দেশের জন্য সামান্য ত্যাগ

কিন্তু কমান্ডো আসার আগেই ভিপি হামিদ যে দুজন রাজাকার তাকে সর্বক্ষণ পাহারা দিত- নানা যুক্তি দিয়ে তাদের মনোভাব পরিবর্তন করে স্বদেশের পক্ষে নিয়ে আসেন। অতঃপর ওদের নিয়েই পলায়ন করার পরিকল্পনা পাকাপোক্ত করে ফেলেন
দেশের জন্য সামান্য ত্যাগ

কাচারিঘাটে নৌকা প্রস্তুত। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী দুজন রক্ষীর পাহারায় মসজিদে নামাজ পড়তে যায় হামিদুল হক। নামাজ পড়া শেষ না করেই একটি পরিচিত রিকশায় চাপে ওরা। রিকশা দ্রম্নত নিয়ে যায় কাচারি ঘাটে। নৌকায় ওঠেন হামিদুল হক এবং তাকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা দুজন। তাদের একজন সুলতান, তার গ্রামের বাড়ি গফরগাঁওয়ের বাসুটিয়া। আর একজন হাফিজ, তার গ্রামের বাড়ি শম্ভুগঞ্জ। এরা দুজন রাজাকারের সদস্য হলেও বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে হামিদুল হক তাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নিয়ে আসেন। দুরুদুরু বুকে কাচারিঘাট দিয়ে ব্রহ্মপুত্র পার হয়েই পলায়নপর তিনটি লোক জোর কদমে গ্রামের পথে হাঁটে। দ্রম্নত হাঁটে আর পিছনে তাকিয়ে শত্রম্নপক্ষের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখে। প্রথমে চরের লক্ষ্ণীপুর গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে ঠাঁই নেয়। হামিদুল হকের মতো গুরুত্বপূর্ণ একজন শিকার হাতছাড়া হলে তা কি কোনোভাবে মেনে নিতে পারে পাক-হানাদার কিংবা ওদের দোসররা। এ ঘটনায় পাকবাহিনী ময়মনসিংহ শহরে নারকীয় তান্ডব চালায়। গুলকিবাড়ির বাসা ঘেরাও করে পাকবাহিনী আনন্দমোহন কলেজের জিএস গোলাম সারওয়ার বুলবুলকে হত্যা করে। নির্মমভাবে হত্যা করে বজলুল করিম বাচ্চু ও টুনুকে। ভিপি হামিদ ২৬ দিন পাকবাহিনীর নরককুন্ডে বন্দি থেকে সেদিন পলায়ন করেছেন।

ফের তাকে ধরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে পাকবাহিনী, আলবদর ও রাজাকারের সদস্যরা। এ সংবাদ পেয়ে ভিপি হামিদ লক্ষ্ণীপুর থেকে চর খরিচা হয়ে ফুলপুরের পথে রওনা হন। পথে বালিয়া মাদ্রাসায় রাজাকারের ক্যাম্প উপেক্ষা করে ধোবাউড়া উপজেলার গোয়াতলায় গিয়ে পৌঁছেন। গোয়াতলায় সাক্ষাৎ হয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এখলাস উদ্দীনের সঙ্গে। সেখান থেকে বেশ সতর্কতার সঙ্গে নিতাই নদী পার হয়ে শিববাড়ি ক্যাম্পে গিয়ে ওঠেন।

ময়মনসিংহের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মো. হামিদুল হক তথা ভিপি হামিদ একটি উলেস্নখযোগ্য নাম। তিনি ১৯৬৬-তে আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হন। ময়মনসিংহ থেকে ৬৯-এর গণঅভু্যত্থানে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সে সময়ে তাদের স্স্নোগানে স্স্নোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল শহর। স্স্নোগান হতো, 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর', 'ছয়দফা মানতে হবে-নইলে এদেশ স্বাধীন হবে'। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, নাজিমউদ্দিন আহমেদ, কবীর উদ্দিন ভূঁইয়া, আবুল হাশেম, ডা. হাফিজ উদ্দীন খান ও সুব্রানিয়াম শামসুদ্দিন প্রমুখ সে সব কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন।

২৫ মার্চ পাক-হানাদারদের বর্বর হত্যাযজ্ঞের পর থেকে দেশে থমথমে পরিবেশ। ময়মনসিংহের নতুন বাজারের এক মনোহারি দোকানদার মতিমিয়া। তার কাছে জরুরি খবর আসে, বাজিতপুরে তার আত্মীয়ের বাড়িতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অবস্থান করছেন। মতিমিয়া গোপনে খবরটা সৈয়দ আশরাফুলের কাছে পৌঁছায়। এ খবর পেয়ে ভিপি হামিদ, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, আবুল হাশেম, কবীর ভূঁইয়া একটি জিপ গাড়ি নিয়ে তড়িঘড়ি রওনা হন। জিপ গাড়িটি আবুল হাশেমের। তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে বাজিতপুরে যান। কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে সেখান থেকে কিশোরগঞ্জ হয়ে শম্ভুগঞ্জ আসেন। গোপনীয়তা এ জন্যই যে, জাতীয় পর্যায়ের এ নেতার খবর সাধারণ মানুষ জানতে পারলে তার নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। শম্ভুগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ নিজের বাসায় না গিয়ে তিনি সেখান থেকেই সোজা একেবারে হালুয়াঘাট থানা পার হয়ে পানিহাটা পাদ্রী মিশনের কাছাকাছি পৌঁছেন। পানিহাটা নালিতাবাড়ি থানাধীন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন একটি স্থান। সেখানে তার অপেক্ষায় ছিলেন রফিকউদ্দিন ভূঁইয়া, টাঙ্গাইলের আ. মান্নান, লতিফ সিদ্দিকী ও সীমান্তবন্ধু কুদরতউলস্না মন্ডল। তারা সৈয়দ নজরুল ইসলামকে নিয়ে ভারতে গাছুয়াপারা বিওপিতে গিয়ে ওঠেন।

পানিহাটা থেকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ভিপি হামিদ, আবুল হাশেম ও কবীর ভূঁইয়া ময়মনসিংহে ফিরে আসেন। তখন ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল সড়কের মধুপুর এলাকায় মুক্তিকামী ছাত্রজনতা, ইপিআর, পুলিশ ও ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। বিএসএফের ক্যাপ্টেন বালজিৎ সিং রফিক উদ্দিনের বাসায় অবস্থান করে প্রতিরোধযুদ্ধে সহায়তা করছেন। ভিপি হামিদরাও তখন প্রতিরোধযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তার সঙ্গে নাজিমউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, মোতাহারুল ইসলাম এবং জিএস বুলবুলও ছিলেন।

১৭ মার্চ পাক-বিমানবাহিনী ময়মনসিংহে বোমবর্ষণ শুরু করে। শহরে যখন বোমাবর্ষণ করতে আসে তখন ভিপি হামিদ এবং সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সঙ্গে সঙ্গে স্টেশনের ছাদে ওঠে এবং বিমান লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। ফলে পাকবাহিনী শহরের কেন্দ্রস্থল এড়িয়ে গিয়ে শম্ভুগঞ্জ ও চরপাড়া এলাকায় বোমাবর্ষণসহ মেশিনগানে বেপরোয়া গুলি চালায়। এ ঘটনায় শম্ভুগঞ্জে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়।

বলা যায়, ২৮ মার্চ থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত ময়মনসিংহ মুক্ত ছিল। ২৩ এপ্রিল পাকবাহিনী দুদিক থেকে রেলপথে এবং একদিক থেকে সড়পথে ময়মনসিংহ দখলে নেয়।

২৩ এপ্রিলের পর ভিপি হামিদ ফুলপুর হয়ে হালুয়াঘাটে যান। সেখানে প্রথমে কুদরতউলস্না মন্ডলের বাড়িতে যান। সেখান থেকে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, নাজিমউদ্দিন আহমেদ, কবীর ভূঁইয়া ও ভিপি হামিদ একসঙ্গে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে যান। তারা ডালু ও ভারেঙ্গাপাড়ায় অবস্থান নেন। সেখানে ওরা প্রথমে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। সেখানে কিছুদিন থাকার পর ভিপি হামিদ কলকাতা চলে যান। সেখানে আব্দুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তখন ময়মনসিংহ অঞ্চলের স্বেচ্ছাসেবকবাহিনীর প্রধান ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক। উপপ্রধান ছিলেন অ্যাডভোকেট সৈয়দ আহমেদ। তোফায়েল আহমেদের সফরসঙ্গী হয়ে ভিপি হামিদ বিমানযোগে কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি যান। এ সময়ে তোফায়েল আহমেদ তাকে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স বা বিএলএফ তথা মুজিববাহিনী গঠনের ব্যাপারে কাজ করার জন্য নির্দেশ দেন। বিএলএফ বা মুজিববাহিনী গঠিত হয় ছাত্রলীগের চার নেতা যথাক্রমে- ১. শেখ ফজলুল হক মণি, ২. সিরাজুল ইসলাম খান, ৩. আব্দুর রাজ্জাক ও ৪. তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে। তার মধ্যে গৌহাটি সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক এবং তার সহঅধিনায়ক ছিলেন সৈয়দ আহমেদ।

মুজিববাহিনী গঠিত হওয়ার পর খেড়াপাড়ায় ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এ সময় ভিপি হামিদের সঙ্গে এ ক্যাম্পে ছিলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ফজলুল হক দুদু, নাজিমউদ্দিন আহমেদ ও আশরাফ আলী খান খসরু। ২৩ মে নালিতাবাড়ি যুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিগ্রেডিয়ার সামসিং বাবাজী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার ছিলেন ডা. আব্দুলস্নাহ আল মাহমুদ। সেই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে মতিউর রহমান এবং এয়ারফোর্সের আসফাক শহীদ হন। সেই যুদ্ধে নাজিমউদ্দীন, সৈয়দ আশরাফুল, ম. হামিদ ও ভিপি হামিদও অংশগ্রহণ করেছিলেন।

জুলাই-আগস্টের দিকে ভিপি হামিদ একটি গ্রম্নপ নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ময়মনসিংহে আসার পথে ঈশ্বরগঞ্জের মরিচার চরে ওদের সঙ্গে পাকবাহিনীর একটি খন্ডযুদ্ধ হয়। ভিপি হামিদের সহযোদ্ধা ছিলেন বাবুল ও অহিদ। যুদ্ধের পর মরিচার চরে বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয় পাকবাহিনীরা। সেখান থেকে সরে তারা ফাতেমানগর স্টেশনের কাছে ব্রহ্মপুত্রের ওপারে ক্যাম্প করেন। কিছুদিন সেই ক্যাম্পে কাটানোর পর সেখান থেকে সুতিয়াখালি স্টেশন হয়ে ত্রিশালের কাঁঠাল গ্রামে পৌঁছেন। সেখান থেকে সুযোগ বুঝে একপর্যায়ে ময়মনসিংহ শহরে ঢোকেন ভিপি হামিদ। শহরে তিনি মোশারফ আকন্দের জামাতা প্রকৌশলী রফি হাসনাতের বাসায় রাতযাপন করেন। পরদিন সকালে সে বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামলে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা তাকে আটক করে। সঙ্গে সঙ্গে ওরা তার চোখ বেঁধে ফেলে। তারপর ওরা তাকে ময়মনসিংহের ডাকবাংলোয় আলবদরের ক্যাম্পে নিয়ে যায়।

দিন কয়েকের মধ্যেই পাকবাহিনীর ঊর্ধ্বতন সামরিক অফিসাররা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসে। তাদের সঙ্গে ছিল অ্যাডভোকেট সুরুজ উদ্দিন। পরিদর্শন দল ভিপি হিসাবে ছাত্রনেতার পরিচয় পেয়ে হামিদুল হকের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি স্থগিত রাখে। বরং তাকে দিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য একদল বিদেশি সাংবাদিকের সামনে হাজির করা হয়। কিন্তু অকুতোভয় ভিপি হামিদ জীবনের মায়া ত্যাগ করে বিদেশি সাংবাদিকের সামনে সোজাসুজি বলেন, ও ধস ঋৎববফড়স ঋরমযঃবৎ. ও নবষরাব রহ রহফবঢ়বহফবহঃ ড়ভ ইধহমষধফবংয. ফলে পাকিস্তানি সেনাদের দূরভিসন্ধি আর পূরণ হয়নি। সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর তাকে আবার ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। ওদিকে আটক হওয়ার খবর শুনে ভিপি হামিদকে মুক্ত করার জন্য আব্দুর রাজ্জাক ততদিনে বলস্না নামের একজন দুর্ধর্ষ কমান্ডো দলও প্রেরণ করেন।

কিন্তু কমান্ডো আসার আগেই ভিপি হামিদ যে দুজন রাজাকার তাকে সর্বক্ষণ পাহারা দিত- নানা যুক্তি দিয়ে তাদের মনোভাব পরিবর্তন করে স্বদেশের পক্ষে নিয়ে আসেন। অতঃপর ওদের নিয়েই পলায়ন করার পরিকল্পনা পাকাপোক্ত করে ফেলেন।

অত্যন্ত সুকৌশলে পাক-হানাদারদের মৃতু্যপুরী থেকে পলায়নের পর ভারতে গিয়ে ভিপি হামিদ প্রথমে অ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাকের দেখা পান। তারপর বাঘমারা হয়ে চলে যান খেড়াপারা মুজিবনগর হেডকোয়ার্টারে। সেখানে অ্যাডভোকেট সৈয়দ আহমেদ তাকে অভ্যর্থনা জানায়। এ সময় খুব অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে তুরা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে তিনি একমাস চিকিৎসাধীন ছিলেন। সুস্থ হওয়ার পর সৈয়দ আশরাফুল, নাজিমউদ্দিন এবং ভিপি হামিদ প্রমুখ মাচাংপানিতে ইয়ুথ ক্যাম্পে অবস্থান করে মুজিববাহিনীকে সুসংগঠিত করার প্রয়াস চালান। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসেন দেশে।

দৈনন্দিন জীবনে শত ব্যস্ততার মধ্যে সামান্য অবসরে যখন সেই স্মৃতিতাড়িত হয়, তখন সেদিনের সেই ভিপি হামিদ এখন প্রবীণ বয়সে মনে মনে বলেন, দেশের জন্য ওইটুকু কাজ বা ওই সামান্য ত্যাগ আজও জীবনকে মহিমান্বিত করে রাখে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে