সেই রাতের কথা...

সেই রাতের কথা...

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্য সামরিক অভু্যত্থান সংঘটিত করে এবং নৃশংসভাবে সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ধানমন্ডি ৩২-এর বাসভবনে হত্যা করে।

১৪ আগস্ট ১৯৭৫ সাল। দিনটি তেমন একটা আনন্দের ছিল না। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছিল অনর্থকই অস্থিরতা। ১৫ আগস্ট পরের দিন রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যাবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্যক দর্শনে। নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সতর্ক তা নিয়েই। কিন্তু কে জানত ওই সময়ই ঢাকার উত্তরপাড়ায় চলছে বঙ্গবন্ধু হত্যার মহড়া।

গোলাগুলির শব্দ শুনে বারান্দায় এসে দাঁড়ান বঙ্গবন্ধু। ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন গৃহকর্মী আবদুল ও রমা। শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কথায় রমা নিচে নেমে এসে দেখেন, সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য গুলি করতে করতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের দিকে এগিয়ে আসছে। প্রাণের ভয়ে রমা দৌড়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরিহিত বঙ্গবন্ধু নিচতলায় নামছেন। রমা ঘাতকদের কথা বঙ্গবন্ধুকে জানিয়ে সরাসরি দোতলায় উঠেন। শঙ্কিত অবস্থায় ছোটাছুটি করছেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। রমা বেগম মুজিবের দিকে তাকিয়ে 'সৈন্যরা বাড়িতে প্রবেশ করছে' এ কথা বলে তিনতলায় চলে যান এবং ঘুম থেকে ডেকে তোলেন বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল ও তার স্ত্রী সুলতানা কামালকে। রমার মুখে এসব ঘটনা শুনে শার্ট-প্যান্ট পরে নিচতলায় নামতে থাকেন শেখ কামাল। পেছন পেছন শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল আসেন দোতলা অবধি। সুলতানা কামালের সঙ্গে দোতলায় নেমে আসেন রমাও। এসেই শেখ জামাল ও তার স্ত্রী রোজী জামালকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। সুলতানা কামাল, শেখ জামাল ও তার স্ত্রী রোজী জামাল দোতলায় শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কক্ষে যান। বাইরে গুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। নিচতলার অভ্যর্থনা কক্ষে শঙ্কিত মনে পায়চারী করছেন বঙ্গবন্ধু। তার সামনেই নানা স্থানে ফোন করতে থাকেন ব্যক্তিগত সহকারী এ এফ এম মহিতুল ইসলাম। পুলিশ কন্ট্রোল রুম ও গণভবন এক্সচেঞ্জে চেষ্টার একপর্যায়ে মহিতুলের কাছ থেকে রিসিভার টেনে নিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, 'আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব...।' এটুকুই। কথা শেষ করতে পারলেন না বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জানালার কাচ ভেঙে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি এসে লাগে অভ্যর্থনা কক্ষের দেয়ালে। এক টুকরো কাচে ডান হাতের কনুই জখম হয় মহিতুলের। টেবিলের পাশে শুয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু। কাছে টেনে মহিতুলকেও শুইয়ে দেন। এ সময় গৃহকর্মী আবদুলকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে তার পাঞ্জাবি ও চশমা পাঠিয়ে দেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। যখনই গুলির শব্দ থামে তখনই উঠে দাঁড়ান বঙ্গবন্ধু। এক সুযোগে পাঞ্জাবি ও চশমা পরেন এবং অভ্যর্থনা কক্ষ থেকে বের হয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ান। পাহারায় থাকা সেনা ও পুলিশ সদস্যদের বলেন, ' বাইরে এত গোলাগুলি হচ্ছে, তোমরা কী করছ?' এ কথা বলেই দোতলায় উঠে যান বঙ্গবন্ধু।

সিঁড়ির মাঝখানে এসে দাঁড়াতেই সিঁড়ির নিচে অবস্থান নেয় মেজর বজলুল হুদা ও মেজর এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী। এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী কিছু একটা বললে সরে দাঁড়ায় এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ। সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে বজলুল হুদা ও নূরের হাতের স্টেনগান। আঠারোটি গুলি ঝাঁজরা করে বঙ্গবন্ধুর বুক ও পেট। বিশালদেহী মানুষটি ধপাস করে পড়ে যান সিঁড়ির ওপরে। বঙ্গবন্ধু চলে যান না ফেরার দেশে। বুকের তাজা রক্তে ভেসে যায় সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে সেই রক্তের স্রোত।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দোতলায় উঠে আসে মেজর আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন। সঙ্গে সৈন্যরাও। গুলি আর ধাক্কায় একসময় দরজা খুলে সামনে দাঁড়ান শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। সবাইকে নিচতলায় নামতে নির্দেশ দেয় খুনিরা। নিচে নামতে থাকেন বেগম মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমা। সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। বেগম মুজিব কান্নাজড়িত কণ্ঠে চিৎকার দিয়ে বলেন, 'আমি যাব না, আমাকে এখানেই তোরা মেরে ফেল।' শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে যাওয়া হয়। আর বেগম মুজিবের কথা শুনে তাকে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর সেই ঘরে ঘাতক আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ শেখ জামাল, সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে গুলি করে হত্যা করে। শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নিশ্চল দেহটি ঘরের দরজায় পড়ে থাকে। বাঁ দিকে পড়ে থাকে শেখ জামালের মরদেহ। রোজী জামালের মুখে গুলি লাগে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ফ্যাকাসে হয়ে আসে সুলতানা কামালের মুখ। নিচে দাঁড় করানো হলো শেখ নাসের, শেখ রাসেল আর রমাকে। শেখ নাসের খুনিদের উদ্দেশে বলেন, 'আমি তো রাজনীতি করি না। ছোটোখাটো ব্যবসা করে খাই। আমাকে কেন মারবে?' অভ্যর্থনা কক্ষের বাথরুমে নিয়ে গুলি করা হয় তাকে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় 'পানি... পানি...' বলে গোঙাতে থাকেন নাসের। কিন্তু পাপিষ্ঠ ঘাতকরা পানির বদলে তার ওপরে পুনরায় গুলি চালায়।

রমাদের সঙ্গে সেদিন লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল ১১ বছরের ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলও। অসহায় শিশুটি প্রথমে রমাকে ও পরে মহিতুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরে বলে, 'ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো?' কোনো জবাব নেই গৃহকর্মী রমার মুখে। মহিতুল বলেন, 'না ভাইয়া, তোমাকে মারবে না।'একথা শোনার পর শেখ রাসেল তার মায়ের কাছে যেতে চায়। কথামতো দোতলায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। কিন্তু মায়ের কাছে নয়, পাঠানো হয় যমের দুয়ারে। গুলি করে হত্যা করা হয় রাসেলকে। অক্ষিকোটর থেকে চোখ বেরিয়ে আসে। থেঁতলে যায় মাথার পেছনের অংশ। প্রাণহীন রক্তমাখা ছোট্ট শরীরটি পড়ে থাকে সুলতানা কামালের পাশে।

\হঅন্যদিকে চতুর্থ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী দলটিকে সাভারে সন্নিবিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত সম্ভাব্য বিরোধী আক্রমণ ঠেকানোর জন্য পাঠানো হয়। একটি ছোটোখাটো লড়াইয়ের পর ১১ জনের মৃতু্য হলে সরকারের অনুগতরা নিজেকে সমর্পণ করে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের চারজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য-বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলী, সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আ হ ম কামারুজ্জামানকে আটক করা হয়। তিন মাস পরে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরে তাদের সবাইকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

এতসব শোকের ভেতরেও সেই সময়ে আনন্দের সংবাদ ছিল এটাই যে, হত্যাকান্ডের সময় বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তার দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছিলেন না। বড় মেয়ে শেখ হাসিনা স্বামীর সঙ্গে জার্মানিতে ছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানাও। তাই তারা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। পরে দুইবোন ভারত সরকারের অনুমতি গ্রহণ করে ভারতে চলে আসেন। নির্বাসিত অবস্থায় দীর্ঘদিন দিলিস্নতে বসবাস করতে থাকেন এবং ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে