বাংলার মাঠে-ঘাটে সবুজ প্রান্তরে শুধু একটি নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন-আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে হবে আমাদের চিন্তা চেতনায়, আমাদের মননশীলতায়। তিনি যে স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছেন, আমাদের সেই স্বপ্নবীজ লালন করতে হবে সযত্নে। বঙ্গবন্ধু জাতির অহংকার, জাতির আস্থার প্রতীক। দল-মত নির্বিশেষে বঙ্গবন্ধুকে সর্বোচ্চ আসনে রেখেই এগিয়ে যেতে হবে
বাংলার মাঠে-ঘাটে সবুজ প্রান্তরে শুধু একটি নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

বঙ্গবন্ধু ঘুরে বেড়িয়েছেন সারা দেশ। একবার নয়, অনেকবার। এ কাজে তার কোনো ক্লান্তি বা বিরক্তি ছিল না। কখনো শ্রমিক-কৃষকের দাবি-দাওয়ার কথা বলতে, কখনো দুর্গত মানুষের দুঃখ দেখতে। আবার কখনো বা ছয় দফার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে। আর সাংগঠনিক কাজে তো গেছেনই। কোনো বিশেষ অঞ্চল কিংবা জনগোষ্ঠী, জনপদে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার কথা ভাবতে পারেননি এ মহান হৃদয়ের মানুষটি। এভাবেই গোটা বাংলাদেশের মানুষের খুব কাছের একজন আপনজনে পরিণত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সমাজের সব ধর্ম-বর্ণ শ্রেণির মানুষকে খুব সহজেই আপন করে নেওয়ার বিরাট গুণের অধিকারী ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু বিশ্বমানবতার প্রতীক। তিনি বিশ্বনেতা পৃথিবীর কম দেশই আছে যাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো একজন অসাধারণ নেতার আবির্ভাব ঘটেছিল। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি এ মানুষটি তার জীবনের পুরোটাই উৎসর্গ করেছেন বাঙালির জন্য, তাদের নিজস্ব স্বাধীন ভূখন্ড ও আলাদা মানচিত্রের জন্য। তার অনবদ্য কারিশমাটিক, দূরদর্শী বিচক্ষণ নেতৃত্বে বাঙালি, সাড়ে সাত কোটি মানুষ সংগঠিত হয়ে স্বাধীনতার নেশায় বুঁদ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে। তারা সবাই অকাতরে বুক পেতে দিয়েছিল ১৯৭১-এ পাকিস্তানি হানাদারদের বুলেট, বোমা, মর্টার শেলের সামনে। বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে এদেশের মানুষ ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সৈনিক, সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলেছিল বাংলার মানুষ, যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রম্নর মোকাবিলা করেছিল। দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ শেষে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করেছিল বঙ্গবন্ধুর অনুসারী মুক্তিযোদ্ধার দল। তিনিই ছিলেন সবার আদর্শ, ঐক্যের প্রতীক।

স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরেই বঙ্গবন্ধু নতুন আরেক যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। সেই যুদ্ধ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার অসামান্য এক লড়াই। চারদিকে হাজারও প্রতিকূলতা প্রতিবন্ধকতা। তারপরও বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন প্রিয় বাংলাদেশকে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিতে শুরু করেছিলেন। স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই শুরু করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এমন একটি মুহূর্তেও কাটেনি যখন তিনি বাংলাদেশ ও বাঙালির সার্বিক মুক্তির কথা ভাবেননি। বাংলাদেশ ছিল তার ধ্যান, তার আত্মার অংশীদার। আর তা ছিল দুঃখী মানুষের বাংলাদেশ। সাধারণের বাংলাদেশ। মনের মতো একজন মানুষকে আমাদের পিতামহরা, প্রপিতামহরা দীর্ঘদিন ধরেই খুঁজছিলেন। তারা এমন একজন নেতাকে খুঁজছিলেন যার চোখ দিয়েই পুরো সমাজকে দেখা যায়। যার মুখ দিয়েই সমাজের নিচ থেকে উপর পর্যন্ত সবার চাওয়া-পাওয়ার কথা বলানো যায়। যার সংস্পর্শে এলে সবাই সাহসী হয়ে ওঠেন। বাঙালি হয়ে ওঠেন। মানবিক হয়ে ওঠেন। সাধারণ ঘরে জন্মেছিলেন তিনি। কথাও বলতেন সাধারণের ভাষায়। সাধারণের দুঃখ-কষ্ট তাকে সর্বদাই মর্মাহত করত। আজীবন তাই ছুটে বেড়িয়েছেন স্বদেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত। আরও অনেকেই স্বদেশের মুক্তির জন্য সংগঠন করেছেন। দৌড়ে বেড়িয়েছেন। তবে খন্ড খন্ড সে সব উদ্যোগের সূত্র ধরে একটি মহাজাগরণের সূচনা করতে পেরেছেন। একমাত্র তিনিই। তিনি ছিলেন কারও কারও ঈর্ষার পাত্র, অনেকের ঘোর শত্রম্ন, কারও কাছে আবার স্বপ্নের সম্রাট, সাধারণের হৃদয়জুড়ে ছিল যার অধিবাস। আমরা লক্ষ্য করেছি, বরাবর কী নিবিড়ভাবে শেখ মুজিব এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত তথা সাধারণ মানুষের স্বার্থচিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন। নিরন্তর তাদের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তাদের কল্যাণ-চেতনায় ছিলেন পুরোপুরি নিবেদিত। ঘাতকের বুলেট তার নশ্বর দেহকে বিদ্ধ করলেও বৈরী প্রশাসন ও ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যম তাকে এড়িয়ে চললেও, প্রতিদিনই বঙ্গবন্ধু উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছেন সাধারণ মানুষের হৃদয়ে। এখনো তিনি প্রতিদিনই বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হচ্ছেন। মহৎ থেকে মহত্তর হচ্ছেন। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের আত্মবিরোধ, কুটিল, রাজনীতির অন্তরে তার গোপনে বেড়ে ওঠার এ গতিকে থামাতে পারেনি। তার অপ্রতিরোধ্য উত্থানকে ঠেকাতে পারেনি। দিন দিনই তিনি সংহত হয়েছেন। এখনো হচ্ছেন। সব দীনতা, জীর্ণতা ভেদ করে তিনি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছেন। শত্রম্নরা হাজার চেষ্টা করেও সাধারণ মানুষের মনের মণিকোঠায় তার সংহত হবার, সমগ্র হবার অনিবার্য প্রক্রিয়াকে বন্ধ করতে পারেননি। পারবেও না। কবিতায় গানে, শিল্পীর তুলির আঁচড়ে, শিশুর কলকালিতে এবং সাধারণের শুভ নিশ্বাসে তিনি অবিরাম প্রসারিত হচ্ছেন। তিনি রয়ে যাবেন আমাদের হৃদয়জুড়ে বিপুলভাবে। বিশালভাবে। আগরতলা মামলার সূত্র ধরে গণজাগরণের কথা আমরা সবাই জানি। এ গণজাগরণেই ভেসে যায় আইয়ুব খান, মোনেম খানরা। আর জনগণের মনে স্থায়ী আসন গেড়ে বসেন শেখ মুজিব। দ্রম্নতই হয়ে যান তিনি বঙ্গবন্ধু। '৭০-এর নির্বাচনের প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চেতনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। একদিকে যেমন তিনি বুঝতে পারলেন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে বাঙালি কত অসহায় ও পাকিস্তান সরকার কত নির্বিকার, অন্যদিকে অনুভব করলেন গরিব-দুঃখী মানুষের কী কষ্ট। তাই তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য চাই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনার কিছু কিছু তিনি প্রকাশ করলেন ১৯৭০ সালের শেষ দিকে পাকিস্তান টেলিভিশনে দেয়া তার প্রাক-নির্বাচনী ভাষণে। সেদিনের ভাষণে তিনি এমন সব বিষয়ের অবতারণা করেছিলেন যেসবের সঙ্গে গণমানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সরাসরি যোগ ছিল। মূলত, সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা এমন স্পষ্ট করে বলার কারণেই নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জিতেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের নিপীড়নবাদী রাষ্ট্র তাকে ক্ষমতায় যেতে দেয়নি। নানা ষড়যন্ত্র শুরু হলো। জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডেকেও বন্ধ করা হলো। শুরু অসহযোগ আন্দোলন। বঙ্গবন্ধু একাত্তরের ৭ মার্চে তার ভাষণের মাধ্যমে দিলেন মুক্তির ডাক। স্বাধীনতার ডাক। প্রস্তুতি নিল পুরো জাতি মুক্তিযুদ্ধের জন্য। দেশ স্বাধীন হলো। '৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বিজয়ীর বেশে দেশে ফিরে এলেন। শুরু করলেন 'অন্ধকার থেকে আলোর পথে' যাত্রা। এক ধ্বংস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা দিলেন সোনার বাংলা গড়ার। অঙ্গীকার অনুযায়ী চমৎকার একটি সংবিধান দিলেন মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী আর্থ-সামাজিক মুক্তির অঙ্গীকার লেখা আছে ওই সংবিধানের পাতায় পাতায়। জাতিকে উপহার দিলেন প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, যার মূল লক্ষ্য ছিল সম্পদের সামাজিকীকরণ।

এ বছর আমরা তার জন্মশতবার্ষিকী আমরা পালন করছি সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশে। একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে থাকবে দারিদ্র্য, বঞ্চনা, নারী-নির্যাতন, সহিংসতা, রাজনৈতিক হানাহানি। নব সহস্রাব্দের শুরুতেই আমরা উজ্জ্বল এক বাংলাদেশের অধিবাসী হতে চাই। পুরো জাতিকেই একসঙ্গে নিয়ে এগোতে হবে আমাদের। বিচ্ছিন্নভাবে এগোনোর চেষ্টা না করাই ভালো। বঙ্গবন্ধুর মনোবল, বাংলাদেশের জন্য তার ভালোবাসা, সাধারণ মানুষের জন্য তার কল্যাণচিন্তাই হবে আগামী দিনের এ অগ্রযাত্রার অন্যতম পাথেয়। সে জন্য তার চিন্তার আলোকে আমাদের ধ্যান করতে হবে, বিচার করতে হবে। পরীক্ষা করতে হবে। দারিদ্র্যকে উন্নয়নের পহেলা নম্বর চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে, স্বদেশী চিন্তা ও চেতনায় বলীয়ান হয়ে, সম্মিলিত সামাজিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দল-মত নির্বিশেষে বাঙালি জাতিকে এগিয়ে যেতে হবে সম্ভাবনাময় এক বাংলাদেশ তৈরির লক্ষ্যে। একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনার মধ্যে আমরা তাই বঙ্গবন্ধুকে সীমিত করার পক্ষে নই। অথনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে তার চিন্তাকে সর্বজনের সাথী করতে হবে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে তার এসব কালজয়ী জনকল্যাণমুখী ভাবনার সঙ্গে পরিচিতি করে তুলতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন-আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে হবে আমাদের চিন্তা-চেতনায়, আমাদের মননশীলতায়। তিনি যে স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছেন, আমাদের সেই স্বপ্নবীজ লালন করতে হবে সযত্নে। বঙ্গবন্ধু জাতির অহংকার, জাতির আস্থার প্রতীক। দলমত নির্বিশেষে বঙ্গবন্ধুকে সর্বোচ্চ আসনে রেখেই এগিয়ে যেতে হবে।

দেশের প্রতিটি প্রান্তে মুজিব আদর্শের কিরণ ছড়িয়ে পড়লে অন্ধকার আর বাসা বাঁধতে পারবে না। পিতা হারানোর শোকে বাঙালি হতাশায় ভেঙে পড়েনি, হতোদ্যম হয়ে পড়েনি শোককে শক্তিতে পরিণত করেছে। এখন বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে লালন করে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। বাংলার মাঠে-ঘাটে, সবুজ প্রান্তরে নদীর ঢেউয়ে শিশির কণায় ছড়িয়ে আছেন তিনি। তাকে কেউ মুছে ফেলতে পারবে না এ দেশের মানুষের হৃদয় থেকে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে