কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশ

পরিচালকের বক্তব্য 'আমি মধ্যবিত্ত পরিবারে ভাইবোনদের মাঝে বড় হয়েছি। আমার চিন্তাভাবনায় তাদের সবার অনেক প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে আমার বড় তিন আপুর। রেহানাকে নিয়ে লিখতে শুরু করি সম্ভবত ওইরকম একটা জায়গা থেকেই। একটু একটু করে রেহানাকে নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করি। ওর ভেতরের ক্ষোভ আর অবিশ্বাস নিয়ে ভাবি। ওর ভেতরের কমপেস্নক্সিটি এবং কন্ট্রাডিকটরি আচরণ বোঝার চেষ্টা করি। রেহানা কী চায় এবং কেন চায় এটা নিয়ে লিখতে লিখতে ক্রমশ আরও প্রশ্ন বের হয়ে আসতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ওই প্রশ্নগুলোই আমাকে ইন্সপায়ার করে ছবিটা করতে।'
কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশ
আজমেরী হক বাঁধন

বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর কান চলচ্চিত্র উৎসব। যে উৎসবে শুধু অংশগ্রহণ করাটাও অনেক বড় সাফল্যের। সেই আয়োজনে এবার জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। ৭৪তম কান উৎসবের অফিসিয়াল সিলেকশনে 'আঁ সার্তে রিগায়' বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতা আব্দুলস্নাহ মোহাম্মদ সাদ পরিচালিত 'রেহানা মরিয়ম নূর' চলচ্চিত্রটি। এটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রথম এবং বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন। বাংলাদেশের প্রথম কোনো চলচ্চিত্র বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক ও প্রাচীন এই চলচ্চিত্র উৎসবে আলো ছড়ালো। এতে শুধু এ চলচ্চিত্রের পরিচালক ও কলাকুশলীরাই উলস্নসিত-উচ্ছ্বসিত নন, আনন্দ প্রকাশ করেছেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সবাই। কানের ওয়েবসাইটে 'রেহানা মরিয়ম নূর'-এর ঘোষণা আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছার ঢল নামে। এই প্রাপ্তি সবার, পুরো জাতিরও- এমন মন্তব্য করে চলচ্চিত্রটির শিল্পী ও কলাকুশলীকে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি অনেকে ব্যক্তিগত পোস্টও করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিশেষ করে এই চলচ্চিত্রের পরিচালকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে না থাকা কিংবা নিভৃতচারী স্বভাবের জন্য তিনি ভীষণ সমাদৃত হয়েছেন। পরিচালক সাদের এটি দ্বিতীয় চলচ্চিত্র। এর আগে তিনি প্রথম ফিচার ফিল্ম 'লাইফ ফ্রম ঢাকা' নির্মাণ করে সিঙ্গাপুর ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় পুরস্কার জয় করেছেন। তবে দ্বিতীয় নির্মাণ তাকে এনে দিয়েছে সব সফলতা। এত বড় অর্জনের পর সরাসরি কিংবা ফোনেও ধরা দিচ্ছেন না পরিচালক সাদ। এ পর্যন্ত দেশের কোনো গণমাধ্যমের সামনে পাওয়া যায়নি তাকে। দৈনিক যায়যায়দিনের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি গণমাধ্যমে লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছেন। যেখানে তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তার টিমের প্রতি। সাদ বলেন, 'আমি মধ্যবিত্ত পরিবারে ভাইবোনদের মাঝে বড় হয়েছি। আমার চিন্তাভাবনায় তাদের সবার অনেক প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে আমার বড় তিন আপুর। রেহানাকে নিয়ে লিখতে শুরু করি সম্ভবত ওইরকম একটা জায়গা থেকেই। একটু একটু করে রেহানাকে নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করি। ওর ভেতরের ক্ষোভ আর অবিশ্বাস নিয়ে ভাবি। ওর ভেতরের কমপেস্নক্সিটি এবং কন্ট্রাডিকটরি আচরণ বোঝার চেষ্টা করি। রেহানা কী চায় এবং কেন চায় এটা নিয়ে লিখতে লিখতে ক্রমশ আরো প্রশ্ন বের হয়ে আসতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ওই প্রশ্নগুলোই আমাকে ইন্সপায়ার করে ছবিটা করতে।'

কানে প্রথমবারের মতো তার ছবি নির্বাচিত হওয়ায় বেশ খুশি সাদ। তিনি বলেন, কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসিয়াল সিলেকশনে বাংলাদেশের প্রথম ছবি হিসেবে 'রেহানা মরিয়ম নূর' আমন্ত্রিত হওয়ায় আমি খুশি এবং সম্মানিত। এ অর্জন পুরোপুরি আমার টিমের। সবাই মিলে অনেক কষ্ট করেছেন। আমি কৃতজ্ঞ এই মেধাবী টিমের কাছে। তাদের ছাড়া আমি কখনোই এতটুকু আসতে পারতাম না।

'রেহানা মরিয়ম নূর' চলচ্চিত্রটির গল্প আবর্তিত হয়েছে একজন প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের শিক্ষক রেহানা মরিয়ম নূরকে কেন্দ্র করে। রেহানা একজন মা, মেয়ে, বোন ও শিক্ষক হিসেবে জটিল জীবনযাপন করেন। এক সন্ধ্যায় কলেজ থেকে বেরোনোর সময় রেহানা একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার সাক্ষী হন। এরপর থেকে সে এক ছাত্রীর পক্ষ হয়ে সহকর্মী এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন এবং ক্রমে একরোখা হয়ে ওঠেন। কিন্তু একই সময়ে তার ছয় বছর বয়সি মেয়ের বিরুদ্ধে স্কুল থেকে রূঢ় আচরণের অভিযোগ আসে। এমন অবস্থায় অনড় রেহানা তথাকথিত নিয়মের বাইরে থেকে সেই ছাত্রী ও তার সন্তানের জন্য ন্যায়বিচারের খোঁজ করতে থাকেন।

চলচ্চিত্রের গল্পে অনবদ্য রেহানা চরিত্রে অভিনয় করেন আজমেরী হক বাঁধন। পরিচালকের সঙ্গে প্রশংসায় ভাসছেন এ অভিনেত্রীও। বাঁধনকে নিয়ে যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, তাদের বেশির ভাগ মানুষেরই কথা, বাঁধন তার পরিশ্রম ও ধৈর্যের মর্যাদা পেয়েছেন। বাঁধন এই প্রাপ্তির অনুভূতি নিয়ে বললেন, 'ইতিহাসের অংশ হওয়ার অনুভূতি কীভাবে প্রকাশ করতে হয়, সত্যি আমার জানা নেই। আমি ভীষণ আনন্দিত, একই সঙ্গে গর্বিত। বাংলাদেশের নাম যে সিনেমার মাধ্যমে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাল, সেই ছবির অংশ আমিও। তবে এই আনন্দ কতখানি বা কী ধরনের, সেটা কিছুতেই কাউকে বুঝিয়ে প্রকাশ করতে পারছি না।'

২০১৯ সালে কাজটির সঙ্গে যুক্ত হন বাঁধন। চরিত্রটি করতে পারবেন কিনা, এ জন্য প্রথমে তাকে দুই মাস অবজারভেশনে রাখা হয়। এরপর দীর্ঘ ৯ মাস রিহার্সাল করার পর শু্যটিংসহ মোট দেড় বছর সময় লাগে। এই সময়ে অন্য কোনো কাজ করা হয়নি বাঁধনের। পুরো মনোযোগ ছিল এই কাজে। এটা তার জীবনের এক ব্যতিক্রমী জার্নি ছিল এই অভিনেত্রীর। বাঁধন বলেন, 'অনেকদিন ডুবে থাকতে হয়েছিল চরিত্রটির মধ্যে। একটা সময় সিনেমার টিমকে বলেও ছিলাম আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, আমাকে বাদ দেন। আমার মনে হচ্ছিল ঠিকমতো করতে পারছি না। এত বড় দায়িত্ব আমার পক্ষে নেওয়া সহজ ছিল না। নয় মাস বের হতে পারিনি এই ঘোর থেকে।'

৩ জুন কান উৎসবের ৭৪তম আসরে নির্বাচিত চলচ্চিত্রের তালিকা ঘোষণা করা হয় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ইউজিসি নর্ম্যান্ডি প্রেক্ষাগৃহে। এ আয়োজনে ছিলেন উৎসবের জেনারেল ডেলিগেট থিয়েরি ফ্রেমো ও সভাপতি পিয়েরে লেসকিউর। সংবাদ সম্মেলনটি সরাসরি দেখানো হয় কানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে। পোটোকল ও মেট্রো ভিডিও'র ব্যানারে চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছেন সিঙ্গাপুরের প্রযোজক জেরেমি চুয়া, নির্বাহী প্রযোজক এহসানুল হক বাবু এবং সহ-প্রযোজনা করেছেন রাজীব মহাজন, আদনান হাবিব, সাঈদুল হক খন্দকার। ছবিটির সিনেমাটোগ্রাফার তুহিন তমিজুল, প্রোডাকশন ডিজাইনার আলী আফজাল উজ্জ্বল ও সাউন্ড ডিজাইনার শৈব তালুকদার। চলচ্চিত্রটি সহ-প্রযোজনা করেছে সেন্সমেকারস প্রডাকশন। এতে আরও অভিনয় করেছেন আফিয়া জাহিন জাইমা, কাজী সামি হাসান, আফিয়া তাবাসসুম বর্ণ, ইয়াছির আল হক, সাবেরী আলমসহ অনেকে। আগামী মাস ৬ জুলাই থেকে ফ্রান্সে শুরু হবে ঐতিহাসিক কান চলচ্চিত্র উৎসবের এবারের আসর। তবে ছবিটি কোন দিন প্রদর্শিত হবে তা এখনো জানা যায়নি। আরও কিছুদিন পর কান কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে জানাবে বলে জানালেন ছবির কো-প্রডিউসার রাজিব মহাজন।

উলেস্নখ্য, এর আগে ২০০২ সালে কান উৎসবে বাংলাদেশের মুখ খানিকটা উজ্জ্বল করেছিলেন তারেক মাসুদ। সে বছর তার 'মাটির ময়না' ছবিটি ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট বিভাগের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে