মধুসূদনের সনেটে পাশ্চাত্যের প্রভাব

মধুসূদনের সনেটে পাশ্চাত্যের প্রভাব

জীবনের অভাবনীয় ক্রুর বাস্তবতা যদি শেক্সপিয়রের নাট্যসমগ্রের কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু হয়ে থাকে, তাহলে তার সনেটগুচ্ছ উপহার দিয়েছে গীতিময় জীবনের সংশয়ী রৌদ্র-ছায়া। রৌদ্র-ছায়া কিন্তু সংশয়ী; কেন? কারণ তার একাধিক সনেটে বন্ধু বা বন্ধুস্থানীয় ব্যক্তির প্রতি তার মনোভাব দ্বিধান্বিত, যেমনটা প্রতিভাসিত হয়েছে 'ঝযধষষ ও পড়সঢ়ধৎব :যবব :ড় ধ ংঁসসবৎ্থং ফধু?' পঙ্‌ক্তিটিতে।

জীবনের জটিলতা অনিঃশেষ। শেক্সপিয়র তার নাটক নিয়ে এই জটিলতার বিচিত্র স্বভাব ও গতিবিধির সার্থক বাণীরূপ দিয়েছেন। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, মাঝেমধ্যে নাটকের ব্যাকরণের গন্ডির বাইরে এসে স্বস্তির শ্বাস ফেলার জন্য সনেটগুলো লিখেছেন তিনি। এসব সনেটে গীতিময় জীবনের আশা-নিরাশা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব অনেকখানি থাকলেও কবি শেক্সপিয়রের আত্মগত জীবনের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু মাইকেল মধুসূদন দত্ত সনেটের ভেতর দিয়ে পুরোপুরি অনাবৃত করেছেন তার ছলনাস্পৃষ্ট কবিহৃদয়। শেক্সপিয়র- অনুরাগী মাইকেল একাধিক সনেটে তার সারস্বত সাধনার ইতিবৃত্ত লিখে গেছেন। বেশ কয়েকটি সনেটে পশ্চিমের কয়েকজন বিশিষ্ট কবির প্রতি কুণ্ঠহীন শ্রদ্ধাও জানিয়েছেন। এসব রচনার শিল্পমূল্য অসামান্য নাও হতে পারে; কিন্তু অন্তজীবনের এবং অন্তরঙ্গ ভাবজগতের যে পরিচয় বিধৃত আছে এগুলোতে তার মূল্যকে খাটো করে দেখা যাবে না। সুগভীর কাব্যপ্রীতি আর কবিপূজা এসব সনেটকে দিয়েছে বিশেষ মর্যাদা।

উনিশ শতকের শেষদিকের দু-চারজন কবিসহ বিশ শতকের অনেক কবিই কবিতা, কবির প্রতিভা, চিত্রকল্প প্রভৃতি বিষয়কে উপজীব্য করেছেন কবিতার। আড়াই শতাধিক বছর আগের ইংরেজ কবি জন মিল্টনও কবিপ্রতিভা, নবীন কবির উচ্চাভিলাষ এসব নিয়ে কবিতা লিখেছেন। বোঝা যাচ্ছে এ ধরনের লেখার সুদীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। আমাদের মধুসূদন ও পশ্চিমের প্রণোদনায় এজাতীয় কবিতা লিখতে উৎসাহী হয়েছিলেন। লেখাবাহুল্য ওইসব থিমকে তিনি কাব্যের আকার দিয়েছেন সনেটের ফর্মে। অবশ্য 'চতুর্দশপদী কবিতাবলি' লেখার সময়পর্বে মধুসূদনের কবিপ্রতিভা অনেকখানি ক্ষয়ে এসেছিল। তা সত্ত্বেও এগুলোতে মনোবেদনার স্বতঃস্ফূর্ত রূপ ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন লেখক। দুটি উদাহরণ : (ক) তপনের তাপে তাপি পথিক যেমতি/পড়ে গিয়া দড়ে রড়ে ছায়ার চরণে;/তৃষাতুর জন যথা হেরি জলবতী/নদীরে, তাহার পানে ধায় ব্যগ্র মনে (সরস্বতী) (খ) সংগীত-তরঙ্গ-সঙ্গে মিশি কি রে ঝরে/অদৃশ্যে ও কারাগারে নয়নের বারি?.../কীভাবে, হৃদয়ে তোর কি ভাব উথলে?-/কবির কুভাগ্য তোর, আমি ভাবি মনে। (শ্যামাপক্ষী)

'শ্যামাপক্ষী' সনেটটি রচনার পটভূমি হিসেবে আমরা শেলির কবিতার নিবিড় পাঠকে গ্রহণ করতে পারি। স্কাইলার্ক পাখি সম্পর্কিত ওই কবিতায় শেলি বলেছেন, ঙঁৎ ংবিবঃবংঃ ংড়হমং ধৎব :যড়ংব :যধঃ :বষষ ড়ভ ংধফফবংঃ :যড়ঁমযঃ. রোমান্টিক সাহিত্যভাবনার অন্যতম এক সূত্র হলো, বেদনা থেকে কাব্যের উৎপত্তি আর যন্ত্রণা থেকে সংগীতের। এই চিন্তাটি অবশ্য ভারতীয় ভাবধারার অনুরূপ: আদি কবি বাল্মিকীর মনোবেদনা থেকে কাব্যের সৃষ্টি, যখন শোক রূপান্তরিত হয়েছিল শ্লোকে। যাহোক, 'কল্পনা' ও 'বঙ্গভাষা' নামের সনেট দুটিতে মধুসূদন যথাক্রমে নিজের শীর্ণ কবিত্বস্রোত ও সাহিত্যিক অদূরদর্শিতা এবং ভুলভ্রান্তি সম্পর্কে সচেতনতা ব্যক্ত করেছেন। এখানেও দেখতে পাচ্ছি, আকার লাভ করেছে সেই আপসোস: 'কেলিনু শৈবালে; ভুলি কমল-কানন!'

মধুসূদনের কবি প্রশস্তিমূলক রচনাবলি উৎকর্ষের পরিচয়বাহী নয়। চারজন বিদেশি কবির ওপর তিনি সনেট লিখেছেন। কবিরা হচ্ছেন পের্ত্রার্কা, দান্তে, টেনিসন ও ভিক্তোর উগো। ইটালির বিশ্ববিশ্রম্নত কবি পের্ত্রার্কা সনেটজাতীয় কবিতার প্রথম সফল রূপকার। পদলালিত্যময়, স্নিগ্ধতা জড়ানো উচ্চারণে সমৃদ্ধ পের্ত্রার্কার কাব্য অনুসরণেই তিনি সনেট লিখতে আরম্ব করেন। মধুসূদন এই কবি সম্পর্কে আর কিছু বলেননি। পের্ত্রার্কা-যে প্রেমের কবিতায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন, তার কবিতার প্রধান প্রেরণাদাত্রী ছিলেন লোরা নামের এক রমণী এসব তথ্য আমরা সংগ্রহ করি অন্য সূত্র থেকে।

দান্তেকে নিয়ে রচিত 'কবিগুরু দান্তে' সনেটটি রসোত্তীর্ণ রচনা। মাইকেল এখানে মধ্যযুগ ও নবজাগরণের সন্ধিক্ষণে দান্তের আবির্ভাবকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন। নিঃসংশয়চিত্তে বলেছেন, 'জন্ম তব পরম সুক্ষণে।' মহাকাব্য 'কমেদিয়া' (পড়সবফু)-র 'ইনফার্নো' (নরক) পর্বের এক জায়গায় দান্তে লিখেছেন, 'তোমরা যারা এখানে প্রবেশ করেছ সব আশা ছেড়ে দাও্ত এই পঙ্‌ক্তিটির ভাব-ছায়া পড়েছে 'কবিগুরু দান্তে' শীর্ষক সনেটে- 'সে বিষম দ্বার দিয়া; আঁধার নরকে,/যে বিষম দ্বার দিয়া, ত্যাজি আশা, পশে/পাপ প্রাণ, তুমি সাধু, পশিলা পুলকে।' টেনিসন ও ভিক্তোর উগোকে নিয়ে রচিত সনেটগুলোর তেমন কোনো বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে না। উগো সম্পর্কিত সনেটে ভিক্তোর উগোর নানামুখি প্রতিভার এবং তার রোমান্টিক স্বতঃস্ফূর্ততার চিহ্নমাত্র নেই। আছে 'ভবিষ্যদ্বক্তা কবি সতত এ ভবে'-র মতো প্রয়োগজীর্ণ উক্তি।

দেশি কবিদের ভেতর মাইকেল প্রশস্তি গেয়েছেন বাল্মীকি, কালিদাস, জয়দেব, কৃত্তিবাস ও ঈশ্বরগুপ্তের। এগুলো নিচুমানের মধুসূদনীয় কবিতা। বাল্মীকি সংক্রান্ত সনেটে বাল্মীকির কবি মাহাত্ম্যের চারু প্রকাশ ঘটেনি। 'জয়দেব'কে মনে হয়েছে সাধারণ মানের কবিতা। 'কাশীরাম দাস' কবিতাটি বরং অনেক ভালো। কবির প্রতি মধুসূদনের শ্রদ্ধাবোধ এই কবিতায় তার উচিত ভাষা খুঁজে পেয়েছে। অতুল কাব্যপ্রীতি কাশীরামকে সারাজীবন ভুগিয়েছে। সংসারের জটিল রীতি-নীতির বাঁধন আলগা হয়ে কখনো বা ঝুলে পড়েছে ওই অভাবনীয় কবিতাপ্রীতির জন্যই। 'সাংসারিক জ্ঞান' সনেটে কাব্যপ্রীতির পরিণতি ও তার প্রতিক্রিয়া মধুসূদন ব্যক্ত করেছেন এভাবে- 'কি কাজ বাজায়ে বীণা, কি কাজ জাগায়ে/সুমধুর প্রতিধ্বনি কাব্যের কাননে?/কি কাজ গরজে ঘন কাব্যের গগনে/মেঘরূপে, মনোরূপ ময়ূর নাচায়ে?'

জাগতিক টানাপড়েন আর শিল্পীসুলভ আত্মসংকটই মধুসূদনকে বাধ্য করেছিল কবির মতো সনেট লিখতে, যেখানে প্রকৃত কবির স্বভাব নির্ণয়ের আন্তরিক চেষ্টা আছে। এই চেষ্টার ভেতর মধুসূদনের নিজ কবিস্বভাবের প্রাতিস্বিকতাও লক্ষ্যযোগ্য। তিনি প্রশ্ন করেছেন, 'কে কবি- কবে কে মোরে? ঘটকালি করি,/শবদে শবদে বিয়া দেয় যেই জন,/সেই কি সে যম-দমী?' আবার নিজেই ওই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, 'সেই কবি মোর মতে কল্পনাসুন্দরী/যার মন: কমলেতে পাতেন আসন,/অস্তগামী-ভানুপ্রভাব-সদৃশ বিতরি/ভাবের সংসারে তার সুবর্ণ কিরণ।'

কবির সৃষ্টিশীলতা ও কল্পনাভাবনা সম্পর্কিত বোধটি তার মজ্জাগত। কিন্তু ইংরেজ রোমান্টিক কবিদের লেখায় আশ্রিত কল্পনাবৈভবের জয়গান মধুসূদনকে উসকে দিয়েছে সমধর্মী পঙ্‌ক্তি রচনা করতে। রবার্ট বেস্নকের মতো মরমিভাবসম্পন্ন জ্ঞানী কবিও রোমান্টিক ভাবধারার অনুগামী হয়েছেন। কল্পনাকে বসিয়েছেন অনেক উঁচু আসনে। বেস্নকের গরষঃড়হ নামের কবিতায় প্রযুক্ত এ পঙ্‌ক্তিটি লক্ষ্য করুন- ঞধশব ড়ভভ যরং ভরষঃযু মধৎসবহঃং ধহফ পষড়ঃযব যরস রিঃয/রসধমরহধঃরড়হ. মধুসূদনের কল্পনাস্তুতির মধ্যেও একই জাতের রোমান্টিক সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে। যেমন- 'মেঘনাদ বধ' কবিতার শুরুতেই বাণী-বন্দনার পরপরই, লেখক কল্পনাকে 'দেবী' বলে সম্বোধন করেছেন : 'তুমিও আইস, দেবী, তুমি মধুকরী/কল্পনা!'

সাহিত্যের দুঃসময়ে মধুসূদনের আবির্ভাব। উৎকৃষ্ট কবিতা সে যুগে আক্ষরিক অর্থেই দুর্লভ। দুর্বল কবিরা কোনো রকমে পদ মিলিয়ে মিলিয়ে কিছু একটা দাঁড় করাতেন তখন। সেই সময় মাইকেল নিয়ে এলেন এমন পয়ার যা অন্ত্যানুপ্রাস ও যতির নিয়ম রক্ষা করে না। সোজা কথায় অমিত্রাক্ষর ছন্দ দিয়েই তিনি নিস্তেজ বাংলা কবিতার শরীরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এই চাওয়ার ভেতর লুকিয়ে ছিল আরেকটি আকাঙ্ক্ষার বীজ। সেটা হচ্ছে 'বাংলার মিলটন' হতে চাওয়া।

মধুসূদন সংস্কৃত শব্দকোষের সাহায্য নিয়েছিলেন বটে। তবে তা যত না সজীব কাব্যভাষা খোঁজার গরজে, তার চেয়ে বেশি যুতসই অলংকার প্রয়োগের অভিপ্রায়ে। তা সত্ত্বেও তার কাব্যভাষা আন্তরধর্মে বাংলা। অন্যদিকে, সিনট্যাক্সের বিচারে, মধুসূদন মিলটনের অন্ধ অনুকারী নয়। ইংরেজি বাক্য গঠনে মিলটনের যে বৈভাষিক রীতি মাঝেমধ্যেই চোখে পড়ে তা মাইকেলে কখনোই অনুসৃত হয়নি।

প্রাকরণিক ও আদর্শিক অর্থে মধুসূদনই বাংলা কবিতায় প্রথম বিদ্রোহী। কেননা এক নিরুত্তাপ, নিস্তরঙ্গ দেশি বাংলা (আঞ্চলিক) ভাষায় তিনি যোগ করেছেন অদৃষ্টপূর্ব আলো, হৃদয়ের অভাবনীয় তাপ আর আন্তর্জাতিকতার ঢেউ। বাংলা কাব্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি অবলীলায় কবিতার জন্য কবিতা (অর্থাৎ শিল্পের জন্য শিল্প) চর্চা করে গেছেন।

অবশ্য এটা করতে গিয়ে কবি হিসেবে তার কিছু ক্ষতিও হয়েছে। যেমন- অনুপ্রাসের মতো একটি প্রাচীন রীতির অতি ব্যবহার তার মুদ্রাদোষে পরিণত হয়েছিল।

কিন্তু ছন্দ ও যতিচিহ্নের দুঃসাহসিক ব্যবহার তার কবিতাকে বৈচিত্র্যও কম দেয়নি। মধুসূদন সচেতনভাবেই বর্জন করেছিলেন তথাকথিত 'খাঁটি বাঙালিত্ব'। গ্রহণ করেছিলেন অনেক বিশ্বজনীন মত। তিনি বাংলা কবিতাকে মধ্যযুগ থেকে নিয়ে এসেছেন আধুনিক যুগের দোরগোড়ায়। তিনি একই সঙ্গে ধ্রম্নপদী ও আধুনিক। এই ধ্রম্নপদী আধুনিকতার সবরকম বৈশিষ্ট্যই, তার মহাকাব্যের মতো, তার সনেটগুচ্ছেও অস্তিত্বমান।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে