জা হা ঙ্গী র ন গ র বি শ্ব বি দ্যা ল য়

ছুটি হয়েছে অথচ ছুটি মেলেনি

প্রকাশ | ০৮ জুন ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট: ০৮ জুন ২০১৯, ১১:১১

নুর হাছান নাঈম
গ্রীষ্মকালীন অবকাশ ও ঈদুল-ফিতর উপলক্ষে ক্যাম্পাসে দীর্ঘ ছুটি চলছে। বন্ধের ঘোষণা পেয়ে সবাই খুব উৎফুলস্ন। সহপাঠী, জুনিয়র অথবা সিনিয়র যার সঙ্গেই দেখা হয় তার একই প্রশ্ন 'বাড়ি যাচ্ছিস/যাবি/যাবেন কবে'। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখরিত টিএসসি, বটতলার কোলাহল, টারজানের সন্ধ্যার আড্ডা, ক্যাফেটোরিয়া ও কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের বিকেল ও সন্ধ্যার নিয়মিত চিত্র যেন কিছুদিনের জন্য হারিয়ে গেছে। তবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেককেই পরিবার ছেড়ে ছুটির সময়টা কাটাতে হচ্ছে ক্যাম্পাসেই। প্রিয়জনের জন্য, প্রিয়জনদের খুশির জন্য তাদের সঙ্গে মিলিত হতে না পারাটা এক অন্যরকম বেদনার। এমনই একজন মো. হাসনাইন আহমেদ সুমন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র সে। নিজের অন্ন সংস্থান এবং পরিবারের মুখে একটু হাসি ফোটাতে ব্যক্তিগত আনন্দের মুহূর্তটুকুও বিসর্জন দিয়ে ছুটতে হয় টিউশনিতে। সবাই ঈদের ছুটিতে আগে আগে বাড়ি যাওয়া, ছুটি কাটানো, ঘোরাঘুরির পরিকল্পনায় যখন ব্যস্ত তখন কাউকে ছোট বোনের নতুন জামা কেনার টাকা জমাতে ক্যান্টিনের বিস্বাদ খাবার খেয়ে সেহরি করতে হয়। আর দিন শুরু হলেই টিউশনির পিছনে ছুটতে হয়। মা-বাবা, ভাই-বোনের দেখভাল করতে হয়। সংসারের টানাপড়েন নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে বাধ্য হয়ে দিনরাত টিউশনি করাতে হয়। অপেক্ষা শুধু মাস শেষে পরিবারের মুখে কিছুটা হাসি ফোটানো। এতেই মনে প্রশান্তি আসে, আসে তৃপ্তির হাসি। এমন পরিস্থিতিতে আট-দশজন বন্ধুর মতো ঘোরাফেরা, ছুটিতে কোথাও ঘুরতে যাওয়া তার কাছে রঙিন এলইডি টিভিতে সাদাকালো পর্দায় প্রিয় দলের বিশ্বকাপ খেলা দেখার মতোই মনে হয়। সুমন বলেন, 'মা-বাবা ও চার ভাই-বোনের সংসার। বাবা দিনমজুর। অসুস্থ শরীরে শ্রম বিক্রি করে চলে পরিবারের ভরণ-পোষণ। তবুও কখনো কখনো অর্ধাহারে দিন কাটে। ছোটকাল থেকে অভাবের সংসার। বাস্তবতার সঙ্গে সংগ্রাম করে প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তির বলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছি। সংসারের টানাপড়েন নিজের পড়াশোনার খরচ যোগাতে রাত পর্যন্ত টিউশনি করি। অথচ ভাই-বোনদের নতুন জামার আবদার পূরণে প্রতিদিন ছুটতে হয় টিউশনির বাসায়। বাড়িতে টাকা পাঠানোর চিন্তা যখন প্রকট তখন পড়ালেখা, স্বাদ, আহ্লাদ খেলাধুলা খুবই নিছক ব্যাপার। মাস শেষে কিছু টাকাই যেন সারা মাসের কষ্টকে ভুলিয়ে দেয়। বাড়তি ভাড়া দিয়ে বাড়িতে না গিয়ে টাকাটা পাঠাতে হবে ছোট ভাই-বোনদের দুমুঠো ভাতের জন্য। যখন বাবা ফোন করে বলে টাকাটা পেয়েছি তখনই ঈদের আনন্দ অনুভব করে এরা। এসব কথা বলার সময় চোখজোড়া পানিতে টলমল করে সুমনের। তবে টিউশনিতে কিছু ঝামেলাও পোহাতে হয়। এক ঘণ্টার টিউশনিতে যাওয়া-আসায় অনেক সময় তিন-চার ঘণ্টা সময় অপচয় হয়। শিক্ষার্থীর পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক না হলে কিছু অভিভাবক তিরস্কার করতেও পিছপা হয় না। তবুও রোদ, বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রতিদিন চলতে থাকে ছুটে চলা। সময়মতো বেতন না পাওয়া, নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত পড়ানো, শিক্ষার্থী কিংবা তার পরিবার থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাপ্য সম্মানটুকু না পাওয়ার মতো হাজারো না বলা গল্পের ভান্ডার প্রচলিত টিউশন। সুমনের এই গল্প বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন অনেক শিক্ষার্থীরই জীবনের গল্প। সুমন যেন তাদেরই প্রতিচ্ছবি। ছাত্রজীবনে টিউশনি করানো একদম স্বাভাবিক কিন্তু তা যখন হয় জীবিকার একমাত্র তাগিদ তখন সেটা হয়ে যায় দুর্বিষহ। তাদের কাছে এক একটি উৎসব যেন স্মরণ করিয়ে দেয় বিখ্যাত সেই তত্ত্বকথা 'মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্ণধাররাই ধরণীর আসল রূপ দেখতে পায়'। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যখন সবাই ট্রাভেল টু হোম লিখে স্ট্যাটাস দিচ্ছে তখন এসব সংগ্রামী মানুষ মাসের শেষ তারিখের জন্য প্রতীক্ষারত। অবসান হোক অবনতির। মুক্তিপাক শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্বাধীন হোক শিক্ষা।