শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১

কেন্দ্রীয় চরিত্র যখন নারী

আফসানা বেগম
  ১১ জুন ২০২৪, ০০:০০
কেন্দ্রীয় চরিত্র যখন নারী

সাহিত্যে পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতেই নারী চরিত্রকেন্দ্রিক সাহিত্যের জন্ম। পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার মূলে আঘাত হানতে এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক পুরুষবাদী কাঠামোতে লিঙ্গবাদী চিন্তাধারা পরিবর্তনে নারী চরিত্রকেন্দ্রিক সাহিত্য বিশেষ ভূমিকা রাখে। সাহিত্যে নারী চরিত্রকে অসহায়, অবজ্ঞাকারী এবং নিন্দিত আর পুরুষকে সৃষ্টিশীল, ক্ষমতার আধার ও নারীকে অধীনস্থ করে রাখতে পারদর্শী হিসেবে উপস্থাপন করার আদি প্রচলন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিপরীত চেতনা তুলে ধরার মাধ্যমে মূলত বিশ শতকের সাহিত্য এক নতুন পথের দিশা দেখিয়েছে।

নারীকেন্দ্রিক সাহিত্যের উদ্দেশ্য কল্পকাহিনি রচনার মধ্যে দিয়ে নারী আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জন নয়। সাহিত্য কখনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে যাত্রা করে হয়তো সফল হতে পারে না। সে রকম উদ্দেশ্যে রচিত হলে বরং সাহিত্যের পাঠকের কাছে কিংবা যুগ-যুগান্তরের সাহিত্যের কাছে তার যে দায়বদ্ধতা, তা অনেকাংশে ব্যাহত হয়। সাহিত্য সুনির্দিষ্ট কিছু প্রচারের বা প্রমাণের অস্ত্র নয়। সাহিত্য ব্যক্তি তথা সমাজ জীবনের প্রতিচ্ছবি। জীবনযাপনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ মুহূর্ত সাহিত্যে লিপিবদ্ধ থাকে বলেই যুগান্তরের পাঠক অন্য যুগকে পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষভাবে জানতে পারে। ভিন্ন পারিপার্শ্বিকতা বা পটভূমিতে ও ভিন্ন বাস্তবতায় নারীর জীবন কীভাবে আবর্তিত হয় কিংবা ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ আকারের নিগ্রহ তাকে কতটা অসহায় করে ও পিছিয়ে দেয়, নারীকেন্দ্রিক কল্পকাহিনী সমাজকে তা-ই দেখায়। এ শুধু নারীর ওপরে ঘটা নির্যাতন বা অত্যাচারের কাহিনী বিধৃত করে সমাজের কাছে কোনো দাবিদাওয়া পেশ করা নয়, বরং পাঠক জানতে পারেন সমাজে একজন নারী কেমন আছেন, কী অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। এসব কাহিনী ও উলেস্নখযোগ্য নারী চরিত্রের মাধ্যমে পাঠকের অন্তর্চক্ষু খোলার প্রচেষ্টা থাকে। সুতরাং, আলোচিত হতে পারে সে রকম দু'চারটি নারী চরিত্র।

আমাদের সাজানো সুখী পরিবারগুলোর ফাঁকফোকরে যে সাধারণ নারী কত ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিনপাত করেন, তার বয়ান নারীর কলামেই সবচেয়ে সফলভাবে উঠে আসে। যেমন: লেখক নাসরীন জাহানের উড়ুক্কু উপন্যাসের নীনা চরিত্রটির মাধ্যমে সমাজের বিপুলসংখ্যক নারীর জীবনসংগ্রামের চিত্রটি পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়। প্রথমেই নীনাকে বেছে নেওয়ার কারণ হলো, নারীকেন্দ্রিক কল্পকাহিনীতে নীনার মতো জীবন্ত নারী চরিত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন।

অর্থনৈতিকভাবে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য নীনা: উড়ুক্কু উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। বিয়ের পরে বিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটলে তার জীবনে তীব্র অর্থকষ্ট আরম্ভ হয়। ভাড়াটিয়া কোনো পরিবারের বাড়িতে সাবলেট থাকতে হয় তাকে। জীবনের যুদ্ধে প্রতিদিন বারবার হেরে যেতে যেতে আবারও কেমন করে যেন টিকে থাকার সংগ্রাম নীনা চালিয়ে যেতে থাকে। দারিদ্র্যের মধ্যে গভীর দুঃখবোধ নিয়ে দিন কাটায়। অফিসে চাকরির ক্ষেত্রেও নানান আপস করে যেতে হয়। এই সমস্ত কিছু বস্তুত তার জীবনকে অসহনীয় করে তোলে। কিন্তু তারই মধ্যে এক বন্ধুর মাধ্যমে তার পরিচয় হয় মায়ের পুরোনো প্রেমিক এক মহানুভব মানুষের সঙ্গে। মানুষটির সঙ্গে নতুন করে পরিচয়ের আনকোরা জীবনবোধের চমৎকার অনুভূতি নীনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ওদিকে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া স্বামী এক সময় আবারও মিলিত হতে চায় নীনার সঙ্গে। তার এই ইচ্ছার কারণে পুরনো একত্রিত সময়ের স্মৃতি নীনার কাছে ফিরে আসে। সন্তান জন্মের পরে জন্ডিসে মৃতু্য আর তাই নিয়ে হাসপাতালে চেঁচামেচি, মনোমালিন্য আর অভিমান, রাগ আর ঘৃণার স্মৃতিগুলো নীনাকে ছুঁয়ে যায় বটে, কিন্তু ঘায়েল করতে পারে না। আঘাতে আঘাতে মানুষ যেমন সহ্য ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছতে পারে, নীনার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটে না।

এরই মধ্যে পরিচয় হয় ওমর নামের এক তরুণের সঙ্গে। সমাজসিদ্ধ সম্পর্ক না হলেও ছেলেটির সঙ্গ নীনাকে বহুদিন বাদে জীবনকে উপভোগ করার সুযোগ দেয়। প্রথম সন্তানের অকালমৃতু্যর দুঃসহ যন্ত্রণা বুকে নিয়ে নীনা আবারও নিজের শরীরে এক ভ্রূণের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে। অদ্ভুত এক মায়ায় ভ্রূণটিকে হত্যা করতে মন সায় দেয় না তার। অথচ সমাজের সাজানো নিয়মনীতি তার এই আনন্দের উৎসের সন্ধান পেলে তাকে কি থাকতে দেবে তার মতো? সমাজের নিয়মে তাকে ভ্রূণটি থেকে মুক্ত হতে হবে। অবশ্যম্ভাবী এই পরিণতির মধ্যে পড়ে নীনা সমাজের তাবৎ নারীর নারীত্বের সংকটের প্রান্তে উপস্থিত হয়। তাদের প্রতিনিধি হয়ে এই চেনা সমাজে নারীর অস্তিত্বের সংকট তুলে ধরে সে, যেখানে নারীর নিজের শরীরের মালিকানাও নিজের থাকে না; সন্তান প্রাপ্তি বা প্রত্যাখ্যানের স্বাধীনতাও থাকে না। নীনা তখন কেবল নীনা থাকে না- সে তখন এই লোক দেখানো সমাজের দুর্গম পথের যে কোনো একজন সংগ্রামী নারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

সমাজ নারীকে যতই আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখুক, সেই বাঁধন ছিঁড়ে বেরোনোর চেষ্টা নারী করবেই। সফল হওয়া বা না হওয়া নির্ভর করে পারিপার্শ্বিকতা এবং নারীর শক্তি-সামর্থ্যের ওপরে। কিন্তু সাধারণ একজন নারী সাধারণ একটি অবস্থান থেকেই যতটুকু প্রতিবাদ করতে পারে, তা-ই করে। উড়ুক্কুর নীনা তেমনই এক চরিত্র- যা শত নিষ্পেষণেও থেমে থাকে না; নিজের মনের আনন্দ খুঁজে নেয়। নীনা কোনো দিনও থেমে যেতে জানে না।

অন্যদিকে, নারী নির্যাতনের চূড়ান্ত রূপটি মেলে 'দ্য কালার পার্পল' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র স্যালির ক্ষেত্রে। আমেরিকান কথাসাহিত্যিক অ্যালিস ওয়াকারের পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাসটিতে লেখক নারী চরিত্রকে অভাবনীয় মায়ায় জড়িয়ে উপস্থাপন করেছেন। জঘন্যতম নির্যাতনকে বিশ্বাসযোগ্যতায় নিয়ে যেতে চরিত্রকে চরম নির্লিপ্তভাবে উপস্থাপন করেছেন তিনি।

স্যালি এক তরুণী, যে কিনা সৎ বাবার মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। এই নির্যাতন কেবল এক-দুই দিন নয়, বছরের পর বছর ধরে চলে। স্যালির মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে, সে দেখতে কুৎসিত। স্যালির মা অসুস্থ ও শয্যাশায়ী। সংসার দেখাশোনা ও ছোট বোনের দেখভাল তাকেই করতে হয়। আর এরই মাঝে চূড়ান্ত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের এক পর্যায়ে সে মানসিকভাবে নিজেকে অন্যের চোখে অদৃশ্য মনে করে। নিজেও হয়তো জীবনের যে কোনো সম্ভাবনা দেখা বন্ধ করে দেয়। যেহেতু তার প্রতিবাদের কণ্ঠ নেই, তাই সে নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন শারীরিকভাবে সে থেকেও নেই। সে যেন চিরকালের জন্য বোবা হয়ে গেছে। হতাশার চরম এক অবস্থানে থেকে থেকে সে নিজের কথা আর মানসিক পীড়নের কথা বলার এক অদ্ভুত উপায় আবিষ্কার করে, তা হলো, নিজের ওপরে ঘটা অস্বাভাবিক নির্যাতনের কথা উলেস্নখ করে সে বিধাতাকে চিঠি লেখে। আর তখন একের পর এক চিঠির মাধ্যমে উপন্যাসের কাহিনী এগিয়ে চলে। লোম খাঁড়া হওয়া নির্যাতনের নিরুত্তাপ ও নির্লিপ্ত বর্ণনা পাঠককে চূড়ান্ত ডিসটোপিয়ার সন্ধান দেয়। 'প্রিয় বিধাতা' বলে স্যালির সরল বর্ণনা যে কোনো পাঠকের হৃদয় নিংড়ে অসহায় নারী চরিত্রটির জন্য বেদনার উদ্রেক করবে।

চিঠি লেখাকেই স্যালি তার দুরবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হিসেবে দেখে। তাই চিঠিই হয় তার আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের বাহন; যদিও বিধাতা স্যালির কাছে অত্যন্ত দূরবর্তী একটি অস্থিত্ব এবং স্যালির সুখ-দুঃখের ব্যাপারে তার কিছু যায়-আসে বলে সে মনেও করে না। বরং সৎ বাবার মাধ্যমে ক্রমাগত ধর্ষিত হতে হতে স্যালি পরপর দু'বার সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়ে। দুটো সন্তানকেই তার বাবা দূরে কোথাও দত্তক দিয়ে আসে। স্যালি শেষে একজনকে বিয়ে করে ফেলে। বিয়ের পর থেকে স্বামী কেবল স্যালিকে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটায় এবং সুযোগ পেলেই মারধর করে। স্যালি তার নিজের বোনকে সৎ বাবা ও স্বামীর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে, যারা দু'জনেই কিনা বোনটিকে ধর্ষণ করতে চায়। এই সমস্ত কদাকার ঘটনাচক্র থেকে বেরিয়ে সুবাতাসের মতো এক ঘটনা ঘটে স্যালির জীবনে। ভাগ্যক্রমে তার পরিচয় হয় শাগ অ্যাভেরি নামে এক নারী সংগীতশিল্পীর সঙ্গে। তিনিই প্রথম স্যালিকে শেখান কী করে মানুষকে ভালোবাসতে হয় আর ব্যক্তি-চেতনার স্বাধীনতা কী। স্যালিকে তিনি বলেন যে, সে তখনো একজন কুমারী, কারণ কখনোই সে নিজের ইচ্ছায় কারও সঙ্গে মিলিত হয়নি। শাগের সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে স্যালির জীবন অদ্ভুতভাবে বদলে যায়। নিজের জন্য প্রতিবাদের ভাষা জোটাতে স্যালির আর কসরত করতে হয় না। নতুন জীবনবোধের নেশায় স্যালি তখন জানে সমাজে কী করে নিজের মতো করে চলা যায়, যৌনতাকে উপভোগ করা যায় আবার ধর্মকেও আত্মায় ধারণ করা যায়। যে বধির বিধাতার কাছে দিনের পর দিন স্যালি নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেছিল, পরে তাকেই আবিষ্কার করে অভিনব এক চেহারায়, পিতৃতান্ত্রিক চিন্তার বাইরের এক বিধাতা, ভালোবাসার প্রতীক এক বিধাতাকে সে জানতে পারে।

এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে নারীকেন্দ্রিক চরিত্রসমৃদ্ধ সাহিত্যে স্যালি এক উলেস্নখযোগ্য বয়ান, যেখানে নারীর ওপরে ঘটা অত্যাচারের চরম পর্যায়ে অবস্থান করেও ধীরে ধীরে সুযোগ বুঝে উত্থানের মাধ্যমে অনন্য মাত্রায় পৌঁছে। আমাদের সমাজের সঙ্গে সম্পর্কহীন এক সমাজের কাহিনী হলেও স্যালি যে নারী চরিত্রকে তুলে ধরে, সেরকম অত্যাচারিত, অন্যের ইচ্ছায় জীবনযাপন করা ও বোবা-কালা হয়ে পৃথিবীর তাবৎ দুঃখকষ্ট সয়ে যাওয়ার উদাহরণ কোনো সমাজের নারীর মধ্যে নেই!

কেবল নির্যাতন সহ্য করা নয়, নারী যে তার চিরাচরিত সমাজ-আদিষ্ট ভূমিকাকে বদলে দিয়ে কীভাবে উঠে দাঁড়ানোর মন্ত্র পেতে পারে তার দিশা বিশ শতকের শুরুতেই দেখিয়েছিলেন নারী-চেতনার অগ্রপথিক বেগম রোকেয়া। যে সময়ে এ অঞ্চলের নারীকে শুদ্ধভাবে বাংলা শিক্ষা পেতে বেগ পেতে হতো, তখন তার 'সুলতানার স্বপ্ন' উপন্যাসিকা রচিত হয়েছিল বিশুদ্ধ ইংরেজিতে। একে স্বাভাবিক কল্পকাহিনী না বলে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী বলা যায়, যেখানে নারীর জন্য সুনির্দিষ্ট 'জেন্ডার্ড রোল' তিনি আমূল বদলে দিয়েছেন ভবিষ্যতের স্বপ্ন হিসেবে। আর সেই স্বপ্নের দ্রষ্টা চরিত্র সুলতানা। সুলতানার স্বপ্ন প্রমাণ করে মহৎ সাহিত্য কতটা দূরদর্শী।

সুলতানা এক রাতে শোয়ার ঘরে বসে ছিল। অচেনা এক নারী তাকে বাইরে যেতে বললে সে তাকে অনুসরণ করে। তারপর বিপুল বিস্ময়ে দেখে সে একটি নারীস্থানে উপস্থিত হয়েছে, যেখানে নারীরা মুক্ত-স্বাধীন, বরং পুরুষেরাই আবদ্ধ। নতুন দেশটিতে নারীদের ঘরে করার সমস্ত কাজই করে পুরুষরা। অর্থাৎ 'জেন্ডার্ড রোল' পাল্টে যায়। নারী-পুরুষের সমাজে প্রচলিত ভূমিকা বদলে যায় বলে সেখানে কিছু নতুন বিষয় লক্ষ্য করা যায়। সমাজ থেকে অপরাধ উঠে গেছে আর সবখানে শুধু ভালোবাসা আর স্নেহের জয়জয়কার।

আনন্দময় ভ্রমণের মাঝখানে ছেদ পড়ে। হঠাৎ করে সুলতানা দেখে সে নিজের শোয়ার ঘরেই শুয়ে আছে। ঘুম ভাঙতেই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল। স্বপ্ন যতই আনন্দের হোক, বাস্তবে সেই জগৎ থেকে বেরিয়ে সে অন্তঃপুরের বাসিন্দা ছাড়া আর কিছু নয়, সূর্যালোক যার জন্য নিষিদ্ধ।

সুলতানার স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গের মধ্যে দিয়ে পাঠক সমাজ নারী ও পুরুষের অবস্থানগত বাস্তব চিত্রটি পেয়ে যায়। স্বপ্নের উপমা দিয়ে বিধৃত লৈঙ্গিক অসমতার এ রকম রচনার অভিনবত্ব ও সাহিত্যমূল্য সম্পর্কে বলা বাহুল্য। তবে নারী জাগরণের অগ্রদূত যে সময়ে এই কাজটি করে দেখিয়েছেন, তা নিতান্তই এক বিপস্নব বলে গণ্য হতে পারে। সুলতানা চরিত্রকে ঘিরে এই কাহিনীর অবতারণা ইতিহাসে ধ্রম্নপদি নারীবাদী কল্পকাহিনীর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

আরেকভাবে ভাবলে, সমাজ বা সাহিত্য এও দেখায় যে, নারী এমন এক সৃষ্টি- যার মধ্যে ডুবে আছে অপার সম্ভাবনা, পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য- যা কেবল শারীরিক নয় বটে। প্রেম আরাধ্য, তবে হতে পারে তা কেবল মানবিক বা শারীরিক প্রেম নয়। আবার প্রেমের প্রতীক হতে পারে একজন নারী। যেমন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রক্তকরবী' নাটকের নন্দিনী। যক্ষপুরীতে নন্দিনীর প্রেমের পরশ রাজা পায়নি তার লোভের জন্য, সন্যাসী পায়নি তার কুসংস্কারের জন্য আর মজুরেরা পায়নি নিজেদের শিকলে নিজেরাই বন্দি বলে। অথচ তারপরেও, সেই দুরূহ যক্ষপুরীতে শিকল ছিঁড়ে মুক্ত হওয়ার বারতা আনে নন্দিনী। তার আহ্বানে চঞ্চল হয় প্রত্যেকের হৃদয়। মুক্তির স্বাদ স্বপ্নের মতো তাদের ছুঁয়ে যায়। কিন্তু লোভ-লালসা আর ভালোবাসা যে বিপরীতমুখী! তাই নন্দিনীর ভালোবাসা তোলা থাকে কেবল একজনের জন্য- সে রঞ্জন। বন্দিত্বের ঘোরে মানুষ ভুলে যায় মাটি খুঁড়ে সোনা তোলার লোভে তারা মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছে। তাই রঞ্জনের মধ্যে নন্দিনী প্রেমের সম্ভাবনা খুঁজে পেলেও, সে থাকে তার নিজস্ব খাঁচায় বন্দি। তাদের সমাজের তুমুল নির্যাতন আর পীড়নের মধ্যে নন্দিনী এক সুবাতাসের মতো আরাম নিয়ে আসে। কঠোর অনিয়মের মধ্যেই আলোর ঝলকানির মতো নন্দিনীর জন্ম। নন্দিনী জীবনের সহজ সৌন্দর্য। জীবন থেকে যে সহজতা উবে যায়, নন্দিনীর মতো প্রেমের প্রতীক তা-ই যেন পুনরায় ফিরিয়ে আনে। নন্দিনী তাই মুক্তির প্রতীক, ঠিক যেমনটা বিশ্বের সমস্ত নারী মুক্তির স্বপ্ন দেখে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে