তপুর জন্মদিন

প্রকাশ | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

আব্দুল হানিফ সরকার
আজ তপুর জন্মদিন। এবার সে আট বছরে পদার্পণ করল। এই তো সেদিনের কথা। কী সুন্দর নরম তুলতুলে ফর্সা সুন্দর টুকটুকে তপু ঘর আলো করে মিরার কোলে এলো। সময়ের পরিক্রমায় সে এখন আট বছরের দুরন্ত শিশু। সময় কত না দ্রম্নত অতিক্রান্ত হয়! আফজাল সাহেব বারান্দায় বসে এসব ভাবছিলেন। মিরা এলো ছেলেকে নিয়ে। গোসল সেরে নতুন জামা পরিয়ে বারান্দায় বসিয়ে দিলেন তপুকে। তপুর অবয়ব থেকে অপূর্ব লাবণ্যদু্যতি ছড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিনের চেয়েও আজ সে বড়বেশি হাসিখুশি আনন্দে উচ্ছলিত। মায়ের মুখে জন্মদিনের কথা শোনার পর থেকে সে দিন-ক্ষণ গুনছে; 'জন্মদিন' 'জন্মদিন' বলে কান ঝালাপালা করে তুলেছে। সেই কাঙ্ক্ষিত দিন আজ হাতের মুঠোয়। পলি চিরুনি দিয়ে মাথা আঁচড়িয়ে দিল। শাসনের সুরে দুষ্টুমি করতে বারণ করল। ছোট ভাইটির জন্য ওর কচি মনে দরদ উথলে ওঠে সারাক্ষণ। স্কুল থেকে ফিরতেই তপু দৌড়ে কাছে আসে। দুই ভাই-বোন এক সঙ্গে খেলতে যায়, বেড়াতে যায়। দুষ্টুমিতেও পাকা সে। পলি পড়তে বসলে কখনো বই ছুড়ে ফেলে; কলম নিয়ে টানা-হেঁচড়া করে। ধমক মারে পলি। পরক্ষণে আবার আদরে-সোহাগে কাছে টেনে নেয়। আদূরে এই ছোট ভাইটির জন্মদিন পালনে পলির কর্মব্যস্ততার শেষ নেই। দুদিন আগেই সে ঘরদোর ঘষামাজা, ধোয়ামোছা করে বাড়িটিকে পুরোদস্তুর ঝকঝকে, তকতকে করে তুলেছে। আজ সে দৌড়াদৌড়ি, ছুটোছুটির মধ্যেই আছে। একবার ছুটে যাচ্ছে বাড়ির ফটকে; আর একবার রান্নাঘরে উঁকি মেরে মাকে তাগিদ দিচ্ছে। 'মা, তাড়াতাড়ি নাশতা রেডি করো।' পলির অস্থিরতা দেখে মিরা বেগম হাসেন। এরমধ্যে পলির প্রিয় বান্ধবী আশা, কেয়া, সুমিসহ আট-দশজন একযোগে এসে গেল। তারা সবাই পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। তাদের দেখে আনন্দে লাফিয়ে উঠল পলি। আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পলিই তাদের ডেকেছিল। তারা এসে কেউ গেল নাশতা তৈরির কাজে সাহায্য করতে; কেউ বা রুম সাজানোর কাজে। বিকেল চারটায় অনুষ্ঠান। হাতে আর সময় বেশি নেই। তপুর সহপাঠীরা দলবেঁধে এলো। পদচারণায় মুখর হয়ে উঠল বাড়িটি। ওরা এসে হৈ-হুলেস্নাড়, গল্প-গুজবে মেতে উঠল। আফজাল দম্পতি রুমে ঢুকতেই সবাই উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করল। শিষ্ঠাচারে প্রীত হলেন আফজাল দম্পতি। রুমে ঢুকে তারা বিমুগ্ধ নয়নে দেখতে লাগলেন। সুবিন্যস্ত আসন, রঙিন কাগজে সুসজ্জিত দেয়াল, টেবিলের ওপর শোভা পাচ্ছে বড় আকারের কেক, বৃত্তাকারে সাজানো প্রজ্বলিত মোমবাতি- সবই নির্মল অনুষ্ঠানের জানান দিয়ে যাচ্ছে। কেক কাটার মুহূর্তে সমস্বরে সবাই 'হ্যাপি বার্থ ডে, হ্যাপি বার্থ ডে' বলে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা প্রকাশ করল। অনুষ্ঠানে রিয়াদকে দেখতে না পেয়ে আফজাল সাহেব চিন্তিত ও ব্যথিত হয়ে উঠলেন। বাপহারা অসহায় এতিম ছেলেটি তপুরই সমবয়সি। ওরা এক সঙ্গে খেলে, বেড়াতে যায়। তাদের দুজনার মধ্যে কী গভীর বন্ধুত্ব! ওর মা পরের বাড়িতে কাজ করে। বাড়িতে খাবার না থাকলে এখানে সে খেয়ে নেয়। আজকের এ আনন্দঘন পরিবেশে ছেলেটি নেই; ভীষণ মর্মাহত হলেন আফজাল সাহেব। বিষণ্ন কণ্ঠে বললেন, 'রিয়াদ কই? রিয়াদ আসেনি?' অনুষ্ঠানে নীরবতা নেমে এলো। সবাই এপাশ-ওপাশ তাকালো। না, রিয়াদ আসেনি। পলি দশ-বারোজনকে নিয়ে রিয়াদের জীর্ণ বাড়ির দিকে ছুটে চলল। রিয়াদ তখনও কেঁদে চলেছে। বাবার কথা আজ খুব মনে পড়ছে। পলি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই কান্নার বেগ দ্বিগুণ হলো। পলি রিয়াদকে নিয়ে অনুষ্ঠানে যোগ দিতেই সবাই করতালি দিয়ে রিয়াদকে বরণ করে নিল। রিয়াদের জন্য ক্রীত রঙিন জামা আফজাল সাহেব ওর গায়ে পরিয়ে দিলেন। রিয়াদ খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠল। মুগ্ধ চোখে একবার তাকায় জামার দিকে, আর একবার আফজাল সাহেবের দিকে। আফজাল সাহেবের মুখে তার পিতার প্রতিচ্ছবি জ্বলজ্বল করছে। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে গানের আয়োজন। সুমি, পলি হারমোনিয়াম বেজে দেশের গান গাইল। কী দরদি কণ্ঠ! গানের সুরে সবাই আনন্দে মেতে উঠল। সবশেষে সুষমভাবে সবাইকে খাবার পরিবেশন করা হলো। আফজাল সাহেবের কাছে গিয়ে পলি বলল, 'বাবা, অতিথিদের আপ্যায়ন শেষ; তুমি এখন খেয়ে নাও।' -'অতিথি তো আরও আছে মা।' -'আর কেউ বাকি নেই বাবা।' আফজাল সাহেবের মুখে রহস্যময় হাসি। বললেন, 'দেখবে এসো।' পলিকে নিয়ে তিনি বাইরের রুমে গেলেন। ত্রিশজনের মতো দুস্থ, ভুখা শ্রেণির মানুষ খাবারের অপেক্ষায় বসে আছে। আফজাল সাহেব বললেন, 'মা, এরাও আমাদেরই অংশ।' বাবার জন্য পলির বুক গর্বে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। খাবার ও টাকা প্রত্যেকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে আফজাল সাহেব তপুর জন্য দোয়া চাইলেন। প্রাণভরে সবাই দোয়া করল। সবার অংশগ্রহণে তপুর জন্মদিন সুন্দর ও সার্থক হয়ে উঠল।