অপ্রত্যাশিত অতিথি

অপ্রত্যাশিত অতিথি

শহর থেকে কিছুটা দূরে ছোট্ট একটি গ্রাম, গ্রামের নাম রতনপুর, সেই গ্রামে বাস করে রমজান মিয়া। তার দুই মেয়ে, বড় মেয়ে মান্না, ছোট মেয়ের নাম পান্না। বড় মেয়ের বিয়ের দুই বছর পর রমজান মিয়া মারা যান। ছোট মেয়েকে নিয়ে রমজান মিয়ার স্ত্রী তারাবানু কোনোক্রমে অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করেন। পান্না যখন পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত তখন তার মা তারাবানু মৃতু্যবরণ করেন। তখন পান্নার একমাত্র আশ্রয় হয় তার বড় বোনের কাছে। ভগ্নিপতি সফর আলী ঢাকার একটি গার্মেন্টসে চাকরি করেন। সফর আলীর সংসার খুব একটা সচ্ছল নয় বিধায় সংসারে অভাব অনটন প্রায় লেগেই থাকে, এমতাবস্থায় পান্নার আগমনে তাদের যদিও বাড়তি একটু সমস্যায় পড়তে হয়, কিন্তু পান্না তাদের সংসারে ছেলে মেয়েদের সেবাযত্ন, রান্না-বান্না অনেক কাজে সহযোগিতা করার ফলে পান্নার উপস্থিতি তাদের কাছে অসন্তুষ্টির কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হয় না। মান্না একদিন বিকাল বেলায় তার মাথায় কিছুটা ব্যথা অনুভব করে, গভীর

রাত্রিতে মাথার ব্যথা প্রচন্ড আকার ধারণ করে। প্রচন্ড ব্যথায় সে হাঁউমাঁউ করে চিৎকার করতে থাকে। অবুঝ দুটি সন্তান মায়ের মুখের দিকে থাকিয়ে তারাও কাঁদতে শুরু করে। পান্না বোনের এ অসহনীয় অবস্থা প্রত্যক্ষ করে কী সিদ্ধান্ত নেবে সে কিছুই ভাবতে পারছে না। বোনকে যে ডাক্তার দেখাবে বা হাসপাতালে নিয়ে যাবে তার কাছে যে কোনো টাকা পয়সা নেই। সফর আলীর ভাইয়ের স্ত্রীর কাছ থেকে সামান্য কটা টাকা নিয়ে সে বোনকে নিয়ে শহরের উদ্দেশে রওনা দেয়। আর্থিক দৈন্যতা আজ তাকে রুখতে পারেনি। অবুঝ দুটি শিশুর মমতাময় চাহনি আর রক্তের টান তার শূন্য হাতকে আজ করেছে ভালোবাসায় পরিপূর্ণ, প্রেরণায় জোগিয়েছে মনের শক্তি, সে দৃঢ় আশাবাদী বিধাতা তাকে নিরাশ করবে না। তার দুটি হাত কখনো পাপ স্পর্শ করেনি, এই পবিত্র দুটি হাত তুলে মহান প্রভুর কাছে সে দয়া কামনা করে, সে এক রকম রিক্ত হস্তে বোনের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে রওনা দেয়। পথ আজ যত কঠিন হোক, সে মনে করে, বিধাতার দয়া অনন্ত অসীম। সে বোনকে প্রথমে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়, সেখানে ডাক্তার বোনকে দেখে চিকিৎসার স্বার্থে ভর্তি করার জন্য পরামর্শ দেন। সে বোনকে হাসপাতালের একটি বেডে ভর্তি করে কিছুটা স্বস্তি বোধ করে। কিছুক্ষণ পর ওয়ার্ডের ডাক্তার এসে মান্নাকে ভালোভাবে দেখে কিছু জরুরি ওষুধের স্স্নিপ পান্নার হাতে দেন। পান্না স্স্নিপ হাতে পেয়ে বারান্দায় এসে আকাশের পানে দুটি হাত তুলে মহান আলস্নাহর কাছে তার প্রার্থনা করে। তার এই প্রার্থনার দৃশ্যটি খুব কাছ থেকে অবলোকন করেন একজন নবীন ডাক্তার, তিনি মনে মনে ভাবেন এত সুন্দর মেয়েটি, কত সুন্দর তার মায়াবী চেহারা হলুদ বর্ণ দুটি হাত থেকে যেন সোনালি আলো ঝলমল করছে। ফুলের পাপড়ির মতো রাঙা দুটি ঠোঁট তার খুব জানতে ইচ্ছে করে তার কি দুঃখ, তার মনের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা কি? ভয়শূন্য চিত্তে সে জানতে চায় প্রকৃত বিষয়, একটু অগ্রসর হয়ে সালাম জানিয়ে সে পান্নাকে বলে পিস্নজ যদি কিছু মনে না করেন আপনাকে একটু জিজ্ঞেস করতে পারি? পান্না কোনো কথা না বলে তার দুটি চোখের জলে স্নাত কাগজটুকু তার হাতে দিয়ে এক দৌড়ে বোনের শিওরের কাছে আসে। ডাক্তার স্স্নিপটুকু পড়ে তার আর বুঝতে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এই কাগজে কতটুকু অসহায়ত্ব বা দরিদ্রতা নিহিত আছে। সে পান্নার কাছে গিয়ে বলে আমার নাম হীরা আমি এই হাসপাতালের একজন নবীন ডাক্তার, আপনি যদি আমাকে অনুমতি দেন তাহলে আমি আপনার এই দুঃসময়ে পাশে থাকতে চাই।

কিছুক্ষণ পর স্স্নিপে লেখা সব ওষুধ নিয়ে সে হাজির হয়। ওষুধ সেবন করে মান্নার অবস্থা ক্রমান্বয়ে উন্নতির পথে আসে। সফর আলীর অনুপস্থিতে মান্নার চিকিৎসার খরচ যে হিরা চালিয়ে নিয়েছে সে তাকে জানায়। পান্না সফর আলীকে বলে যে দুলাভাই এটা উনার ওষুধের মেমো। সফর আলী দুই হাজার টাকার ওষুধ ক্রয়ের মেমো দেখে তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। তিনি সারা মাসে আট হাজার টাকা বেতন পান। ওই টাকা দিয়ে তিনি সারা মাসের খরচপাতি চালান। তার পকেটে মাত্র পাঁচশত টাকা, তিনি কি করবেন, পকেটে যে হাত ঢুকিয়েছেন সেই হাত দিয়ে যে টাকা বের হবে তাতো খুবই সামান্য। মনে মনে তিনি খুবই লজ্জিত কি করবেন, কিন্তু বিধাতা যার সহায় থাকেন তার সম্মান তিনি সর্বদা অক্ষুণ্ন্ন রাখেন। হিরা সঙ্গে সঙ্গে বাধা দিয়ে বলে না না টাকা লাগবে না। আমিতো শুধু কর্তব্য পালন করেছি, মানবিক কারণে, ফেরত নেয়ার জন্য নয়। সে পান্নার দুলাভাইয়ের সামনে পান্নাকে ডেকে এনে বলে পান্না আমি তোমাকে আবারও কিছু বিরক্ত করতে চাই। পান্না বলে ঠিক আছে বলুন। হীরা পান্নাকে বলে দেখ পান্না হিরা আর পান্না দুটি নামের মধ্যে রয়েছে যেমন সৌন্দর্যের মিল, তেমনি এই দুটি ধাতু পৃথিবীতে খুবই মূল্যবান। আমি এই পৃথিবীতে পুরুষ হয়ে জন্মেছি বিধায় আমাকে একদিন সংসার করতে হবে। কেমন হবে আমার জীবন সঙ্গিণী, আমি সর্বদা যে রকম প্রত্যাশা করতাম তার সবটুকু বৈশিষ্ট্য আমি তোমার মধ্যে পেয়েছি। তুমি অসাধারণ এবং মহৎ গুণের অধিকারী সত্যিই তুমি অপূর্ব এবং অনন্যা। তোমার রয়েছে নজরকাড়া মোহনীয় রূপ। দরিদ্রতা যদিও তোমাদের নিত্যসঙ্গী, কিন্তু ধরনী তোমাকে তার বুকে ধরে রেখেছে, অনুপম সৌন্দর্য সুষমায়, তুমি আমার কাছে অপূর্ব এবং অতুলনীয়। মানুষের জীবনের কোনো এক প্রান্তে বিধাতার অশেষ দয়ায় এমন কিছু শুভক্ষণ আসে- যা ভাগ্যবানরাই শুধু উপহার হিসেবে প্রাপ্ত হয়। আজ আমি তোমাকে জীবন সঙ্গী বানাতে চাই, তোমার সঙ্গে গড়তে চাই আমার ভালোবাসার অটুট বন্ধন। পান্না মনে করে, অপ্রত্যাশিত অতিথি হয়ে আমি এসেছি তোমার জীবনে পিস্নজ দয়া করে সারাজীবন আমাকে তোমার বুকে ঠাঁই দিও, পরম মমতায় টেনে নিও তোমার বাহুবন্ধনে, আমাদের এই পবিত্র মিলনে ফুলেরা যেন পাপড়ি মেলে হাসে। আমাদের এই শুভক্ষণ যেন যুগযুগান্তর ধরে ইতিহাসের পাতায় চির অম্স্নান হয়ে থাকে পবিত্র ভালোবাসার অমর কীর্তি হয়ে।

সদস্য, জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম, সিলেট।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে