প্রযুক্তির বিস্ময় ক্যামেরা

প্রযুক্তির বিস্ময় ক্যামেরা

যে সময়টাকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পুরাতত্ত্ববিদরা মুসলিমদের স্বর্ণযুগ ছিল বলে দাবি করেন সে সময়ে অর্থাৎ ১১ শতকে ইরাকের ইবনে-আল-হেথাম নামক একজন মুসলমান বৈজ্ঞানিক ও অপটিক্সের বিশেষজ্ঞ (অপটিক্স বিষয়ে বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন) প্রথম ক্যামেরা উদ্ভাবন করেন, যা 'পিনহোল' বা 'ক্যামেরা আক্কুরা' নামে পরিচিত।

একটি কাঠের পেটিকা বা ঢাকনা বিশিষ্ট আধার বিশেষের মতো দেখতে এ ক্যামেরাটির ভেতরে অন্ধকারে ঢাকা একটি কুঠুরি ছিল। প্রতিকৃতি তোলার সময় অন্ধকারে ঢাকা এ কুঠুরিতে আলো গমন করলে সেখানে একটি চিত্রের উল্টো প্রতিফলিত বিম্ব বা ছায়ার সৃষ্টি হতো। এতে ছবি সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সম্ভবত ১০২১ সালে ইরাকের এ অপটিকস বিশেষজ্ঞ আলোক বিজ্ঞানের ওপর সাত খন্ডের একটি বই লিখেছিলেন আরবি ভাষায়, যার নাম ছিল কিতাব আল মানাজির। সে বইতেই লেখা ছিল ক্যামেরার জন্ম কথা।

এরপর পনেরো শতকে এক দল চিত্রকর তাদের আঁকা ছবির একের বেশি কপি করার লক্ষ্যে ক্যামেরা তৈরির প্রয়াস চালায়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৫৫০ সালে জিরোলামো কারদানো নামের জার্মানির একজন বিজ্ঞানী ক্যামেরাতে প্রথম লেন্স যুক্ত করেন। তখন ক্যামেরায় এ লেন্স ব্যবহার করে শুধু ছবি আঁকা হতো। তখনও উদ্ভাবিত ওই ক্যামেরা দিয়ে কোনো প্রকার ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। কারণ ওই ক্যামেরাকে সফল রূপ দিতে সময় লেগেছিল আরও অনেক বছর। পরে ১৬৮৫ সালে জোহান জহান ইরাকের ইবনে-আল-হেথামের মতো একই ধরনের ক্যামেরা তৈরি করেন। তবে এ ক্যামেরা আকারে বিশাল ছিল এবং এটিতেও ছবি সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

১৮১৪ সালে জোসেফ নাইসপোর নিপস একটি ক্যামেরা তৈরি করেন যাতে ছবি সংরক্ষণের ব্যবস্থাসহ ছবির আকৃতির ট্রেস করার ব্যবস্থা ছিল। শিল্পীগোষ্ঠী ছবির আকৃতির ট্রেস করার জন্য এই 'অ্যাবসকুরা' ক্যামেরা ব্যবহার করত। পরে জোসেফ নাইসপোর নিপস একটি বিশেষ ধরনের কাগজ তৈরি করেন এবং এ কাগজ রুপালি ক্লোরাইডের সঙ্গে লেপন করে দেন। এর উপর আলো পড়লে অন্ধকারের সঙ্গে মিলে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতো। তিনি ক্যামেরা অ্যাবসকুরার ভেতরে উপর্যুক্ত বিশেষ ধরনের কাগজ স্থাপন করেন। এই হালকা নাজুক কাগজের ওপর সৃষ্ট ইমেজ ছিল বিশ্বের প্রথম ফটোগ্রাফি যা ১৮২৬ সালে আলো ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল। ক্যামেরার ইতিহাসে একটি মাইলফলক ছিল ১৮২৬ সাল। জোসেফ নাইসপোর মূলত পাতলা কাঠের বাক্সের মধ্যে বিটুমিন পেস্নটে আলোর ব্যবহার করে ক্যামেরার কাজটি করেন। সে হিসেবে তাকেই প্রথম ক্যামেরা উদ্ভাবক বলা যায়। তার ক্যামেরা সংক্রান্ত ধারণার ওপর নির্ভর করেই ফ্রাঞ্চমেন চার্লেস এবং ভিনসেন্ট ক্যাভেলিয়ার প্রথম সার্থক ক্যামেরা আবিষ্কার করতে সক্ষম হন।

এরপর ১৮২৯ সালে লুউস ডকুরের প্রথম ব্যবহারিক ফটোগ্রাফি আবিষ্কার করেন। কিন্তু তিনি তার আবিষ্কৃত পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য করতে প্রায় ১০ বছর সময় নেন। তার নাম অনুসারে ডেকেরুরেটাইপ হিসেবে এর নামকরণ করা হয়েছিল। তিনি এই ফটোগ্রাফির বিভিন্ন প্রক্রিয়া তার একটি পুস্তিকায় উলেস্নখ করেছিলেন। সে সময় অনেকেই লুউস ডকুরের তথ্যপ্রযুক্তি উন্নত করার জন্য কাজ করেন।

১৮৪০ সালে উইলিয়াম টালবোট স্থায়ীচিত্র ধারণের জন্য নেগেটিভ ইমেজ থেকে ছবিকে পজিটিভ ইমেজে রূপান্তর করেন। এরপরই বিশ্বজুড়ে ক্যামেরার প্রযুক্তিগত উন্নয়ন খুব দ্রম্নত প্রসারিত হতে থাকে।

১৮৫১ সালে ফ্রেডেরিক স্কিফ আর্চার ভেজা (বি.) পেস্নট নেগেটিভ সম্পর্কে অবহিত হন এবং ১৮৭৯ সালে তিনি শুষ্ক (ফৎু) পেস্নট নেগেটিভ আবিষ্কার করেন। ১৮৮৯ সালে জর্জ ইস্টম্যান ভাঁজ করা যায় এমন ধরনের ফিল্ম রোল আবিষ্কার করেন। এ সময়ের ভেতরে অর্থাৎ ১৮৮৫ সালে জর্জ ইস্টম্যান তার প্রথম ক্যামেরা 'কোডাক'-এর জন্য পেপার ফিল্ম নির্মাণ করেন। বাণিজ্যিকভাবে এটাই ছিল বিক্রির জন্য তৈরি প্রথম ক্যামেরা। এর ঠিক এক বছর পরে পেপার ফিল্মের বদলে সেলুলয়েড ফিল্মের ব্যবহার চালু হয়। এরপরে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৪০ সালে বাণিজ্যিকভাবে রঙিন ফটোগ্রাফি যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ পঁচাত্তর বছর অ্যানালগ ক্যামেরার রাজত্ব চলার পর ১৯৭৫ সালে স্টিভেন স্যাসোন প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরার উদ্ভাবন করেন। যা তথ্যপ্রযুক্তির এক বিস্ময়কর সাফল্য।

বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে এই ক্যামেরা শব্দটির অর্থ করা হয়েছে চলমান বা স্থিরচিত্র ধারণের সরঞ্জাম বিশেষ। যার দ্বারা ফটো/আলোকচিত্র তোলা হয়ে থাকে। মানুষজাতি সময়ে সময়ে নিজেদের প্রয়োজনে ক্যামেরার চেহারা ও কার্যক্ষমতা বদল করেছে।

\হবর্তমান বিশ্বে ক্যামেরা এতটাই লোকপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, এখন এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার একটি ক্যামেরা নেই। তা ছাড়া ছবি তোলার জন্য এখন আর কাউকে কষ্ট করে ফটো স্টুডিওতে যেতে হয় না। মোবাইল ফোন প্রায় দখলই করে নিয়েছে ক্যামেরার জায়গা। সবচেয়ে আনন্দের বার্তা এটাই যে, ক্যামেরার বদৌলতে আজ আমরা অতীত, বর্তমান সম্পর্কে পরিষ্কার দেখতে ও জানতে পারছি। যদি ক্যামেরা সৃষ্টি না হতো, টেলিভিশন কিংবা কম্পিউটার যাই বলি না কেন কোনো কিছুই আমাদের তেমন একটা কাজে আসত না। কারণ একটাই, দূরের বা কাছের জিনিসকে চোখের সামনে তুলে ধরতে ক্যামেরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। মোটকথা, এটি এমন এক আবিষ্কার যা মানবজীবনে জরুরি ও তাৎপর্যবহ ভূমিকা পালন করে আসছে ক্যামেরা সৃষ্টির শুরু থেকেই। আর এভাবেই আস্তে আস্তে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে ক্যামেরা মানুষের হাতের মুঠোয় চলে আসে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে