logo
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০ ৯ কার্তিক ১৪২৭

  সরকার মাসুদ   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০  

কবিতার উপযোগিতা ও বিনোদন ধর্মিতা

কবিতার উপযোগিতা ও বিনোদন ধর্মিতা
কোনো পাঠক যখন বলেন, অমুকের অমুক কবিতাটি ভালো লাগল; তার অর্থ পাঠক স্বীকার করলেন যে, ওই কবিতাটির পাঠ তাকে আনন্দ দিয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয়, কবিতার আনন্দ দেয়ার ক্ষমতা আছে। আর যে কাব্য পাঠককে আনন্দ দিতে পারে না তা, আমার মতে, আদৌ কাব্য নয়। কত অজস্র বিষয় নিয়ে কবিতা লেখা হয়েছে, হচ্ছে। বৈচিত্র্যের কোনো সীমা নেই। বউভাত বা সেলাইকল নিয়েও কবিতা লেখা হয়েছে, আবার সেফটিপিন বা বলপেন নিয়েও হয়েছে। কিন্তু উপজীব্য যা-ই হোক আমরা পাঠকরা চাই সেই কবিতা পড়ে উদ্দীপ্ত হতে, আনন্দিত হতে, কখনো বা অনুপ্রাণিত হতে।

কবিতা যেমন অনেক রকম তার পাঠকও অনেক রকম। এক শ্রেণির পাঠক বন্দে আলী মিঞা কিংবা জসীমউদ্‌দীনের কবিতা বোঝেন। বড়জোর শামসুর রাহমানের অপেক্ষাকৃত সহজ কিছু কবিতা তাদের আনন্দ দেয়। আরেক ধরনের পাঠক জসীমউদ্দীন, জীবনানন্দ, আল মাহমুদ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়- সবার কবিতাই পছন্দ করেন। পাঠক যদি সুরসিক হন, তাহলে তার অর্জিত বিদ্যা-বুদ্ধি বা ইনটেলেক্ট কবিতার রসাস্বাদনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। আমরা, যারা স্বাধীনতা যুদ্ধপরবর্তী যুগে আধুনিক কবিতা লিখছি, বরং চাই ওই সুশিক্ষিত-রসিক পাঠকবর্গকেই। তার কারণ আমাদের কবিতার কল্পছবি, ইশারা-ইঙ্গিত, একান্ত ব্যক্তিক অভিজ্ঞতার নির্যাস, অনুভবের বহুরূপিতা বুঝতে হলে এই শ্রেণির পাঠকের বিকল্প নেই। তবে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রি না থাকলেও একজন মানুষ আধুনিক কবিতার ভোক্তা হতে পারেন। তার সংখ্যা নগণ্য নয় এবং তারা ব্যতিক্রম।

একটা সময় ছিল (কমপক্ষে চলিস্নশ বছর আগের কথা বলছি) যখন কবিতা পড়ে মানুষ প্রায় সিনেমা দেখার আনন্দের মতোই বিনোদন পেতেন। সেকালে তো আর এখনকার মতো ইলেকট্রনিক মিডিয়ার এত হাতছানি ছিল না। বিনোদনের এত সব বিচিত্র মাধ্যমও ছিল না। লোকজন রেডিও শুনতো, যাত্রা-থিয়েটার দেখতো, গৃহবধূদের একটা বড় অংশ পড়তো নভেল। আর যারা একটু উন্নত পাঠক তারা কবিতা পড়ত। অতীতের মতো এখনো অগ্রসর পাঠকরাই কবিতার অনুরাগী। যদি একশ'জন উপন্যাস পাঠককে হাজির করানো হয়, দেখা যাবে তাদের মধ্যে ১০/১৫ জন কবিতা পড়েন। কিন্তু কবিতা পাঠকদের একটা বড় অংশ গল্প-উপন্যাসও পড়েন। এখানে একটা প্রশ্ন এসে যাচ্ছে, কবিতার কাছে কি মানুষ কেবলই বিনোদী উপকরণ আশা করে? ৪০/৫০/৬০ বছর আগের কবিতা পড়ে লোকজন যে মজাটা পেতেন আজকে তা পাচ্ছেন না বলে কবিতার বিক্রি-বাটা ভীষণ কমে গেছে। অথবা এভাবেও বলা চলে, কবিতা আর আগের মতো পাঠকের সঙ্গে কমিউনিকেট করতে পারছে না; কেননা, কাব্য তার পূর্বতন সরলতা-সহজতা খুইয়ে বসে আছে। জীবনানন্দ উত্তর বেশ কয়েকজন কবির রচনারীতির ভেতর আমরা শব্দের সহজতাকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রয়োগ করতে দেখেছি। তা সত্ত্বেও ওই যোগাযোগ না ঘটার সমস্যা। এখন কবিরা এক্ষেত্রে কী করতে পারেন? কবিতা বোঝার ব্যাপারটা কবিতার পাঠ-অনুশীলনের সঙ্গেও অনেকখানি সম্পর্কিত। রবার্ট ফ্রস্ট ওই-যে বলেছিলেন, আধুনিক কবি তিনিই যিনি আধুনিক পাঠককে সন্তুষ্ট করতে সক্ষম; কথাটা ভেবে দেখুন। আধুনিক পাঠক মানে তো সেই ব্যক্তি- যার মনটাও আধুনিক। তিনি সব রকম পশ্চাদপদতার ঊর্ধ্বে এবং মুক্ত চিন্তা-চেতনার ধারক। কিন্তু আমরা কী ধরনের লোক দেখতে পাচ্ছি চারপাশে? পৃথিবীতে শিল্প-সাহিত্যের এত সব আন্দোলন-বিপস্নব ঘটে যাওয়ার পরও এই ২০২০ সালেও এখানে মানুষ 'পদ্য'কে কবিতা মনে করে। পঙক্তির শেষে মিল, পরিচিত্র উপমা, পরিচিত দৃশ্য বা সহজবোধ্য শব্দের ব্যবহার না থাকলে তা কবিতা হিসেবে গৃহীত হয় না তাদের সনাতন ধারণাক্লিষ্ট মানায়।

অগ্রসর কবিদের মতো এগিয়ে থাকা পাঠকরাও চান কবিতা মনোরঞ্জক উপাদানের পাশাপাশি চিন্তা বা গভীর ভাব-কল্পনা থাকুক। ওয়ার্ডসওয়ার্থ, ইয়েটস, নেরুদা, আখমাতোভা, লারকিন প্রমুখ 'বড় কবি' হিসেবে নন্দিত হয়েছেন কেন? কারণ তাদের সমৃদ্ধ জীবনাভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সহজগভীর এক একটি শৈলী যুক্ত হয়ে ফলিয়েছ অভিনতুন শিল্প ফসল। ওয়ার্ডসওয়ার্থ তো সেই ১৭৯৮ সালেই কবিতায় সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ব্যবহারের কথা বলেছিলেন। মাঝখানে দুশ' বছরের ভেতর অনেকেই সেই চেষ্টা করেছেনও। ওয়ার্ডসওয়ার্থ নিজেও অত আগে সাধ্যমতো ওই কাজ করেছেন। রোমান্টিক যুগের অপরাপর কবিদের পাশাপাশি তার কবিতা পড়লে এই ভাষাজনিত তফাৎটি চোখে পড়ে। কবিদের অনেকেই বিশেষ করে তরুণ কবিরা, একটি কথা ভুলে যান। তা হচ্ছে- বিশ্বের তাবৎ প্রথম শ্রেণির কবিতা প্রথম শ্রেণির বিনোদনের জোগানদাতা। অনবদ্য কবিকল্পনা, ভাবপ্রকাশের বিশেষ নিজস্ব ধরন এগুলো তো থাকেই, তার সঙ্গে থাকে ওই শব্দের জাদু যা মজাদার হয়ে ওঠে শব্দের সঠিক প্রয়োগের গুণে। জীবনের অম্স্ন-মধুর অভিজ্ঞতা অল্প-বিস্তর সবারই থাকে। কিন্তু একজন কবি জীবন সম্পর্কে সঞ্চিত যাবতীয় অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটান তার কবিতায়। তা যদি হৃদয়গ্রাহী হয়ে ওঠে, তাহলে কবির অভিজ্ঞতা ও ভাব কল্পনার অনেক কাছাকাছি পৌঁছে যায় পাঠকের অভিজ্ঞতা। কবিতার পাঠক তখন তৃপ্তি পান। বিনোদনের সূত্রটি আসলে এখানেই নিহিত।

মজা বা শান্তি পাওয়ার মতো বিষয়বস্তু অথবা নানাবিধ শিল্প-উপকরণ থাকা সত্ত্বেও, আমরা দেখেছি, অপ্রচল কিংবা দুর্বোধ্য শব্দের সমাহার একটি কবিতাকে কীভাবে দরিদ্র করে ফেলে। সুতরাং তারাপদ রায় সুলভ 'জলের মতো কবিতা' বা বিনয় মজুমদারের শেষ জীবনের অভাবনীয় সহজ কবিতাগুলো লেখার পেছনে তাদের গভীরতা অন্ধ ভাবুক মনে কেমন অভিপ্রায় সক্রিয় ছিল ভেবে দেখতে হবে। ভিক্টোরিয়ান আসলে কারো কারো কাব্যে গল্পের উপাদান ছিল। রবার্ট ব্রাউনিং-এ ছিল; রবীন্দ্রনাথেও। তারপর মাঝখানে বহুকাল আমরা গল্পের দেখা পাইনি কবিতায়। এডুইন এর লিঙটন রবিনসনের মতো বা সুবোধ সরকারের মতো কেউ কেউ আবার গল্প ব্যবহার করেছেন কবিতায়। সত্তরের প্রজন্মে এটা সবচেয়ে বেশি প্রযুক্ত হয়েছে দেশে-বিদেশে। যদি বলি এর পেছনে আধুনিক কবিতাকে জনপ্রিয় করে তোলা প্রায় অসম্ভব বাসনা সক্রিয় ছিল; তাহলে কি খুব ভুল বলা হবে? আমরা তো জানি আধুনিক কবিতা একটা বিশেষ বুদ্ধিবৃত্তিক লেভেলে বড়জোর পাঠকপ্রিয় হতে পারে, যেমনটা ঘটেছে রিলকে, লোরকা, জীবনানন্দের মতো কবিদের বেলায়, কিন্তু জনপ্রিয় হওয়া তার পক্ষে অসম্ভব।

নানা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিরা আমাদের প্রিয় লেখক। এই কবিদের আছে মানুষ সম্বন্ধে পরিচ্ছন্ন ধারণা, অনুভূতির শক্তিমান প্রকাশ, ভালোবাসার বিশাল হৃদয়। আর তাদের কবিতা কোনো না কোনোভাবে প্রকাশ করছে স্বদেশের আত্মার ছবি।

এসব কবিতা, সুতরাং মানুষকে উদ্দীপ্ত হতে, দয়ায় আদ্র হতে, বিস্ময়ে অভিভূত হতে ও ভালোবাসতে শেখায়। কবিতা অসঙ্গতিভরা সমাজের বদল ঘটাবে, বিপস্নব আনবে এসব মূল্যহীন কথা। তবে সমাজবাদী কবিতা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে পারে। সিকিপ্রেমিক বা আধাপ্রেমিক মানুষকে পুরোপুরি প্রেমিক বানাতে পারে। উন্নতমানের কবিতা অবশ্যই মানুষকে মূল্যবোধের গুরুত্ব বোঝাতে সক্ষম। শেষ বিচারে কবিতা তো শিল্প। অন্যান্য শিল্পকলা যেমন রস অন্বেষী মানুষকে নির্মল ভালো লাগার অনুভূতি দেয় তেমনি কবিতাও রস উপভোগের মাধ্যমে পাঠক হৃদয়ে বেঁচে থাকার গভীরতর অর্থ জোগান দেয়। এভাবে একজন মানুষ, যিনি কাব্যানুরাগী, নিজেকে জীবনের অনেক তুচ্ছতা ও কালিঝুলির ঊর্ধ্বে স্থাপন করতে শেখেন। কবিতার এর চেয়ে বড় উপযোগ আর কী থাকতে পারে?
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে