শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
walton1
গল্প

ল্যামপোস্টের বাতি

এখনো প্রায় কয়েকটি গ্রাম উড়ে যেতে হবে তাকে। শহরের নিকটবর্তী মস্ত রঙিন দালানের সম্মুখেই সেই ল্যামপোস্টটা। সেখানেই তার আবাসস্থল। প্রতিদিনের ন্যায় আজও উড়ে যাচ্ছে তার গৃহে, কিন্তু আজকের যাওয়াটা অন্য দিনের থেকে আলাদা। সারা দিন বহু মাঠ-ঘাট-রাস্তা- বাজার পাড়ি দিয়ে এসেছে সে। তবুও তার মুখে ক্লান্তির ছাপটুকুও নেই। মনে মনে সে ভাবে, অন্তত এই টুকুন কষ্টের বিনিময়ও যদি ফিরে পাওয়া যায়। তাহলেই তো সফলতা।
মুহাম্মাদ রাহাতুল ইসলাম
  ২৭ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
আকাশটা একদমই পরিষ্কার। আশপাশে মেঘের চিহ্নটুকুও যেন নেই। দুপুরের প্রজ্বলিত সোনালি সূর্যটাই এখন নিবু নিবু করছে পশ্চিম আকাশে। একটু পরেই সে চলে যাবে আপন নীড়ে। নদীর পানি একদমই স্থির। মাঝে মাঝে ভাটার স্রোতে ভেসে আসছে দুয়েকটি কচুরিপানা। আবহাওয়া একেবারেই শান্ত সুষ্ঠু বলা যায়। মৃদু বাতাস বইছে, বাতাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচছে গাছের পাতাগুলোও। একটু দূরেই কয়েকটা ডিঙি নৌকায় পাল তুলে বসে আছে কয়েকজন বৃদ্ধ মাঝি। এই মোহনীয় পরিবেশে উড়েই চলছে ছোট্ট চড়ুই পাখিটা। কারও কাছে নিজের অব্যক্ত যন্ত্রণা ব্যক্ত করতে পারছে না। তার চক্ষুদ্বয়ে ঝরছে কচি দু'টি সন্তান ও প্রিয়তম স্ত্রী হারানোর অসহ্য বেদনার অশ্রম্ন। দু'পায়া দৈত্যের ওপর তীব্র ঘৃণা আসছে তার। ভাবতেই গা শিউরে ওঠে, কীভাবে এত নিষ্ঠুর হতে পারল দু'পায়া দৈত্যরা। তবে কি তাদের সন্তান নেই? নেই হৃদয় বলতে কিছু? নাকি কখনো কারও কথাই ভাবে না তারা। এরকম হাজারও প্রশ্ন উদিত হয় ছোট পাখিটির মনে। ডানা ঝাঁপটিয়ে উড়ে চলছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে! গৃহপালিত পশুরা স্থিরচিত্তে প্রবেশ করছে গৃহে। সেই সঙ্গে আপন গৃহে প্রবেশ করছে বনের উন্মুক্ত পশুপাখিরাও। চারিদিকে অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে। তবুও ডানা ঝাঁপটাচ্ছে ছোট পাখিটা। মিশন- দূরের ল্যামপোস্ট। এখনো প্রায় কয়েকটি গ্রাম উড়ে যেতে হবে তাকে। শহরের নিকটবর্তী মস্ত রঙিন দালানের সম্মুখেই সেই ল্যামপোস্টটা। সেখানেই তার আবাসস্থল। প্রতিদিনের ন্যায় আজও উড়ে যাচ্ছে তার গৃহে, কিন্তু আজকের যাওয়াটা অন্য দিনের থেকে আলাদা। সারা দিন বহু মাঠ-ঘাট-রাস্তা- বাজার পাড়ি দিয়ে এসেছে সে। তবুও তার মুখে ক্লান্তির ছাপটুকুও নেই। মনে মনে সে ভাবে, অন্তত এই টুকুন কষ্টের বিনিময়ও যদি ফিরে পাওয়া যায়। তাহলেই তো সফলতা। সে জানে; একবার যে হারিয়ে যায় তাকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবুও যে তার পাগল মনটা কিছুতেই বুঝে না। অবুঝ মনটা বলে উঠে; এইতো আরেকটু। আর একটা গ্রাম অথবা মাঠ পার হলেই হয়তো দেখা মিলবে প্রিয়জনদের। তাই খাওয়াদাওয়া ত্যাগ করে উড়েই চলছে সে। কিন্তু না, কিছুতেই কিছু হলো না। দিন শেষে কোনো সন্ধানই জোগাড় করতে পারল না সে। তাইতো সে ভগ্ন হৃদয়ে রওয়ানা করেছে ল্যামপোস্টের বাতির ফোকোর দিকে। কিন্তু আজ পথ চলতে বড্ড ভয় লাগছে তার। অথচ ইতোপূর্বে কখনই এরকমটা অনুভব করেনি সে। এটাই তো তার সর্বাধিক পরিচিত পথ। এখান দিয়েই সে গিয়েছিল প্রিয়তম বাচ্চাদের নিয়ে, সরিষা খেতে। আকাশে ভীষণ মেঘ জমে আছে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি ঝরছে মাঝে মাঝে। মেঘে মেঘে গর্জনের বিকট আওয়াজ হচ্ছে। শরীরে কুলিয়ে উঠছে না ছোট পাখিটার। আর তাই মস্ত একটি বটবৃক্ষের ডালের শুয়ে পড়ে সে। ভাবতে থাকে অতিবাহিত হয়ে যাওয়া নির্মম ইতিবৃত্তি প্রভাতের উজ্জ্বল আলোয় খেলতে ছিল ছানা দুটো। বাবা-মা প্রায়শই সরিষা বাগান থেকে সরিষা এনে খাওয়ায় ওদের। আজও তারা সরিষা খাওয়ার জন্য বায়না ধরেছে। কিন্তু আজকে কে যাবে সরিষা আনতে? এ নিয়ে মতানৈক্য সৃষ্টি হয় স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মাঝে। পুরুষ চড়ুইটা শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ। আর খোক্কস, রাক্ষস ও দু'পায়া দৈত্যের ভয়ে একা রেখে যেতে পারে না বাচ্চাদের। বাচ্চাদেরও প্রবল বাসনা সরিষা বাগানে যাওয়ার ব্যাপারে। প্রচন্ড রকম আনন্দ আর উৎফুলস্নতার সঙ্গে সরিষা বাগানে আসে চড়ুই পাখির পরিবার। বাচ্চা দুটো দূরে কোথাও যায় না। তাই তো সরিষা বাগানে আসতে পেরে তাদের আনন্দের বাঁধ মানে না। এদিক-সেদিক উড়ে বেড়াচ্ছে তারা। তাদের মতো আরও অনেকেই এসেছে সরিষা বাগানে। তৃপ্তি নিয়ে সরিষা খাওয়ার জন্য। কিন্তু দু'পায়া দৈত্যেরা চায় না যে, তারা সরিষা খেতে থাক। আনন্দে উড়ে উড়ে সরিষা খেয়ে চলছে চড়ুইদের দল। বাগানের মালিক চারপাশে তাই জাল দ্বারা বেষ্টনী দিয়েছে। যাতে করে আটকা পড়ে যায় সরিষা খেতে আসা পাখিগুলো। অলক্ষুনে সেই জালে আটকে পড়ে ছোট বাচ্চা দুটি, চিৎকার করে ডাকতে থাকে বাবা-মা'কে। কিন্তু শত চেষ্টা করেও বাচ্চাদের জাল থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হলো না তারা। মালিক চলে আসায় দ্রম্নত পালাতে গিয়ে মা চড়ুইটাও আটকে গেল। অবশেষে মালিকের হাতে ধরা পড়ে গেল তারা। মালিক অতিদ্রম্নত তাদের হস্তক্ষেপ করে নিল। নিয়ে গেল কাঙ্ক্ষিত স্থানে। পুরুষ চড়ুইটি পালস্না দিতে গিয়েও কিছুক্ষণ উড়ে আর পারল না মালিকের সঙ্গে। কোথায় যেন হারিয়ে গেল তার প্রিয়তম স্ত্রী, আর কলিজার টুকরো বাচ্চা দু'টিকে নিয়ে। সে জানে, বাগানের মালিক কিছুতেই তাদের ছাড়বে না। তবুও যদি ফন্দি খাটিয়ে মুক্ত করা যায়, এটা ভেবে এদিক সেদিক ঘুরতে লাগল সে। হঠাৎ রৌদ্রে ঘুম ভেঙে যায় পাখিটার। চারদিকে রৌদ্রে জলমল করছে। সবাই নিজ নিজ কাজে মগ্ন হচ্ছে। (অজান্তেই কেটে গেল তার বিষাদময় একটি রাত।) ব্যথিত হৃদয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়েই পাখায় ভর দেয়। ভগ্নমনোরথে উড়ে চলতে থাকে। যার হারায় সে বুঝে কত যন্ত্রণা। নিজের জীবন দিয়ে হলেও তাদের ফিরে পেতে চায় পাখিটা। কিন্তু কোথায় পাবে সে তাদের ছেড়ে। পৃথিবীটা তো বড়ই নিষ্ঠুর।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে