জন্মদিনের শুভেচ্ছা

শাহীন রেজা দূর উপলব্ধির ঠিকানায়

শাহীন রেজা দূর উপলব্ধির ঠিকানায়

এমন হয় যে, একজন কবি'র একটি কবিতা ভালো লেগে যায় আর সারাজীবন সেই কবি প্রিয় হয়ে থাকে। আবার এমন হয় যে, পড়তে পড়তে একজন কবি ভালোলাগার জায়গায় পৌঁছে যায়। সব কবিকে একটা নিঃসঙ্গতার জগৎ তৈরি করতে হয়। কোলাহলের মধ্যে থেকেও সে একা। সবাই তাকে দেখে না। কিন্তু সে সবাইকে দেখে। কবিতা কি শুধুই ভালো লাগার জন্য, আনন্দ দেওয়ার জন্য না আরো কিছু? আরো কিছু আমার ভাবনার জগৎকে সম্প্রসারিত করা আর এমন অনির্বচনীয় কিছু যা অভিব্যক্তি দিয়ে বোঝানো যায়। হয়তো শব্দে নয়, হয়তো কথায়ও নয়, হয়তো রঙে রেখায়। এর জন্য কবিতার অন্তস্রোতে থাকে নানা রঙ ও রেখা- যা আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন কড়া বাস্তববাদীরা। কবিরা কি, তারা কি করে, কবিতার ভূমিকা কি? এসব প্রশ্ন দার্শনিকদের, সমাজবেত্তাগণ বিশেষ করে এক শ্রেণি স্বৈর রাজতন্ত্রীদের। জিজ্ঞেসা করা অপরাধের নয় কিন্তু তা যদি হয় কবিতার ভূমিকা নিয়ে ঋণাত্মক চিন্তার শ্লেষ তখনই সোজা হয়ে দাঁড়াতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে আধুনিক কবিতার অনেক শত্রম্ন-মিত্র। কখনো নাটকে, কখনো বক্তৃতায় আমরা দেখি কবিদের ছোট করে দেখার প্রবণতা। আবার এরাই প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি সেজে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের জন্মতিথিতে বক্তৃতা করছে। স্বাধীনতার সংগ্রাম, '৫২-র ভাষা আন্দোলন এমনকি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে কবিরাই যে অগ্রণীর তীরন্দাজ তা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। বাংলা কবিতার মূল জায়গার প্রেম সর্বার্থে সেই প্রেম শুধু নর-নারীর জীবনযাপন নয় বরং দেশপ্রেম প্রকৃতির ঘনিষ্ঠতাও। স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলা কবিতার যে ধারাটি নানা দশকের অভিঘাত পার হয়ে আশির দশকে এসে চোখ মেললো- সে ধারার একজন শক্তিমান কবি শাহীন রেজা। শাহীন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বন্ধুত্ব শুধু কবিতার ভুবনের বাসিন্দা হিসেবে নয় বরং চেতনা ও সমচিন্তার দিক থেকে, নামেরও মিল আমাদের বন্ধুত্বকে প্রগতি দিয়েছে। আমরা লিখতে শুরু করেছি কিছু দায়িত্ববোধ থেকে। কবিতা যে কোনো বস্তুগত সম্পদ অর্জনে সহায়তা দেয় না বরং বিত্ত বৈভবের প্রতি উদাসীনতা কবির সংসার জগৎকে টলিয়ে দেয়।

একজন কবি প্রেমের ভেতর দিয়ে জীবন ও মৃতু্যর দ্বন্দ্বকেই যেন আবিষ্কার করেন। যতই রোমান্টিক মনে হোক শাহীন রেজা'র কবিতা কিন্তু অত্যন্ত গভীরে তাকে চারিত করে এক দুঃখদীর্ণ মনোভূমি। যেখানে তাকে দাঁড়াতে হয় সংগ্রামের সংগামী হয়ে। "দ্বৈরথ" কবিতাটি যখন আমরা শুনি অন্তহীন এক স্বপ্নের কথা, সংগ্রামের কথা -

ছয় মাত্রার মাত্রাবৃত্তে -

"দুঃখ ছিলোনা দুঃখ ছিলোনা কোনো

জলের ভেতর সাঁতার কাটার দিন

দু'চোখ জুড়ে মেঘেদের পোনা মাছ

ঘনঘোর রাত স্বপ্ন অন্তহীন"।

যথার্থ কবিতাকে জানা যায়, তার সঘন আবেগ, তার গভীর জলাবেগের পরিমাপ এবং বোধিমান পরিজ্ঞানে। ধারণার, চিন্তার, কল্পনার, অনুভূতির প্রভেদ সত্ত্বেও কবিদের বেদনার পৃথিবীর রং যেন একই। নানা চিত্ত চরিত্রের ভগ্নাংশ, দেশ ও ইতিহাসের খন্ড খন্ড যোগ দীপ্ত হয়ে ওঠে কবিতায়। কবিতা কি উপলব্ধির অগম্য অভিব্যক্তি? -ভাষাতীত অনির্বচনীয়ের?

কিন্তু তাকেও ধরতে হবে অধরাকে, কবে- কোথায়?

" নদীর ওপর থেকে ভেসে

যাওয়া নদী

কী কেমন সহজ তুলিতে

জলের গন্ধ আঁকে

আমাদের ভরা বুকে স

হজিয়া ভুলের করোটি

ভুলে যাই ভুল করে ভুলে

যাওয়া নাম

আর সেই ভুলের বানান"।

(ভুল)

শাহীন রেজার ভাবনা- তার ভুলে যাওয়া কিন্তু ভুলগুলোকে মনে রাখা। কে তার ভাবনার ওপর সব সময় নজর রাখতে পারে? টুকরো টুকরো এই ভুল জোড়া দিয়ে একটা কোলাজ, একটা ক্যানভাস এবং একটা কবিতা। ডেরেক ওয়ালকট সমুদ্রের ঢেউ জোড়া দিয়ে একটা স্বপ্ন তৈরি করেন। সিমাস হিনি তার স্মৃতি আর বেদনা জোড়া দিয়ে বাবার কালো বাক্সটা খুঁজে বেড়ান আর তা ঘটে অবিস্মরণীয় সব কবিতার পংক্তিতে। শাহীন রেজা'র "কবি মেনকা এবং একটি সন্ধ্যা রাত" কবিতাটি এ প্রসঙ্গে টেনে দিচ্ছি -

"কবি দাঁড়িয়ে আছেন অচঞ্চল প্রকৃতিকে আরও স্থবির করে তার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে মেনকা, স্বর্গের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী এবং কবির ভালোবাসা"।

কবির সামনে দিয়ে চলে যায় কবি দেখেন আর এক মহত্তম অনুভবের জাদুতে বন্দি করে ফেলেন। ঘটনার অভিজ্ঞতা ও পরিঘাত তাকে কোথাও স্থির হতে দেয় না। এক অসীম অন্বেষণ তাকে তাড়িয়ে ফেরে। শাহীন প্রশ্ন করেন অগ্রজ রবীন্দ্রনাথকে স্মৃতিসূত্র ধরে-

"ওদের রবীন্দ্রনাথ কি শেষের কবিতা হয়ে ওঠেনি"?

সব কবিতা শেষের কবিতা হয়ে ওঠে না। হয়তো জীবনের প্রথম কবিতাও হয় না। কোন কবিতা কোন সময়ের কোন মুহূর্তের যা বলে পাঠক আর সময়।

আমাদের অপেক্ষা করতে হয়। আশির দশক পার হয়ে দ্বিতীয় দশকে। এখনো আমরা শেষের কবিতা নয় বরং প্রথম কবিতাটিই খুঁজে ফিরছি।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের পারলৌকিক বন্ধনে বেশিদিন জড়াতে পারেননি, নজরুলের দ্রোহবোধ মাঝে মাঝে জ্বলে ওঠে, জীবনানন্দের বিশুদ্ধ নিঃসঙ্গ আমাদের ডাকে, আল মাহমুদের রাবেয়া দাঁড়িয়ে থাকে, শামসুর রাহমানের আদিগন্ত নগ্নবাদ ধ্বনি শোনা যায়। কিন্তু আমরা বলি- আপনারা ভালো থাকুন। দেখা হবে। অনেক কাজ। অন্যদিন দেখা হবে। মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে শাহীনের দেখা হয়। কিন্তু তার আত্মীয়তা অন্য বাড়িতে, অন্য কোনো দূর উপলব্ধির ঠিকানায়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে