বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধু

স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠনে শুরু হলো বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম। দিন-রাত বঙ্গবন্ধুর অক্লান্ত পরিশ্রম আর কূটনৈতিক পারদর্শিতায় বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে থাকে। বুলেট তাকে থামিয়ে দেয়। বাংলাদেশ আবার পেছনের দিকে যাত্রা শুরু করে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট মোশতাক-জিয়াচক্র শুধুই ব্যক্তি মুজিবকেই হত্যা করেনি। তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তির ওপর চরমভাবে আঘাত হানে
বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধু

চলছে বিজয়ের মাস। আমরা জানি, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে, ধর্মের দোহাই দিয়ে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল। এর অগ্রনায়ক ছিলেন জিন্নাহ তথা মুসলিম লীগ। কিন্তু অল্পদিনেই বাঙালিরা বুঝতে পারে, মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই বলা হলেও প্রকৃত অর্থে পাকিস্তান তাদের নয়। প্রথমে ভাষার ওপরে আঘাত দিয়ে শোষণ শুরু করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে প্রথম আন্দোলনে কারাবরণ করেছিলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব। এরপর বাংলার একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি। প্রতিটি বাঙালির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন পরাধীনতার শিকল ভাঙার মহামন্ত্র। পাকিস্তানের জন্মের শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে বশীভূত করা হয়। যদিও পূর্ব পাকিস্তান পাট রপ্তানির মাধ্যমে সমগ্র পাকিস্তানের সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত, পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে তার অধিকাংশই বিনিয়োগ করা হতো। পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৫০-১৯৭০ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সামগ্রিক বাজেটের শতকরা ২৮.৭ ভাগ ব্যয় করা হতো। পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ অনুভব করেছিল যে, তাদের পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সুবিধার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এই বৈষম্য দূর করার জন্য আওয়ামী লীগ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে স্বায়ত্তশাসনের জন্য ছয় দফার একটি পরিকল্পনা রচনা করেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪'র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮'র সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬'র ৬ দফা ও পরে ১১ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভু্যত্থান প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে সফল নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু। এর ভেতর দিয়ে তিনি আবির্ভূত হন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা তথা মহানায়ক হিসেবে। শেখ মুজিবুর রহমানকে সবাই ডাকতেন মুজিব ভাই বলে। এ নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন বন্ধু, নেতাকর্মী সবার কাছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনই স্বাধীন বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। এরপর যদি আমরা ১৯৭১ সালের প্রসঙ্গে আসি, তাহলে দেখব- বাংলার প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবন্ধুর নামেই মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিতে প্রস্তুত হয়েছিল। সেই সময়ের স্স্নোগানগুলোর প্রতি মনোযোগী হলেই এ কথার সত্যতা মিলবে। তোমার নেতা, আমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব। ভুট্টোর মুখে লাথি মার, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। আশার পতাকাকে কেউ নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। আর তাই অযুত জনতা '৬৯-এর গণআন্দোলনের মাধ্যমে ফাঁসির মঞ্চ থেকে ছিনিয়ে এনেছিল তাদের জীবন আর সংগ্রামের প্রতীক শেখ মুজিবকে।

কেউ কেউ বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা চাননি, কেউ বলেন, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ চাননি। কেউ বলেন, তিনি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। কেউ বলেন, তিনি পতাকা ওড়াননি। আবার কেউ বলেন, তিনি পাকিস্তানিদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। এসবের জবাব দেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এর জবাব একটি। ২৬ মার্চ রাতে রেডিও মারফত ইয়াহিয়া সাহেব যে ভাষণ দিয়েছিলেন তাতে শুধু একটি নামই উচ্চারিত হয়েছিল শেখ মুজিব। মুজিব ইজ এ ট্রেইটর টু দ্য নেশন, দিজ টাইম হি উইল নট গো আনপানিসড। দেশবাসী জিজ্ঞাসা করুন, তাদের যে মানুষ কিছুই করল না, বাংলাদেশ চাইল না, পতাকা উড়ালো না, তার ওপর পাকিস্তানিদের কেন এত রাগ? তাহলে আজ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে মুজিববর্ষ পালিত হচ্ছে কেন? ফিলিস্তিনে কেন শেখ মুজিবের নামে সড়ক হচ্ছে? কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে, যেখানে থেকে তিনি বিএ পাস করেছেন। সেই ইসলামিয়া কলেজের বেকার হোস্টেলে বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্য রয়েছে। তিনি ওই কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, ১৯৪৬ সালে। বর্তমানে কলেজটির নাম মওলানা আজাদ কলেজ।

জনসাধারণের ওপর পাকিস্তানি হামলার কথা চিন্তা করে শেখ মুজিব ৭ মার্চের বিশাল জনসভায় সমবেত জনতাকে প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে ও 'স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম' করতে বলেন। ভাষণ সমাপ্তির প্রাক্কালে তার আহ্বান 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' পূর্ব বাংলার জনসাধারণকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করল। সে দিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলার জনগণের উদ্দেশে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তা থেকে আবেগঘন বক্তৃতা আর কখনো দিয়েছেন বলে মনে হয় না। জাতির পিতা রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১৭ মিনিট জাতির উদ্দেশে গুরুপূর্ণ ভাষণ দেন। যা ছিল জাতির জন্য দিকনির্দেশনা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণও ছিল ১৮ মিনিট সময়ের, শব্দ ১১০৫ (এক হাজার একশত পাঁচ)। তিনি মূলত বাঙালিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন।

১৫ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া ঢাকায় আসেন। শেখ মুজিবের সঙ্গে তার বেশ কটি বৈঠক হয়। বিরামহীন ও গভীর আলোচনা শেষে দুই পক্ষ ২০ মার্চ ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে একমত হয়। ২১ মার্চ জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় শেখ মুজিবের সঙ্গে 'আলোচনার' জন্য আসে। এই পর্যায়ে ভুট্টো ক্ষমতা হস্তান্তরের চুক্তি মানতে রাজি না হয়ে সমগ্র প্রক্রিয়াটিকে বাধার সৃষ্টি করে। শেখ মুজিবের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার জন্য অধিক সময় চাইল। ২৩ মার্চ আয়োজিত জাতীয় সংসদের অধিবেশনকে মুলতবি ঘোষণা করা হলো। ২৫ মার্চ শেখ মুজিব ও তার দলের প্রধান সদস্যরা জেনারেল ইয়াহিয়ার সঙ্গে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া বিশদে আলোচনার উদ্দেশ্যে একটি টেলিফোন বার্তার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। তারা বৃথায় অপেক্ষা করেছিলেন। সেই টেলিফোন বার্তা কখনো আসেনি।

২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেন শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হলো পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে। একদিকে দীর্ঘ নয় মাস ধরে বাঙালিদের ওপর চলল পাকিস্তানি আগ্রাসন, বাঙালিদের রক্তাক্ত প্রতিরোধ আর অন্যদিকে পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারে প্রতি মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর মৃতু্যর হাতছানি। ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ আর কয়েক লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আসে কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। যে পাকিস্তানি সৈন্যরা নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল, তাদের খুবই দ্রম্নততম ও লজ্জাজনক পরাজয় ঘটল। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তান আত্মসমর্পণ করল এবং ৯০ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে নেয়া হলো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এটাই হলো সবচেয়ে বড় ধরনের আত্মসমর্পণ।

এরপর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, মৃতু্যঞ্জয়ী মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরে এক মুহূর্ত সময় অপচয় করেননি। পাকিস্তানি হানাদাররা শুধু এ দেশের ৩০ লাখ মানুষকেই হত্যা করেনি, এ দেশের স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, অফিস-আদালত, কল-কারখানা, রাস্তা-ঘাট, রেললাইন সব ধ্বংস করে দেয়। স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠনে শুরু হলো বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম। দিন-রাত বঙ্গবন্ধুর অক্লান্ত পরিশ্রম আর কূটনৈতিক পারদর্শিতায় বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে থাকে। বুলেট তাকে থামিয়ে দেয়। বাংলাদেশ আবার পেছনের দিকে যাত্রা শুরু করে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট মোশতাক-জিয়াচক্র কেবল ব্যক্তি মুজিবকেই হত্যা করেনি। তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তির ওপর চরমভাবে আঘাত হানে। পঁচাত্তরের ক্ষমতাসীন সামরিক-বেসামরিক এলিটচক্র বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগত অবস্থান ও লক্ষ্য থেকে সরিয়ে এনে একটি ধর্ম-সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করে। যা লড়াকু বাঙালির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। তিনি স্বাধীনতার প্রতীক।

আশার কথা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসে দেশকে এগিয়ে নিতে থাকেন। ২০০১ সালে আবার বিরতি পড়ে। উত্থান ঘটে জঙ্গিবাদের। দেশের মানুষ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে, বিপন্ন হয়ে পড়ে দেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার। এরপর শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় আসেন ২০০৯ সালে। তিনি টানা ১১ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় আছেন। তিনি বিশ্বের দীর্ঘমেয়াদে নারী শাসক। তার দূরদর্শী ও সফল নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন ঘটছে। বাংলাদেশকে এখন বলা হয় এশিয়ার বাঘ; উন্নয়নের রোল মডেল। বিভিন্ন দিক দিয়েই বাংলাদেশের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। অথচ এই বাংলাদেশের অগ্রগতির লাগাম টেনে ধরে রেখেছিল পশ্চিম পাকিস্তান। বিভিন্নভাবে তারা পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের মানুষকে শোষণ করেছে। ৪৯ বছর পর সেই পাকিস্তান কেমন আছে? তারা কি আমাদের চেয়ে এগিয়েছে, নাকি পিছিয়ে গেছে? অর্থনীতিসহ প্রায় সব ধরনের সূচক অনুযায়ী পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।

জাতিসংঘের মানবোন্নয়ন সূচক, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, ক্ষুধা প্রতিরোধ, সুশাসন, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ ইত্যাদি খাতে পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে পড়েছে। এমনকি নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে ভারতকেও পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের উন্নয়ন এক বিস্ময়কর ঘটনা। দুর্নীতি নির্মূল করতে পারলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। আর আমরা হব গর্বিত জাতি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে