logo
বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৬

  সালেহ আহমাদ   ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

অদৃশ্য ছায়ার সঙ্গে বসবাস

অদৃশ্য ছায়ার সঙ্গে বসবাস
শহরের বন্ধন ছিন্ন করে গাঁয়ে ফিরছে মিতুল। কত বছর পর গাঁয়ে ফিরছে? ঠিক মনে করতে পারল না। হিসাব করতে থাকে- সর্বশেষ সে গাঁয়ে এসেছিল মা মারা যাওয়ার দিন- এগার বছর আগে। তারমানে এগার বছর আগে সে শেষবার গাঁয়ে এসেছিল। সময় কত দ্রম্নত চলে যায়! জুড়ি স্টেশনে নামতেই দেখল ছোট দুইভাই, তাদের বাচ্চারাসহ উপস্থিত। স্টেশনে নামতেই কিছুটা চমকে গেল মিতুল! সেই জরাজীর্ণ লাইটপোস্ট, সেই লোহার বেঞ্চ, সেই আবজর্নার স্তূপ। এগার বছর আগের দেখা স্টেশনের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

তার ভালোবাসার গ্রামটিও কী আগের মতো রয়েছে? তেমন থাকলে তার ভালো লাগবে না। সে চায় একটা পরিবর্তিত গ্রাম। যে গ্রামে আগের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবে না। আগের স্মৃতি তাকে কাতর করবে না। সে কাতর হলে জীবনের অবশিষ্ট সময় এখানে কাটাবে কেমনে?

মিতুল ভেবেছিল গ্রামে তার দ্বিতীয় জন্মের প্রথম বিকেলটা দেখবে- দেখা হলো না। কুলাউড়ায় ক্রসিং অনেকটা সময় কেড়ে নেয়ায় ইচ্ছে অপূর্ণই রয়ে গেল। দ্বিতীয় জনম কী সম্ভব! অতীত ভুলা! বিশেষ করে ছেলেবেলা, শৈশব-কৈশোর কেউ ভুলতে পারে? কিন্তু তাকে পারতেই হবে। অসম্ভবকে সম্ভব করার নজিরতো অনেক আছে। অতীত ভুলার নজিরও আছে। ঠাঁকুরগাঁয়ের ব্যাংকার সহকর্মী ইব্রাহিমের কথা মনে পড়ে। স্টেশন ক্লাবে প্রতিরাতেই একসঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছে। এক সন্ধ্যায় বড়মাঠে ফোসকা খেতে খেতে ইব্রাহিম বলেছিল, আচ্ছা মিতুল, কোনো মানুষ কী তার ছেলেবেলা, শৈশব- কৈশোর ভুলে যেতে পারে?

কঠিন প্রশ্ন! আমার ধারণা, পারে না। তবে প্রকৃতিগতভাবে জিরো থেকে চার বছরের স্মৃতিসমূহ মেমোরি থেকে মুছে যায়। পাঁচ-ছয় বছরের স্মৃতি মনে রাখার চেষ্টা করলে সম্ভব হতে পারে। এর পরের স্মৃতি ইচ্ছে করলেও ভুলা যায় না। অবশ্য মস্তিষ্কজনিত দুর্ঘটনায় এমনটা হতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থায় এমন ঘটা কোনো ঘটনা আমার জানা নেই।

দুর্ঘটনা ব্যতিরেকে যদি এমন ঘটনা ঘটে সেটাকে কী বলা যায়?

হঠাৎ তোমার এমন প্রশ্ন কেন, বলো তো?

পারিবারিক সমস্যার কারণে আমার মেঝো মেয়েকে পনের বছর বয়সে যেতে হয় বড় মামার বাড়ি। কয়েক বছর পর তার কথাবার্তায় মনে হয় সে অতীত ভুলে গেছে। মেয়েটির ধারণা বড় মামা বড় মামিই তার আসল বাবা-মা! তাদের সন্তানই তার আসল ভাইবোন।

ইব্রাহিম, এটা অস্বাভাবিক ব্যাপার! তবে এটা যদি অটোমেটিক হয়ে থাকে, তাহলে তোমার আত্মীয়ের দৃষ্টিতে অবশ্যই পড়েছে। তখন বিষয়টা তোমাকে জানানো উচিত ছিল। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত ছিল। তা না করে থাকলে কাজটি ঠিক হয়নি।

যদি এমন হয়, এটা তাদেরই সৃষ্টি!

এটা কী বল? মামা-মামি এটা করতে যাবে কেন?

মিতুল, আমি শতভাগ বিশ্বাস করি এটা তাদের ইচ্ছাকৃত।

\হগোলকধাঁধায় ফেললো ইব্রাহিম। মামা-মামিরা আদর্শ মামা-মামি হতে চায়। সেরা মামা-মামি হতে চায়। বোনের মেয়ের বাবা-মা হতে যাবে কেন? নিঃসন্তান হলেও কিছুটা গ্রহণযোগ্য হতো। নিঃসন্তান তো নয়, হিসেবে মিলছে না!

আমার হিসেবও তো মিলছে না!

মিতুল ভাবতে থাকে, এটা কেমন করে সম্ভব! বিজ্ঞান যা সমর্থন করে না, তা তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়। অথচ বিশ্বাস করতে হচ্ছে। মিতুল বলল, আচ্ছা ইব্রাহিম, বল তো মেয়েটার শিশুবেলা এবং শৈশব কতটা রিচ্‌ ছিল?

খুবই রিচ্‌ ছিল। যৌথপরিবারের মধ্যমণি ছিল।

\হমেয়েটা কী এখনো সবার প্রিয়?

আমার তা মনে হয় না।

মনে না হওয়ার কারণ ?

\হমেয়েটার বেড়ে ওঠার সময়ে যারা সার্বক্ষণিক দেখভাল করেছে, তাদের সঙ্গে মেয়েটি যোগাযোগ করার চেষ্টা করে না।

ওই পরিবারের অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক?

বাইরে থেকে মনে হবে দূরত্ব কিছুটা। প্রকৃত অর্থে দূরত্বটা অনেক বেশি। এর একমাত্র কারণ মেয়েটার মামি।

ইব্রাহিম, পৃথিবীতে মানুষ সবচে রহস্যময় প্রাণী। যা বাইরে থেকে বুঝার উপায় নেই। তবে অস্বাভাবিক আচরণ দেখে অনেকে বুঝতে পারে। রহস্যঘেরা মানুষরা নানা কারণে নোংরা খেলায় মেতে থাকে। ওই মহিলা সেটাই করেছে। মেয়েটার কাছে তোমাকে এবং তোমার পরিবারকে 'কলঙ্কিত' হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কেউ-ই কলঙ্কিত কাউকে মনে রাখতে চায় না। তোমার মেয়েও চায়নি। এটা অবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। কিন্তু অস্বাভাবিক নয়। তবে আমার বিশ্বাস, মেয়েটা অতীত ভুলেনি। একটা ঘোরে আছে। ঘোর কাটতে সময় নেবে।

\হঘোরে আছে সেটা বুঝতে পারি। আমার প্রশ্ন এটা কেন? কী কারণে?

এর পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, মেয়েটার মাধ্যমে অন্য কাউকে কষ্ট দেয়া বা তাকে কাছে টানার চেষ্টা। দ্বিতীয়ত, স্বভাবসুলভ অস্বাভাবিক বিষয় নিয়ে খেলা। এ জন্য প্রয়োজন একটা গিনিপিগ। তোমার মেয়েকে বানানো হয়েছে সেই গিনিপিগ।

মিতুল ভাবে এই অস্বাভাবিক ঘটনা তার জীবনে ঘটলে মন্দ হতো না। সে অতীত ভুলে যেতে পারতো। তরুকে ভুলে যেতে পারতো। সবকিছু সে নতুন করে শুরু করতে পারতো। মিতুল টের পায়, তার ভেতরে ইব্রাহিমের ওই আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে জাগ্রত হচ্ছে। গত দশ বছরে ইব্রাহিমের সঙ্গে দেখা হয়নি। খোঁজ করলে হয়তো সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। মিতুল সিদ্ধান্ত নেয়, অতীতের কারণে তার জীবন দুর্বিষহ হলে সে ইব্রাহিমকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে।

\হস্টেশন থেকে বের হতেই তার মনে হলো পশ্চিম আকাশে রক্তিম সূর্যটি আর নেই। ভাইয়েরা বলল, রিকশা নিই।

না আমি হেঁটেই যাব। অনেকদিন মেঠোপথে হাঁটা হয় না।

ভাই, ভাতিজার মাঝে রয়েছে মিতুল। মনোভাব এমন, যেন বাচ্চা ছেলেটা পথ ভুলে ভুল পথে চলে না যায়।

মিতুলের হাঁটতে মন্দ লাগছে না। জন্মভূমির সুধাগন্ধে তার বুক ভরে যেতে থাকলো। মনে হলো তাদের সঙ্গে ঝিঁঝিঁ পোকা আছে। জোনাকি আছে। তারকা ভরা আকাশ আছে। ঝিঁঝিঁ পোকার কান ফাটানো আওয়াজ ওস্তাদ আলাউদ্দিনের সরোদ সংগীত মনে হলো। জোনাকির আলো দেখে মনে হলো, এরা পরম বন্ধুর মতো পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই অনেকগুলো শেয়াল চোখে পড়লো। তারা ডাকতে শুরু করল। মিতুলের মনে হলো, শেয়ালগুলো তাকে বাড়ি ফেরার জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছে। ঘেউ ঘেউ করে ক'টা কুকুর দৌড়িয়ে এলো। শেয়ালগুলো সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল না। কুকুরগুলোকে দেখে চলে গেল। মিতুল দেখলো শেয়ালের চাহনি যেন সোনালি সার্চলাইট। চমৎকার।

ঝিঁঝিঁ পোকা, জোনাকি, শেয়াল, কুকুর- এসব দেখে মিতুলের মনে হলো, সে প্রকৃতির মাঝে ফিরে এসেছে। এখানে তরুকে ভুলে থাকা কঠিন হবে না

মিতুলের ঘুম ভাঙল পাখির কূজনে। সে চমৎকৃত হলো! জীবিকার প্রয়োজনে দীর্ঘদিন সারাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছে। কোথাও পাখির কূজনে ঘুম ভাঙেনি। পাখির কল-কাকলি এতটা সুধা বর্ষণ করে, যেন আজকেই তার জানা হলো। জানলা খুলে পাখি দেখার চেষ্টা করল- পারলো না। আঁধার কাটেনি। সু-উচ্চ গাছের মগডালে বসা পাখি তার পক্ষে দেখা সম্ভব হবে না। বিছানায় যেতে ইচ্ছে করল না। জানলার ধারেই বসে থাকলো।

মিতুল বাড়িতে একা। পুরনো বাড়িটা তার জন্য রেখে পাশে বাড়ি করেছে অন্যান্য ভাইয়েরা। তাদের সন্তান, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটে মিতুলের। বেশিরভাগ সময় তাকে একা কাটাতে হয়। বিষয়টা এমন হবে- এটা যেমন মিতুল জানতো, তেমনি প্রতিবেশীরাও জানতো। সে কারণে সিলেটের প্রতিবেশী ক'জন বলেছিল, বাড়ি গিয়ে কী হবে? সেখানেও একা, এখানেও একা।

তা ঠিক। আমি গাঁয়ে ফিরে জীবনকে নতুন করে সাজাতে চাই।

একজন তামাশা করে বলেছিল, বিয়ে-সাদী করার ইচ্ছে আছে না-কী? মিতুল হেসে হেসে বলেছিল, সে সময় কী আর আছে? নতুন করে জীবন সাজানো মানে অতীত ভুলে যাওয়া। আমার নতুন জীবনে কোনো অতীত থাকবে না, ভবিষ্যৎ থাকবে না। থাকবে কেবলি বর্তমান। প্রকৃতির সহায়তা ছাড়া এটা সম্ভব হবে না। তাই আমি প্রকৃতির কুলে ফিরছি।

প্রতিদিনই সে চমকে যাচ্ছে! যে অতীত ভুলার জন্য গ্রামে আসা- গ্রামের প্রতিটা জায়গাতেই সেই অতীত জীবন্ত। সে ভেবে পায় না, কেমন করে এই জীবন্ত অতীত ভুলে যাবে? তার মনে হতে থাকে সে যতটা চেষ্টা করছে অতীত ভুলে যেতে, গ্রাম তার চেয়ে অধিক চেষ্টা করছে, না- ভুলাতে। সবুজ গাঁ, গাঁয়ের মেঠোপথ, চা বাগান, হাকালকি হাওর, মাধবকুন্ড জলপ্রপাত- যেখানে যায় সেখানেই শৈশব তার সামনে চলে আসে। সবখানেই দেখতে পায় তরুকে। কখনো তরু হাত ধরে হাঁটে, কখনো দৌড়িয়ে সামনে যায়। কখনো বা পেছন থেকে ডাকে। কোথাও বসামাত্রই মনে হয় সশরীরে তরু পাশে বসে আছে। তার সঙ্গে কথা বলছে। সে-ও জবাব দিচ্ছে।

মিতুল বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, তরু শুধু তার মাঝে নয় প্রকৃতির মাঝেও জীবন্ত। গ্রামের প্রতিটা জায়গাতেই তরু জীবন্ত। বাড়ি থেকে বের হওয়া মাত্রই জীবন্ত তরু সান্নিধ্যে চলে আসে। কথা বলে। কখনো স্বাভাবিক কণ্ঠে, কখনো ফিসফিসিয়ে। হাসে প্রতি কথাতেই। কখনো চা বাগানে লুকিয়ে লুকোচুরি খেলে- মিতুলের মনে হয়, এটাই তার শৈশব। এটাই তার কৈশোর।

প্রথম প্রথম মিতুল ভেতরে ভয় টের পেয়েছে। অন্যরকম আশঙ্কা জেগেছে- তবে কী তরু নেই? তরুর আত্মা গ্রামে ফিরে এসেছে! তার ভয় পাওয়া তরুর চোখ এড়ায় না। তরু বলেছে, তুমি কী ভাবছো আমি মরে গেছি? মরে ভূত হয়ে গেছি? তোমার ধারণা মিথ্যে মিতুল। তোমাকে একা রেখে আমি মরতে পারি না।

ক্রমশ মিতুল স্বাভাবিক হতে থাকে। স্বাভাবিক হওয়ার পর থেকে মিতুলের ঘরে থাকা হয় না। বাইরেই সময় কাটাতে থাকে। আজ অনেকটা আগেই ঘর থেকে বের হলো। কিছুটা ক্লান্ত হয়ে চা বাগানের একটা সেডট্রির নিচে বসল। বসামাত্রই তরুর কথা শুনতে পেল। আজ এত তাড়াতাড়ি এলে যে?

ঘরে ভালো লাগছিল না।

আচ্ছা বলো তো, এমন করে জীবনটা শেষ করলে কেন?

এমন করে- মানে?

আমাকে মনে রেখেই জীবন পার করলে! তোমার ঘর হলো না, সংসার হলো না। ছোট বাচ্চাদের হাসি-কান্না শুনতে পেলে না। সংসারের মিষ্টি সৌরভে তোমার দেহ-মনে উজ্জ্বল হলো না।

তোমার হয়েছে? তুমি পেরেছো?

তুমি যা পারোনি, সেটা আমি কেমন করে পারবো? আমার ভেতরের সবটা জুড়ে তুমি। সেখানে অন্য কাউকে কেমনে জায়গা দিই, বলো?

বাগানের ম্যানেজারের কথা কানে আসতেই চুপ হয়ে যায় মিতুল- মিতুল সাহেব না?

হঁ্যা। আপনি কেমন আছেন ম্যানেজার সাহেব?

ভালো। তো একাকী কার সঙ্গে কথা বলছিলেন?

কথা বলছিলাম মানে?

আমি তো স্পষ্ট শুনতে পেলাম, আপনি কথা বলছেন।

হয়তো আবৃত্তি করছিলাম। ছোট বেলার অভ্যাসটা এখনো রয়ে গেছে- যেটা আমি বুঝি না। তা ছাড়া রিটায়ার্ড মানুষ, এক অর্থে বেকার। একা একা বসে থাকা, একা একা কথা বলে সময় কাটানো ছাড়া কী-ই বা করার আছে, বলুন?

আপনার ভাইয়ের কাছে আপনার অনেক কথা শুনেছি। যতই শুনেছি ততই চমকে গেছি।

চমকে গেছেন?

চমকে না গিয়ে উপায় কী বলুন? এ যুগে এমন ঘটনা চমকে যাওয়ার মতো নয় কী? মিতুল কিছু বলে না। ম্যানেজার সাহেব বলতে থাকে- আমার অফিসে আসুন। কথা বলে সময় কাটানো যাবে। আপনার মতো আমিও একা। তবে আপনার সঙ্গে তফাৎ হলো আমার সংসার আছে। বাচ্চা-কাচ্চা আছে। এই অজ পাড়াগাঁয়ে তাদের রাখা যায় না। পড়ালেখার সুবিধা নেই। চিকিৎসার সুবিধা নেই। তাই বাধ্য হয়েই একা থাকতে হয়।

আপনার বাগানে তো অনেক মানুষ। একা বলছেন কেন?

এটা ঠিক, বাগানে অনেক মানুষ। তবে কথা বলার তেমন কেউ নেই। আপনি আসুন। বাগানের অরিজিনাল চা খাওয়াব। এই চায়ের স্বাদ দার্জিলিংয়ের চায়ের চেয়েও বেশি। এগুলো সরাসরি পোর্টে চলে যায়। দেশের মানুষ এ চা খেতে পায় না। একবার খেলে বারবার খেতে ইচ্ছে করবে। আসবেন অবশ্যই।

আসবো। তবে চা খেতে নয়, গল্প করতে। যে চা দেশের মানুষ খেতে পায় না, সে চা'য়ে আমার রুচি হবে না।

ঠিক আছে, সাধারণ চা-ই খাওয়াব। ম্যানেজার সাহেব চলে যেতেই তরু কথা বলতে শুরু করল। অনেকদিন তোমার আবৃত্তি শুনা হয়নি। একটা আবৃত্তি কর তো।

ভুলে গেছি।

ভুলে গেছ?

\হকেন যাব না? আবৃত্তি তো তোমার জন্যই ছিল! তুমি নেই আবৃত্তিও নেই।

আবার কিন্তু ভুল করলে?

ভুল করলাম?

এই যে বললে- তুমি নেই। আমি তো আছি। তোমার গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছি।

অনেকদিন তো ছিলে না। তাই ভুলে গেছি।

চলো হাকালকিতে যাই। অনেকদিন হাকালকিতে পা ডুবিয়ে বসা হয় না।

হাকালকির কথা তোমার মনে আছে?

হাকালকির কথা মনে থাকবে না কেন? তুমি কী ভুলে গেছ?

হাকালকি আর তুমি তো একই সমান্তরালে- কেমন করে হাকালকিকে ভুলে গেলে?

আমারো তো একই কথা! আমার হাতটা ধরবে?

\হতোমার হাত কেমন করে ধরব? দেখতেই তো পাচ্ছি না।

তাহলে আমি তোমার হাত ধরি।

ধরবে? ধরো।

এই ধরলাম। সঙ্গে সঙ্গে মিতুলের মনে হলো সত্যিই কেউ একজন তার হাত ধরল। এখন বুঝতে পেরেছো, আমি জীবন্ত। মিতুল হাকালকি তো সেই আগের মতোই আছে। সেই বরফ ঠান্ডা পানি। সেই হাজারো পদ্ম। পদ্মের ওপর মৌমাছিদের ছোটাছুটি। পদ্ম তুলতে বাচ্চাদের দৌড়ঝাঁপ- সবই আগের মতোই। তাই না?

মানুষ থেকে থেকেই বদলায়- প্রকৃতি বদলায় না।

সামনে দেখ তো, কিছু দেখতে পাও কিনা?

হাজারো পদ্ম, পদ্মের ওপর মৌমাছি উড়ছে-স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে।

আরো কিছু?

আর কিছু তো চোখে পড়ছে না।

হাফপ্যান্ট পরা দু'টো ছেলেমেয়ে দেখতে পাচ্ছ না? গাঁতরে পদ্ম তুলছে। যেন ছেলেবেলার মিতুল-তরু, ঠিক বলছি না?

\হকেমন মিষ্টি ছেলেবেলা ছিল আমাদের, তাই না?

\হসে আর বলতে!

বলো তো শেষবার আমরা কবে হাকালকিতে এসেছিলাম?

মিতুল আমার মস্তিষ্ক মন্দ নয়। তা ছাড়া মনের ওপর প্রথম যে ছাপটি পড়ে, তা রয়ে যায় জীবনভর। আমি ব্যতিক্রম নই। তবুও বলি- আমি ভুলার চেষ্টা করিনি। আমি যদি ছেলেবেলা ভুলি, শৈশব ভুলি, কৈশোর ভুলি, তোমাকে ভুলি-তাহলে আমার থাকলোটা কী? সিলেট যাওয়ার আগের দিন বিকেলে আমরা এসেছিলাম- ঠিক বলেছি? মিতুল হাসলো কিছু বলল না। সেদিন আমাকে পাগল বলেছিলে- মনে আছে?

তুমি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী কথা বলছিলে, ভিন্নধর্মী কাজ করেছিলে। পাগল ছাড়া অমনটা কেউ করে কখনো?

\হমোটেই ভিন্নধর্মী বিষয় ছিল না।

তুমি এসেই বললে, আজকের আকাশ অস্বাভাবিক নীল। নীলের গা ছুঁয়ে চলা সাদা মেঘমালাও অস্বাভাবিক সাদা। চা বাগান আরো বেশি সবুজ- আমি বললাম, বড়দের মতো কথা বলছো, ব্যাপার কী?

বড়দের মতো কথা বলছি মানে? আমি বড় হয়েছি না?

বড় হয়েছ?

এসএসসি দিলাম। তিনমাস পর তোমার কলেজে ভর্তি হবো। এমসি কলেজের সবুজ চত্বরে তোমার হাত ধরে হাঁটবো। কলেজ ফাঁকি দিয়ে শাড়ি পরে জাফলং যাব। নুড়ি কুড়িয়ে মালা গাঁথবো। এখন শাড়ি পরতে ভালো লাগে। দীর্ঘক্ষণ আয়নায় নিজেকে দেখতে ভালো লাগে।

আর কী ভালো লাগে?

সারাক্ষণ তোমার সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে। আর এই মুহূর্তে তোমাকে চুমু খেতে- সঙ্গে সঙ্গেই তোমাকে চুমু খেয়েছিলাম। তুমি বললে আমি একটা পাগল। সে সব কী পাগলামি ছিল?

\হতোমাদের সিলেটের বাড়ির বেলকুনিতে শেষ কবে বসেছিলাম, সেটা মনে আছে?

অবশ্যই আছে। লন্ডন চলে যাওয়ার ঠিক পনের দিন আগে।

কৃষ্ণচূড়ার ফুলে ফুলে ভ্রমর উড়ছিল। তুমি বললে অভাগা। আমি বললাম কেন? তুমি বললে, কারো প্রেম হচ্ছে না, উড়াই সার। আমি বললাম তোমার-আমার?

জবাব দেয়ার আগে তুমি অনেকক্ষণ পলক না ফেলে আমায় দেখলে, তারপর হেসে জবাব দিলে। কি জবাব দিয়েছিলে মনে আছে?

অবশ্যই আছে। তোমার হাতে হাত রেখে কবিতার মতো করে বলেছিলাম, এমনি করিয়া হাজারো বছর ধরিয়া হাকালকির পদ্ম হয়ে ভালোবাসায় ভাসবো। ভোরের শিশির হয়ে ঘাসের ডগায় হাসবো। পাখিরা গাহিবে গান, দক্ষিণায় জাগিবে প্রাণ, জোনাকির ঝিলমিল আলোতে বাজিবে নতুন তান-কী ঠিক হয়েছে তো? সেই তুমি কিচ্ছু না বলে চুপিসারে লন্ডন চলে গেলে! একবারও আমার কথা ভাবলে না?

তরু মিতুলের কথা ভাবেনি, তা কেমন করে মিতুল? শুধু শুনে রাখ, আমি যদি বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধাচরণ করতাম, তাহলে তোমাকে সারাজীবনের জন্য হারাতে হতো। আমি তোমাকে হারাতে চাইনি।

এত পরে ফিরে এলে কেন?

এর আগে তো তুমি একা ছিলে না। চাকরি নিয়ে ব্যস্ত ছিলে। অবসর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কাটাতে। অবসর জীবনে তুমি একা। তোমার একাকিত্ব আমাকে কষ্ট দেয়। সেই কষ্ট দূর করতেই তো আসা। মিতুল তুমি সকালে নাস্তা না করেই এসেছো। এখন দুপুরে খাওয়ার সময়- ওঠো

সকালে নাস্তা হয়নি, তুমি জানলে কেমনে?

আমার মিতুলের খবর আমি জানবো না! তা কেমন করে হয়?

আর কিছুটা সময় বসি। বাড়ি গেলেই তো তোমাকে হারাবো। তুমিও বাড়ি চলো?

\হযেতে তো চা-ই। আমি তো সে অধিকার পাইনি এখনো!

\হতোমাকে সে অধিকার দিলাম।

এভাবে হয় না মিতুল। চলো তোমাকে পৌঁছে দিই। ওঠো।

সময় যাচ্ছে সময়ের নিয়মে। সময়ের সঙ্গে মিতুল তাল মেলাতে পারছে না। সারাক্ষণ চা বাগান আর হাকালকিতে বসে থাকা, বাড়ি ভালো না লাগা। ঘর ভালো না লাগা। ভেতরের কষ্ট কারো সঙ্গে শেয়ার করতে না পারা- এসব দেখে ভাই, ভাতিজা, গাঁয়ের মানুষের ধারণা মিতুল পাগল হয়ে যাচ্ছে। আসলে কী সে পাগল হয়ে যাচ্ছে? পাগল না হলেও সে একটা ঘোরের মধ্যে আছে। অদৃশ্য ছায়ার সঙ্গে বসবাস করছে। এভাবে কতদিন চলবে, সে জানে না। মিতুল সিদ্ধান্ত নেয়, সে গাঁ থেকে চলে যাবে। ইব্রাহিমকে খুঁজে বের করবে। ইব্রাহিমের আত্মীয়ের কাছ থেকে অতীত ভুলার মন্ত্র নেবে। অতীত ভুলতে না পারলে সে ঠিকই পাগল হয়ে যাবে।

লাগেজ গোছাতে গিয়ে একটা ছোট কাগজ চোখে পড়ে। বেশ পুরনো। ভাঁজ খুলতেই চমকে যায়- ত্রিশ বছর আগে তরুর দেয়া প্রথম ও শেষ চিঠি। তরু লিখেছিল- মিতুল, আমি অবশ্যই ফিরবো। বাবা পাসপোর্ট সারেন্ডার করেছে। সে কারণে হয়তো কিছুটা সময় নেবে। আমার জন্য ক'বছর অপেক্ষা করো। তারপর না হয় ভুলে যেও। মিতুল ভেবে পায় না- যে তরুকে ভুলে যেতে তার এত প্রচেষ্টা! সেই তরুর চিঠি সে বইয়ে বেড়াচ্ছে ত্রিশ বছর ধরে!

মিতুল গ্রাম ছাড়ছে। ঘণ্টাখানেক পরই তার ট্রেন। ভাই, ভাবী, ভাতিজা- সবাই অশ্রম্নসজল। অশ্রম্নসজল মিতুল নিজেও। টিসু্যপেপারে চোখ মুছছে। চোখ মুছে সামনে তাকাতেই দেখলো, ডাকপিওন রমেশ সামনে দাঁড়িয়ে। রমেশ বলল, কাকা আপনার চিঠি।

মিতুল হাত বাড়িয়ে চিঠি নিল। চোখের সামনে ধরতেই ভূত দেখার মতো চমকে গেল- তরুর চিঠি! ***
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে