জাগ্রত হোক দেশপ্রেম

জাগ্রত হোক দেশপ্রেম

দেশপ্রেম একটি মহৎ গুণ। নিজ জন্মভূমি স্বদেশ নামে পরিচিত প্রত্যেক মানুষের কাছে। দেশের প্রতি ভালোবাসা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। যে মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম নেই, সে মানুষ হলেও কিন্তু প্রকৃত মানুষ নয়। প্রকৃত মানুষ তো সেই, যার স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা, আবেগ ও অনুভূতি রয়েছে। সর্বদায় দেশের কল্যাণার্থেই ভূমিকা রাখার চিন্তাচেতনা রয়েছে। মা যেমন প্রত্যেক সন্তানের কাছে প্রিয়, ঠিক তেমনি প্রত্যেক জনগণ বা মানুষের কাছে তার জন্মভূমি অধিক প্রিয়। কেননা, একজন মা যেমন তার সন্তানকে সঠিক পরিচর্যার মধ্য দিয়ে লালন-পালন করেন। ঠিক তেমনি জন্মভূমিও প্রত্যেক মানুষকে খাদ্য দিয়ে, আলো দিয়ে, বায়ু দিয়ে, ফুল-ফল দিয়ে গড়ে তোলে দেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কান্ডারি হিসেবে। প্রিয় জননীর সঙ্গে সন্তানরা যেমন সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে না। তেমনি প্রিয় মাতৃভূমির সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করা যায় না। তাই, দেশপ্রেম বলতে শুধু দেশের মাটির প্রতি ভালোবাসাকে বুঝায় না। স্বদেশের আলো-বাতাস, ফল-ফুল, মাটি পানি, প্রকৃতি-পরিবেশ, শিক্ষা-সংস্কৃতি, জাতি ও ভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ, নিবিড় ভালোবাসা ও যথার্থ আনুগত্যকে দেশপ্রেম বলা হয়। দেশপ্রেমিক হবে দেশের গৌরব ও মর্যাদার নমুনা বা প্রতীক। তার চরিত্র ও আদর্শ দিয়েই প্রমাণ করতে হবে সে কোন দেশের নাগরিক এবং কোন দেশের প্রতি তার মমত্ববোধ, ভালোবাসা, আবেগ ও অনুভূতি কতটুকু। কিন্তু সত্যিই কি আমাদের মাঝে এমন দেশপ্রেমের নমুনা আছে? প্রশ্ন থেকে যায়। সম্প্রতিকালে, করোনাভাইরাসের রাজত্ব চলছে পুরো বিশ্বে। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো যখন দেশের জনগণের প্রতি সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা দিতে ব্যস্ত। ঠিক তখনি আমাদের দেশের কিছু অসাধু ব্যক্তি দুর্নীতি আর দেশের মর্যাদাক্ষুণ্ন্নে ব্যস্ত। আমাদের দেশে কিছু অসাধু ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য করোনার নকল সার্টিফিকেট প্রদান করে প্রবাসীদের বিদেশ যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। গত ৮ জুলাই ইতালির গণমাধ্যমে করোনার ভুয়া সার্টিফিকেট বিক্রির জন্য দেশটির গণমাধ্যমে এসেছে বাংলাদেশের নাম। এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনার ফলে অনেক দেশ বাংলাদেশিদের প্রবেশাধিকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এতে করে আমাদের দেশের মর্যাদার বিপরীতে সম্মানহানি বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন্ন হয়েছে পুরো বিশ্ববাসীর কাছে। পুরো বিশ্ববাসী আমাদের দেশকে করোনার নকল সার্টিফিকেট প্রদানকারী দেশ হিসেবে চিনবে। শুধু যে এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে তা কিন্তু নয়। বরং করোনাকালীন সময়ে সরকারি সহায়তা (ত্রাণ) বিতরণের ক্ষেত্রে দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছিল। ধর্ষণের মতো ঘৃণিত কাজটি প্রতিনিয়ত ঘটছে আমাদের দেশে। নারীরা কোথাও নিরাপত্তা পাচ্ছে না। তাহলে এই দায় কার? রাষ্ট্রের নাকি জনগণের? এটাই কি দেশপ্রেমের নমুনা? প্রশ্ন থেকে যায়। এমন ঘৃণিত কাজ থেকে বিরত থাকতে হলে মন মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। কেননা, এই দেশের স্বাধীনতায় নারীদের ভূমিকা অপরিসীম। দেশের প্রতিটি স্থানে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। সম্প্রতি, উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাদ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে সব কিছুতে তাদের অভাবনীয় অবস্থা। এই শীতের মৌসুমেও শীতবস্ত্রহীনদের অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে চলছে তাদের জীবনযাত্রা। দেশ প্রেম হচ্ছে মানবপ্রেম। যে স্বদেশের দুঃখে দুখী হয় না, সে দেশের মানুষকে ভালোবাসে না। দেশের প্রকৃতিকে ভালোবাসে না। তাই, আমাদের দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হবে। তাদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকতে হবে। প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে। দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। আর এটাই হচ্ছে প্রকৃত দেশপ্রেমিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দেশকে ভালোবেসে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে স্বাধীন করেছে এ দেশের মুক্তিকামী লাখো মানুষ। স্বদেশপ্রেমিকের দেশসেবার পথে বাধা অনেক, অত্যাচার সীমাহীন। কিন্তু পথের ঝড়ঝঞ্ঝা, প্রতিবন্ধকতা তাদের দৃঢ় বলিষ্ঠ পদক্ষেপের কাছে মিথ্যে প্রমাণিত হয়। ইতিহাসের পানে তাকালে এর দৃষ্টান্ত মিলে। পর দেশি কিংবা স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু কিংবা উদ্যত অস্ত্র দেশপ্রেমিকদের নিবৃত্ত করতে পারে না। প্রত্যেক দেশেই তার এই মাটিতে কিছু শ্রেষ্ঠ সন্তান জন্ম দেয়। যারা তাদের কৃতকর্মের জন্য অমরত্ব লাভ করে। আমাদের দেশে দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রেখেছেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মীর কাসিম, সৈয়দ আহমদ, তিতুমীর, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী লাখো বীর সেনানী। আমাদের দেশের ইতিহাস ও স্বদেশপ্রেমের গর্বে গর্বিত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, '৬৯-এর গণঅভু্যত্থান, ৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণঅভু্যত্থান আমাদের অনন্য স্বদেশপ্রেমের প্রমাণ দেয়। কিন্তু অন্ধ স্বদেশপ্রেম ধারণ করে ভয়ংকর রূপ। অন্ধ স্বদেশপ্রেম জাতিতে জাতিতে সংঘাত ও সংঘর্ষ অনিবার্য করে তোলে। আমরা স্বদেশের জয়গান গাইতে গিয়ে যদি অপরের স্বদেশ প্রেমকে আহত করি, তবে সেই স্বদেশপ্রেম বিভিন্ন দেশ ও জাতির মধ্যে ডেকে আনে ভয়াবহ রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব-সংঘাত। ইতিহাসের পাতায় হিটলারের ইউরোপ দখল কিংবা মুসোলিনের ইতালি উগ্র-জাতীয়তাবাদের নগ্নরূপ। চলমান বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্র কর্তৃক দুর্বল রাষ্ট্রসমূহের প্রতি আগ্রাসী মনোভাব অন্ধ স্বদেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। প্রত্যেক দেশের জনগণের আগ্রাসী মনোভাব পরিহার করতে হবে। এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করবে। তাহলেই সম্ভব বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। আমাদের দেশের রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা বা আলোচনা হয়। রাজনীতির আলোচ্য বিষয় হলো দেশপ্রেম। স্বদেশপ্রেমের পবিত্র বেদীমূলেই রাজনীতির পাঠ। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ রাজনীতিবিদ দেশের সদাজাগ্রত প্রহরী। আর প্রচ্ছন্ন রাজনীতির অবদানেই আজ আমাদের দেশ স্বাধীন। দেশ ও জাতির স্বার্থই দেশপ্রেমের অঙ্গীকার ও সার্থকতা।

তবে রাজনীতির নামে যারা চাঁদাবাজি, হরতাল, অবরোধ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হত্যা লুণ্ঠনসহ নারকীয় তান্ডব চালিয়ে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার মাধ্যমে জাতীয় সম্পদের ক্ষতিসাধন করে তাদের আর যাইহোক, দেশপ্রেমিক বলা চলে না। বরং তারা দেশ ও জাতির শত্রম্ন। এমন কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকতে হবে দেশের প্রতিটি মানুষকে। পরিশেষে বলা যায়, বিজয়ের মাসে সবার প্রাণে দেশের প্রতি ভালোবাসা, অনুভূতি, আবেগ বিস্তৃত হোক। দেশের প্রত্যেক নাগরিকদের উচিত এমন কোনো কাজ না করা, যে কাজে দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। বরং এমন কাজ করতে হবে, যে কাজে দেশের সম্মান বৃদ্ধি পায় পুরো বিশ্ববাসীর কাছে। সব কাজে প্রমাণ করতে হবে সে কোন দেশের নাগরিক। প্রত্যেক জনগণকে দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং মান্য করার মন মানসিকতার অধিকারী হতে হবে। দেশের জনগণকে দুর্নীতিসহ সব ঘৃণিত কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যুবসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ এক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা অপরিসীম। তারাই আগামী সম্ভাবনার বাংলাদেশের কান্ডারি। তাদের হাত ধরেই বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবে আমাদের সোনার বাংলা। তাই বিজয়ের মাসে সবার প্রাণে জেগে উঠুক দেশপ্রেম। কেননা, এই দেশ আমার, আপনার, সবার।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে