মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯
walton1

হেমন্তের গান

মো. জোবায়ের আলী জুয়েল
  ০৪ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
ঋতু বৈচিত্র্যে সুসমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রকৃতি। বিধাতা তার অকৃপণ দানে এ দেশকে দিয়েছেন সৌন্দর্যে বিভূষিত করে। সারা বছর প্রকৃতি এক থাকে না। বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন সাজে সজ্জিত হয় এ দেশের প্রকৃতি। বাংলাদেশ ছয় ঋতুর দেশ। বারো মাসে আমাদের ছয়টি ঋতু- গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। নামেও যেমন এদের বৈচিত্র্য রূপে, প্রকৃতিতেও বিচিত্রতা নিয়ে তারা দেখা দেয়। এ দেশের জীবনে ও প্রকৃতিতে নানারকমভাবে নিজেকে তারা তুলে ধরে। বসন্ত ঋতুরাজ অপরাপর ঋতুর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে কম আকর্ষণীয় নয়। সব ঋতুই নিজ নিজ রূপ নিয়ে এখানকার মানুষের মন ভোলায়। নিছক ভালোলাগা দিয়ে প্রিয় ঋতু নির্বাচন করা সমীচীন মনে করা ঠিক নয়। আর পাঁচটা ঋতুকে বাদ দিয়ে হেমন্তকে মনে ভালোবাসার আসন দেয়ার পেছনে নিশ্চই যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। অন্য ঋতুকে প্রত্যক্ষ করা, উপভোগ করা জীবনের সাধারণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে। গ্রীষ্মের প্রখর গরম, বর্ষার বৃষ্টি আর কাদা, শরতের মেঘপুঞ্জ আকাশ, শীতের আমেজ আর বসন্তের সৌন্দর্যের সঙ্গে খরার তীব্রতা- কোনো কিছুই যেন হৃদয়ে আপন করে গ্রহণ করার মতো নয়। দায়ে পড়ে এদের সঙ্গে যেন বসবাস করতে হয়। কিন্তু হেমন্তের ব্যাপারটি আলাদা। সে যেন হৃদয়ে আসন পেতে বসে আছে। তাকে বের করা যায় না, তাকে ভুলে থাকা যায় না। কারণটি লুকিয়ে আছে হেমন্তের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে। শরতের পূর্ণতার পরিণতি রূপলাভ করে হেমন্ত। কার্তিক ও অগ্রাহয়ণ এই দুই মাস হেমন্ত কাল। দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠগুলো সোনালি ধানে ভরে যায় এবং দিগন্তে নীল বর্ণ রেখায় মিশে একাকার হয়ে যায়। হেমন্ত আসে শরতের পায়ে পায়ে। চলে যায় শীতের পদধ্বনি শুনতে শুনতে। বর্ষার প্রচুর পানি পেয়ে প্রকৃতি সতেজ হয়ে ওঠে। শরতের মাসে তার যথাযথ প্রকাশ। শরতের মন ভোলানো রূপের পশরার মাঝেই হেমন্তের শুভ আগমন ঘটে। হেমন্তের বৈশিষ্ট্য তার ফসল ভরা মাঠে নিহিত। দেশের মানুষের আগামী দিনের সম্ভাবনা নিয়ে আসে হেমন্ত। মাঠে মাঠে পাকা ধানের সীমাহীন সমারোহ। মাঠ ভরা ফসলের উপহার নিয়ে আসে হেমন্ত। বাংলাদেশের প্রকৃতি তখন নতুন সাজে সেজে ওঠে। তার মধ্যে যেন পরিপূর্ণতা। আকাশে-বাতাসে ফসলের মন জুড়ানো গন্ধ যেন ভেসে বেড়ায়। অনেক আশায় মানুষ মাঠে যে শ্রম দিয়েছিল তার ফল পায় ফসল হিসেবে এ সময়ে। আশার পূরণ ঘটে এ সময়ে। ফসল পেয়ে কৃষকের মুখে যে হাসি ফুটে ওঠে তা'ছড়িয়ে যায় সারাদেশে। নীলাক্ষী হেমন্ত কৃষককে করে আশীর্বাদ। ফসল কাটার গানে হেমন্তের মাঠ হয়ে ওঠে মুখর। কার্তিক ও অগ্রাহয়ণের প্রথম শীতের আমেজ পেয়ে ঘাসের মাথায় মাথায় জমে ওঠে শিশির কণা। কৃষকের উঠোনে জমে ধান। সংসারে জমে ওঠে প্রচুর কাজ। রাত্রির প্রায় অর্ধেকটা চলে ধান মাড়াইয়ের ব্যস্ততা। রাত্রি প্রায় শেষ হওয়ার পূর্বেই গৃহবধূ যায় উনুনের পাশে, চলে ধান সিদ্ধ করার পালা। মাঠে রবি শস্যের জন্য চলে চাষাবাদের কাজ। কোথাও পাকা ধানে হলুদ বর্ণ, কোথাও ধান কাটা শূন্য মাঠে শালিক পাখির ব্যস্ততা। হেমন্ত আমাদের সমৃদ্ধি দেয়, আনন্দ দেয়। জীবনকে করে তোলে সুখকর। তাই হেমন্ত ঋতুকে আমাদের প্রিয় ঋতুর মর্যাদা দিতে হয়। হেমন্ত ঋতুর সৌন্দর্য্যের প্রধান দিক তার ফসল ভরা মাঠে মাঠে পাকা ফসল সোনালি রং ছড়িয়ে থাকে। আকাশ থাকে নির্মল নীলাকাশ। বাতাসের হালকা ঢঙে ফসলের শিষ নাড়া দিয়ে যেন খেলা করে বেড়ায়। তখন গরমের কোনো প্রভাব নেই। শীতের আমেজ অনুভব করার সুযোগ তখন ঘটে না। আবহাওয়ার এমন উপাদেয় পরিবেশ তার কোনো ঋতুতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রকৃতিকে তখন খুব চমৎকার উপভোগ্য বলে মনে হয়। হেমন্ত ঋতু বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। হেমন্তের অবদানেই দেশের সমৃদ্ধি, মানুষের সুখ। হৈমন্তিক প্রকৃতির এই আনন্দময় অবদান মানুষের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। আনন্দ উৎসবে মেতে থাকার ঋতু এই হেমন্ত। পার্বনের আনন্দ স্পর্শ জাগায় মনে মনে। তাই কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে- হেমন্তের গান শুনি শিরায় শিরায়, এসেছে সে গানের সুর/ফসলের মাঠ থেকে দূর বহু দূর ভরে দেশ মন আনন্দ ধারায়।/আকাশের নির্মেঘ রূপ আজ বাতাসে ছড়ায় খুশির কারুকাজ/পরম তৃপ্তিতে যেন হৃদয়ে খুশি ঝরায়/হেমন্তের গান শুনি শিরায় শিরায়।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে