বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯
walton1

যেমন আছেন ফেরদৌসী রহমান

বাংলাদেশের সংগীত জগতে এক সমৃদ্ধ নাম ফেরদৌসী রহমান। অসংখ্য কালজয়ী গান গেয়ে শ্রোতাদের মনের মাঝে বড় একটা জায়গা করে নিয়েছেন বরেণ্য ও প্রথিতযশা এই শিল্পী। তার সুরেলা কণ্ঠের সঙ্গে খুবই পরিচিত উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীরা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পলস্নীগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, ইসলামিক গান-গজল, আধুনিক ও চলচ্চিত্রসহ সব ঘরানার গানই প্রস্ফুটিত হয়েছে এই গুণী শিল্পীর কণ্ঠে। বিটিভির কালজয়ী অনুষ্ঠান 'এসো গান শিখি'র মাধ্যমে অগণিত মানুষের শৈশব-কৈশোর জুড়ে রয়েছেন সেই খালামনি ফেরদৌসী রহমান। দীর্ঘ প্রায় ৫৮ বছর ধরে এই অনুষ্ঠানটি নিয়মিত করে যাচ্ছেন তিনি। ৮২ বছর বয়সি বাংলা সংগীতাঙ্গনের সবার প্রিয় এই মানুষটি দীর্ঘ দিন ধরেই মিডিয়ার বাইরে। তার অসংখ্য ভক্তকুল জানতে চান তিনি কেমন আছেন? বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে তারার মেলা। প্রতিবেদনটি সাজিয়েছেন মাসুদুর রহমান
নতুনধারা
  ১০ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০
মুঠোফোনে ওপার থেকে ফোন রিসিভ হতেই বোঝা যাচ্ছিল তিনি ব্যস্ত। আশপাশ থেকে ভেসে আসা শব্দ তেমনটাই জানান দিচ্ছিলেন। বলেন, 'এখন আমি বাচ্চাদের গানের ক্লাস নিচ্ছি। ক্লাসের ফাঁকে ফোন রিসিভ করলেও খুব বেশি কথা বলতে পারব না।' তবুও খানিক সময় ব্যয় করেন আলাপনে। শারীরিক অবস্থা নিয়ে জানতে চাইলে বলেন, 'শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছি। বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন সমস্যার কারণে নিয়মিত ডাক্তার দেখাতে হয়। নানা ওষুধ আর নিয়ম মেনে চলছি। সাবধানে থাকতে হয় সব সময়। খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরায় সতর্কতা অবলম্বন না হলেই নয়। চেষ্টা করি সেইভাবেই থাকতে।' এক সময় প্রচুর ব্যস্ত থাকলেও এখন অবসরে ফেরদৌসি রহমান। আগের মতো গান নিয়ে নেই কোনো ছুটোছুটি। আজ অনুষ্ঠান তো কাল রেকর্ডিংয়ে এখন সময় কাটে না। তবে আগের মুহূর্তগুলো তার খুব মনে পড়ে। ভুলে যাননি সহশিল্পীদের সঙ্গে কাটানো ব্যস্ত সময়গুলো। ফেরদৌসি রহমান বলেন, 'বিভিন্ন অনুষ্ঠানের দাওয়াত থাকলেও যেতে পারি না। তবে মন চায়। সবার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করে। গানের কারণেই তো কতজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল। একই পরিবারের সদস্যদের মতো আমরা একে অপরের প্রতি আন্তরিক ছিলাম।' এক সময় প্রচুর ব্যস্ত থাকলেও এখন অবসরে ফেরদৌসি রহমান। বাসাতেই সময় কাটে। অবসর সময় নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'জীবনের শেষের দিনগুলো একটু অন্যরকম। বাসাতে সময় কাটে। তারপরও ভালো আছি। বই পড়ি, গান শুনি, লেখালেখি করি। তবে মনোযোগ দিতে পারি না।' ফেরদৌসী রহমান কয়েক বছর ধরে আত্মজীবনী লিখছেন। এখনো শেষ হয়নি লেখার কাজ। জানালেন, মাঝে অনেক দিন লেখার কাজ ঠিকমতো করতে পারেননি। আবার চেষ্টা করছেন তিনি। বললেন, 'এই বইয়ে আমার জন্ম থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত যা কিছু করেছি- যা যা করিনি, দুঃখ-বেদনা, সবকিছুই পাওয়া যাবে।' অবসরে গান শোনেন ফেরদৌসী রহমান। নতুন শিল্পীদের যারা টেলিভিশনে গাইতে আসেন, সবার গানই কমবেশি শোনা হয় তার। উচ্চাঙ্গসংগীতের প্রতি একটা দুর্বলতা আছে বলে কারও কণ্ঠে উচ্চাঙ্গসংগীত শুনলে মনটা নাকি ওদিকেই চলে যায়। খুব শুনতে ইচ্ছা করে। উচ্চাঙ্গসংগীতের প্রচুর রেকর্ড ও সিডিও তার কাছে আছে। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়। এর ঠিক দু'দিন পরই ফেরদৌসী রহমানের হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় গান শেখানোর অনুষ্ঠান 'এসো গান শিখি'। সেই থেকে আজ অবধি অনুষ্ঠানটি চলছে। মাসে চারবার এটি বিটিভিতে প্রচার হয়। অনুষ্ঠানটি নিয়ে এই প্রবীণ কণ্ঠশিল্পী বলেন, 'দেখতে দেখতে এতটা বছর পেরিয়ে গেছে, টেরই পাইনি। ৫৮ বছর একটি অনুষ্ঠান করা আলস্নাহর অশেষ রহমতে অনেক বড় সৌভাগ্যের বিষয় এবং একটি অনুষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে নেয়া এটা বিটিভি কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতার বড় পরিচয়। এসো গান শিখি সত্যিকার অর্থেই একটি ঐতিহাসিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই ইতিহাসের সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত, এটাও পরম ভালোলাগার। শুরু থেকে আজ অবধি যারা এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের প্রতি আন্তরিক কতৃজ্ঞতা, ভালোবাসা রইলো। আলস্নাহর অশেষ রহমতে এই অনুষ্ঠান আমি এখনো করে যেতে পারছি। সবার কাছে দোয়া চাই আলস্নাহ যেন আমাকে সুস্থ রাখেন, ভালো রাখেন। সুস্থাবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চাই।' 'যে জন প্রেমের ভাব জানে না, যার ছায়া পড়েছে মনের আয়নাতে, প্রাণ সখিরে, ঐ শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে, পদ্মার ঢেউরে, ও কি গাড়িয়াল ভাই'সহ অনেক জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন তিনি। ১৯৪১ সালে ২৮ জুন কুচবিহারে জন্মগ্রহণ করেন ফেরদৌসী রহমান। খুব ছোট বেলায় ফেরদৌসী রহমানের গানে হাতে খড়ি হয় তার পিতা পলস্নীগীতি সম্রাট আব্বাস উদ্দিনের কাছে। পরবর্তী সময়ে ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, ইউসুফ খান কোরেইশী, কাদের জামেরী, গুল মোহাম্মদ খান প্রমুখ সংগীতজ্ঞের কাছে তালিম নিয়েছেন তিনি। খুব অল্প বয়স থেকে ফেরদৌসি রহমানের স্টেজ পারফরম্যান্স শুরু হয়। মাত্র ৮ বছর বয়সে রেডিওতে খেলাঘর নামের অনুষ্ঠানে অংশ নেন গুণী এই সংগীতশিল্পী। ১৯৬০ সালে 'আসিয়া' নামের চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম পেস্নব্যাক করেন। ৬০ ও ৭০-এর দশকের বহু চলচ্চিত্রে তিনি নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তার পেস্নব্যাক করা চলচ্চিত্রের সংখ্যা ২৫০-এর কাছাকাছি। প্রকাশ করেছেন ২০টি মতো অ্যালবাম। তার রেকর্ডকৃত গানের সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও অধিক। বাংলা ছাড়াও গেয়েছেন উর্দু, ফারসি, আরবি, চীনা, রুশ, জার্মান'সহ আরও কিছু ভাষার গান। বিভিন্ন ঘরানার গানে তার রয়েছে সমান দক্ষতা। একইসঙ্গে গেয়েছেন উচ্চাঙ্গসংগীত, পলস্নীগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, ইসলামিক গান-গজল ও আধুনিক গান। ফেরদৌসী রহমান নজরুল ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ছিলেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য একুশে পদকসহ দেশ-বিদেশের আরও অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। সর্বশেষ চলতি বছরের জুলাই মাসে ফেরদৌসী রহমান হাতে তুলে নেন 'ফিরোজা বেগম স্মৃতি স্বর্ণপদক'। ১৯৬৬ সালের ২৬ অক্টোবর মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার রেজাউর রহমানের সঙ্গে ফেরদৌসী রহমানের বিয়ে হয়। তাদের দুই ছেলে। একজন রুবাইয়াত রহমান, যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে থাকেন, ফেসবুকে চাকরি করেন। আর ছোট ছেলে রাজিন রহমান লন্ডনে একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। ফেরদৌসী রহমানের স্বামী রেজাউর রহমান এখন অবসর জীবনযাপন করছেন। প্রতিথযশা এই শিল্পীর জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম নির্মিত হয়েছে। এটি পরিচালনা করেছেন সন্দিপ বিশ্বাস। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রযোজিত ৪৯ মিনিট দৈর্ঘ্যের এ তথ্যচিত্রটির নাম 'গানের পাখি'।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে