আবদুল গনি হাজারীর জন্মশতবর্ষ তার একটি কবিতা

আবদুল গনি হাজারীর জন্মশতবর্ষ তার একটি কবিতা

নেই কোনো আয়োজনের ঘনঘটা, নেই পত্রিকার পাতায় তার জন্মশতবর্ষ নিয়ে কোনো আলোচনা। অথচ এই গুণী কবির কবিতায় একসময় সাহিত্যাঙ্গন আলোড়িত হতো। কবি ও সাংবাদিক আবদুল গনি হাজারীর জন্মশতবর্ষ পূর্তি নীরবেই কাটছে। 'কতিপয় আমলার স্ত্রী' কবিতাটি তার এক অনন্য সৃষ্টি। তাই আলোচ্য কবির জন্মশতবর্ষের আলোচনায় তার সেই বিখ্যাত কবিতা নিয়েই তাকে স্মরণ করার চেষ্টা করছি। 'কতিপয় আমলার স্ত্রী' কবিতাখানি আমলাতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বরূপ প্রদর্শনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি ১৯২১ সালের ১২ জানুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পাবনার বর্তমান সুজানগর উপজেলার নয়াগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এতে দেশীয় রাজনীতির অথবা রাষ্ট্রনীতির আমলাতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অতিশয় সত্য বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে। আমলাদের স্ত্রীদের কণ্ঠস্বরে বিমূর্ত সত্যের মূর্ত হয়ে ওঠা এ কবিতার অন্যতম দিক। যেমন-

আমরা কতিপয় আমলার স্ত্রী

তোমার দিকে মুখ ফেরালাম

হে প্রভু আমাদের ত্রাণ করো

বিশ্রামে বিধ্বস্ত আমরা

কতিপয় আমলার স্ত্রী

হে প্রভু আমাদের স্বামীরা

অগাধ নথিপত্রে ডুবুরি

(কি তোলে তা তারাই জানে)

পরিবার-পরিকল্পনায় আমরা নিঃস্ব

সময় আমাদের পিষ্ট করে যায়

আমরা কতিপয় আমলার স্ত্রী

সকাল থেকে সন্ধ্যা

কোন মহৎ চিন্তার কিনারে

এবং ফ্যাশান পত্রিকার বিবর্ণ পাতা

দৈনিক কাগজে, সিনেমার ইশতেহার

স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্যের উলঙ্গ ছবি

এবং একটি প্রাপ্ত-প্রায় মহত্ত্বের শিহরণ।

আমাদের আমলাদের অসীম ক্ষমতা ও অবৈধ বিত্ত বিলাসে বিভোর জীবনে স্ত্রীগণের অকারণ অর্থবিলাসিতা, অলস জীবন ও স্বামীদের অর্থহীন ফাইল-ডুবো জীবনের চিত্র প্রকাশিত হয়েছে।

নীচের কবিতাংশে আমলাপত্নীর শরীরের অস্বাভাবিক স্ফীত হয়ে ওঠা, অলস টাকার ছড়াছড়ি পরিলক্ষিত।

'কোমরের উপত্যকায় মেদের আক্রমণ

উদরের স্ফীতি

চিবুকের দ্বিত্ব

স্তনের অস্বাস্থ্যে শংকিত

হে প্রভু আমরা

চর্বির মসোলিয়ামে হাঁসফাঁস

আমরা কতিপয় আমলার স্ত্রী

ভাঁড়ার আমাদের লক্ষ্ণী

বালিশের ভাঁজে উদ্বৃত্ত হাতখরচ

আয়নার দেরাজে হেলেন কার্টিস

এনি ফ্রেঞ্চ-মিল্ক

এস্ট্রিনযেন্ট

ডিওডরেন্ট

হ্যান্ড লোশন

রেভলন

ক্রিশ্চিয়ান ডিয়োর

এবং রুবিনস্টিন

অবশ্য স্বামীদের কাছ থেকেই

উষ্ণ প্রেমের ঘাটতি

প্রৌঢ় ক্ষতিপূরণ'

এখানে সর্বশেষ, আমলাদের বিত্তবন্দি জীবনে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসাকে উগ্র আধুনিক প্রসাধনীর মোড়কে আটকে দেওয়ার চিত্র।

'আর্দালীর কুর্নিশে গর্বিত

স্বামীরা অফিসে সর্বক্ষণ

অন্যের পদোন্নতির বাধা

দরখাস্ত নাকচ

এবং কতিপয় পদস্থ দস্তখত

বাড়ি ফিরেও হায়

বন্ধুর প্রমোশনে ঈর্ষিত

বেনামি ব্যবসার লাভক্ষতি

তারপর টেলিফোন

তারপর টেলিফোন

তারপরও টেলিফোন

মাদের ঠোঁটের রেভলন

মুখের ফাউন্ডেশন

কপালের সযত্ন টিপ

শুকিয়ে আসে

বৈকালের নিমন্ত্রণ বাসি

অতঃপর হে প্রভু

দ্বিতীয় ব্যক্তির চিন্তা

আমাদের উন্মনা করে যায়

পুরাতন প্রেমিক বিবাহিত

তরুণদের মাসি

সাবর্ডিনেটের আম্মা

বোনের সংসারে নানি

এবং বৈকালের নিমন্ত্রণ বাসি'- এ অংশে আমলাদের অকারণ ব্যস্ততায় স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার ঘাটতি ও ঘাটতিজনিত কারণে কখনো স্ত্রীদের জীবনে পুরাতন প্রেমিকের উপস্থিতি বা দ্বিতীয় ব্যক্তির আবির্ভাবের কথা।

আমলার স্ত্রীদের শেষমেশ কর্মহীন জীবনের হাহাকার নিম্নরূপ:

'আমরা কতিপয় আমলার স্ত্রী

হে প্রভু

যে-কোনো একটা কাজ দাও

নিজেদের নিক্ষেপ করি

তার গহ্বরে।'

১৯৪৪ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি একই বিষয়ে এমএ শ্রেণিতে পড়াশোনা করলেও ডিগ্রি অর্জন করেননি।

হাজারীর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৪৭ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক আলোড়ন পত্রিকায় সাংবাদিকতার মাধ্যমে। তিনি এ পত্রিকার সম্পাদকেরও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং জুবলি প্রেসের সহকারী ম্যানেজার হিসেবে যোগদান করেন। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে তিনি চন্দ্রবিন্দু, মুক্তি নামে বাংলা এবং দ্য রিপাবলিক নামে ইংরেজি পত্রিকা প্রকাশ করেন। পরে তিনি বিভিন্ন পদে দ্য পাকিস্তান অবজার্ভার, দৈনিক সংবাদ, পূর্বদেশ, চিত্রালী এবং ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৮ সালে পরিক্রমা পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর তিনি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ সালে অবজার্ভার গ্রম্নপ অব পাবলিকেশন্সের প্রশাসক এবং ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৬ সালে সংবাদপত্র ব্যবস্থাপনা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি লেখক সংঘ, ঢাকা আর্ট স্কুল (১৯৪৮), ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনসহ বেশকিছু সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ১৯৬৪ সালে ইউনেস্কো পুরস্কার ও ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ১৯৯১ সালে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন। তার কবিতার বইগুলো হচ্ছে, সামান্য ধন (১৯৫৯), কতিপয় আমলার স্ত্রী, সূর্যের সিঁড়ি (১৯৬৫) এবং জাগ্রত প্রদীপ (১৯৭০)। অনুবাদ গ্রন্থ: স্বর্ণগর্দভ (১৯৬৪) ও ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষা (১৯৭৫)। রম্যরচনা: কালপেঁচার ডায়েরি (১৯৭৬)। এই একুশে পদক পাওয়া কবি ও সাংবাদিকের মৃতু্য হয় ১৯৭৬ সালে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে