে। সরকার এখানে ধনীর ভর্তুকিকে ভোক্তার ভর্তুকি আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখতে চাচ্ছে। ভর্তুকির অর্থটা রাজস্ব থেকে মেটানো হয়েছে। জনগণকেই সর্বশেষ বাড়তি ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হয়েছে। এক্ষেত্রে বেসরকারি বিদু্যৎ কোম্পানিকে সুবিধা প্রদান করা হয়েছে জনগণের করের অর্থ থেকে। বেসরকারি খাত এক জোট হয়ে সরকারের কাছে বেশি দামে বিদু্যৎ বিক্রি করেছে আর সরকার জেনেশুনে বেশি দামে সেটি কিনেছে। এটি আনহোলি অ্যালায়েন্স। সরকার কেন বেশি দামে বিদু্যৎ কিনল, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। এছাড়া সরকারের বিরুদ্ধে বিশেষজ্ঞদের আরেকটি অভিযোগ, সে ক্ষেত্রে সিস্টেম লসের নামে অপচয়/দুর্নীতি এবং দেশীয় সক্ষমতার পরিবর্তে আমদানি লবিকে প্রশ্রয় দিয়েছে। সরকারের কেউ এর সুবিধাভোগী কিনা তাও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। দোষটা সরকারের। সংকটকে নানাভাবে দেখা যায়। একটি হলো সংকটের প্রকাশ আরেকটি হলো সংকটের গভীরতর কারণ। সংকটের মূল কারণগুলো দূর না হলে সংকটের কিছু উপশম নিরাময়ে প্রলেপ দিয়ে সমাধান হবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান সংকটের বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের দেশের ক্ষমতা কাঠামো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষমতা প্রশাসনের মধ্যে বিস্তৃত, রাজনীতির মধ্যে বিস্তৃত, অর্থনীতি ও ব্যবসার মধ্যে বিস্তৃত। ফুকোর তত্ত্ব অনুযায়ী এ তিনটি পর্যায়েই ক্ষমতা পরিচালিত হয় দ্বন্দ্বের মাধ্যমে। এ জায়গায় যদি একটি পক্ষের জোট তৈরি হয়ে যায়- অসৎ আমলা, অসৎ অর্থনীতিবিদ ও অসৎ রাজনীতিবিদ, তাহলে তারা একে অন্যকে সহায়তা করবে এবং একচেটিয়াতন্ত্র বা কতিপয়তন্ত্রের উদ্ভব হবে। সেটা কী অর্থনীতি, কী রাজনীতি, কী ব্যবসা সর্বত্রই তা হবে। তখন তাদের শক্তি বিগ পুশ ছাড়া ভাঙা যায় না। যখন সরকার এদের বিরুদ্ধে ছোটখাটো ব্যবস্থা নেয় তখন তারা চতুর্দিক থেকে একজোট হয়ে তা প্রতিহত করবে। ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে যেসব রাজনীতিবিদ তাদের কাছ থেকে অর্থ ও সুবিধা পায়, তারা পাশে এসে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। সরকার ব্যবস্থা নিলেও পরে পিছিয়ে যাবে। সরকার যদি ব্যবসায়ী ও জোটবদ্ধ বা নির্ভরশীল রাজনৈতিক অসৎ শক্তিকে যুক্তভাবে মোকাবিলা করে ব্যবস্থা নিতে যায় এবং তখন যদি প্রশাসনিক শক্তি আবার তার পক্ষে কাজ না করে অর্থাৎ অসৎ ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকদের রক্ষায় প্রশাসনও তাদেরই পক্ষে যায় তাহলে স্টিক পলিসি কাজ করবে না। কারণ যাদের দিয়ে কঠোর নীতি ও আইন প্রয়োগ করা হবে তারাও যদি এ নেক্সাসে যুক্ত হয়ে পড়ে তাহলে কোনো কিছুই আর কাজ করবে না। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরে আশা শাসক দলের ভেতরে ব্যাপারটি হয়েছেও তাই। রাজনৈতিক শক্তি, ব্যবসায়িক শক্তি ও প্রশাসনের শক্তি এক হয়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম করছে। এখানে কোনো নীতিই আর কাজ করছে না। প্রশাসনকে মাঠপর্যায়ে ঘুস দিয়েই ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকরা কিনে নেবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি অর্থাৎ সরকার প্রধানকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে অসৎ রাজনীতি, ব্যবসায়ী ও আমলাদের দিয়ে কাজ না করে অপেক্ষাকৃত সৎ রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও আমলাদের দিয়ে কাজ করাতে হবে। একে আমরা বলি বিকল্প ক্ষমতা কাঠামো নির্মাণের ইসু্য। অসৎ লোকগুলো অনেক শক্তিশালী হয়ে গেছে এবং এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলে সৎ ব্যক্তিদের শাস্তি পেতে হয়। ফলে কেউ আর সাহস দেখাচ্ছে না। এখানে রাষ্ট্রের প্রণোদনা কাঠামো উল্টো হয়ে গেছে। দুষ্টের লালন আর শিষ্টের দমন করছে রাষ্ট্র। শুধু একটি গ্রম্নপ কখনই শক্তিশালী হতে পারে না। তিনটি ফোর্স এক হয়েছে বলেই তাদের এত শক্তি। এদের সেতুবন্ধন ভেঙে দিতে হবে। এক্ষেত্রে বিকল্প রাজনীতি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় সেখানে বিরোধী কোনো আলোচনা হচ্ছে না। তাছাড়া নির্বাচনটি হয়ে গেছে মানি, ম্যানিপুলেশন ও মাসলনির্ভর। এখানে জনগণের কোনো ভাষা প্রকাশের ক্ষমতা নেই। অসৎ আমলা, অসৎ রাজনীতিক ও অসৎ ব্যবসায়ীরাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। এটি একটি দুষ্টচক্র। এখানে নির্বাচন তো ঠিকমতো করা যাবে না। কারণ ব্যবসায়ীরা তাদের স্বার্থ রক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে তাদের প্রার্থীকে জিতিয়ে নিয়ে আসবে। প্রথমত মনোনয়নই ভালো লোককে দিতে পারা যাবে না। সুতরাং প্রতিযোগিতা হবে খারাপ লোকদের মধ্যে। খারাপ লোকদের মধ্যে যাদের শক্তি বেশি হবে তারাই জিতবে। না জিতলেও একটি খারাপ লোকের বদলে আরেকজন কম খারাপ লোক আসবে। ভালো লোকের আসার সুযোগ এখানে কম। ভালো লোক যদি সংসদে না আসতে পারে বা কম আসে তাহলে সংসদে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে না। এখানে প্রধানমন্ত্রীরও সমস্যা তৈরি হয়েছে। কারণ তিনি জানেন তিনি সংসদকে ক্ষেপিয়ে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। এ অবস্থায় মানুষ রাস্তায় নামলে পরিবর্তন আসবে, নতুবা আসবে না। শ্রীলংকার উদাহরণই সর্বসাম্প্রতিক। এর আগে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশও হয়েছিল কিন্তু তা হয়েছিল দুর্নীতি ও শোষণের বিরুদ্ধে, একচেটিয়াতন্ত্র ও কতিপয়তন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ফলে। সমাজে ৫ শতাংশ চরম খারাপ ও ৫ শতাংশ চরম ভালো। মাঝখানে যারা থাকেন তাদের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে যাবে? এদের বলা হয় পলিটিক্যাল ভ্যারিয়েবল ফোর্স। এরাই নির্ধারণ করে কারা ক্ষমতায় থাকবে। কিন্তু তারা দোদুল্যমান। একবার ভালোর দিকে যায়, আবার একবার খারাপের দিকে যায়। মানুষ ভালোর দিকে যাচ্ছে না কারণ অনেক ধরনের ভয় রয়েছে। এর মধ্যে গুম-খুন, মামলা-হামলা-হয়রানি ইত্যাদি। কিন্তু ইতিবাচক আশা ছাড়া আন্দোলন হয় না। কেউ কি এটি তৈরি করছেন? যাদের এটি করার কথা তারাও ঠিকমতো তা আন্তরিকভাবে করছেন না। তারাও কষ্ট করতে রাজি হচ্ছেন না। ফলে মানুষ সে রকম নেতৃত্ব খুঁজে পাচ্ছে না। যারা সমাজের ভালো চান, রাষ্ট্রের ভালো চান তাদের এক হয়ে মানুষের কাছে যেতে হবে। দেশের উন্নয়নের মূল নায়ক-কৃষক-শ্রমিক-খাদ্য উৎপাদক, রপ্তানি পণ্যের উৎপাদক, রেমিট্যান্স প্রেরক ব্যক্তিরা। তাদের সামনে রেখে আন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে। তাদের অর্থ মানুষ লুটপাট করে খাবে আর তারা কষ্ট করবে, তা দিনের পর দিন চলতে পারে না। এর পরিবর্তনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তবেই অসৎ ব্যবসায়ী, অসৎ রাজনীতিক ও অসৎ আমলাদের দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব হবে। সম্ভব হবে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় সমস্যার যুগপৎ সমাধান। \হম লেখক : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, অর্থনীতি বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে