এই বিজয় উপহার নয় উত্তরাধিকার

এই বিজয় উপহার নয় উত্তরাধিকার

উপরে যে শিরোনামটা দেখছেন এটা একটা দাবি, একটা হাহাকার। স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরে, শহীদ মিনার বা স্মৃতি সৌধের সামনে যন্ত্রমানবের মতো দাঁড়িয়ে থেকে যন্ত্রসংগীতের তালে ঠোঁট মিলিয়ে 'আমার সোনার বাংলা" গাওয়া এক তরুণের বেদনাময় বুকফাটা আত্মচিৎকার। যে তরুণটা স্বাধীন বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছে। আজকে গল্পটা বলতে যাচ্ছি গল্পটা সে তরুণেরই। সে বহু কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতাকে পেয়ে পূর্বপুরুষদের কাছে কৃতজ্ঞ। সেই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই সে স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে শ্রদ্ধাভরে বুকে হাত দিয়ে পতাকার দিকে তাকিয়ে জাতীয় সংগীতের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়েছে। সে কৃতজ্ঞ বলেই প্রভাতফেরিতে খালি পায়ে মিছিলে যায়। শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। কৃতজ্ঞ বলেই ২৫ মার্চ আসলে বস্ন্যাক আউটের নৃশংসতার শিকার হওয়াদের স্মরণে মশাল মিছিলে অংশগ্রহণ করে। স্বাধীনতা দিবসে তার গর্বে বুকটা ভরে যায়। বিজয় দিবস আসলে সে উদযাপনে মেতে ওঠে। রফিক ভবনের সামনে আবৃত্তি পরিষদের আয়োজনে সে কবিতাও আবৃত্তি করে। কিন্তু এতকিছুর পরেও কেন এ হাহাকার কিংবা দাবি? অথবা তার হাহাকারময় দাবির অর্থ কি? অর্থ আছে। আছে অর্থের ব্যাপকতা। যে অর্থ অর্থহীন নয়। যে অর্থে লুকিয়ে আছে দেশাত্মবোধ, স্বাধীনতা অর্জন ও অর্জিত স্বাধীনতাকে ধরে রাখার এক চরম কথা। যা আমরা সবাই জানি, শুনি এবং দেখি। মাঝেমধ্যে উপলব্ধিও করি। কিন্তু হৃদয়ের গহিনে নাড়া দেয় না। সত্যটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু মানতে চাই না। দেখেও না দেখার ভান করি। বুঝেও বুঝতে চাই না। চাটুকারিতা আর স্বার্থের কেউবা আবার 'দায়িত্বটা কি আমার একার?' এ দোহাইয়ের অন্তরালে নিজেকে লুকিয়ে রাখি? প্রশ্ন ছিল, কেন এ দাবি? তরুণটি যখন কাগজে-কলমে তার জন্মভূমির নাগরিকত্বের স্বীকৃতিটি পেয়ে জীবনের প্রথমবারের মতো মতপ্রকাশের অধিকারটুকু বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয় এবং এক অনন্য অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়, যখন সে দেখে স্বাধীনতার বুলি আওড়ানো শ্রদ্ধাভাজনরা সমাজে রক্ষকের মুখোশে ভক্ষক, তার প্রিয় স্বাধীন জন্মভূমিতে সাবরিনা, সাহেদ, সম্রাট, মনির কিংবা পাপিয়া, বদরুল, হাজী সেলিম অথবা সাদা দরবেশদের মতো লোকদের অভাব নেই। বালিশ কেলেঙ্কারি থেকে পুকুরচুরি, ব্যাংক লুট থেকে গরিবের ত্রাণ আত্মসাৎ। স্বাধীন দেশে যখন হত্যা, গুম, রাহাজানি, টেন্ডারবাজি, ধর্ষণের মতো কিছুই যেখানে বাদ থাকে না সেই দেশে স্বাধীনতা একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। তরুণটি ইতিহাসে পড়েছে, যে দেশে স্বাধীনতার পরপরই স্বাধীনতার মহানায়ক নিহত হন, একের পর এক অভু্যত্থান, ক্ষমতার লিপ্সা আর স্বৈরাচার সাথে নোংরা রাজনৈতিক চালবাজি সে দেশে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ইত্যাদি ইত্যাদি স্রেফ আনুষ্ঠানিকতা আর নির্থক। 'এই স্বাধীনতা আমার জন্য উপহার নয়, শুধু পুষ্পস্তবক পেশ করে আমার ধন্যবাদের দায়বদ্ধতা থেকে আমি মুক্তি পাবো। এটা আমার উত্তরাধিকার। পূর্বপুরুষেরা এই বিজয়, এই স্বাধীনতা অর্জন করেছেন ঠিকই কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম তথা আমার জন্য গড়ে তুলে দিয়ে যেতে পারেননি। অর্ধশত বছরেও সেই কাজ অসম্পূর্ণ। উত্তরাধিকারের দাবি থেকেই দেশটাকে গড়ার দায়িত্ব নেয়ার সময় এসে গেছে।'- তরুণের দাবির যৌক্তিকতা এটাই। যারা প্রবীণ রয়েছেন যারা নিজেদেরকে দেশের বুদ্ধিজীবী, অভিভাবক অথবা জাতির কর্ণধার হিসেবে দাবি করেন কিংবা কাগজে-কলমে আছেন তাদের প্রতি ওই তরুণের আহ্বান, যদি দেশকে নূ্যনতমও ভালোবাসেন তাহলে আগামীর কর্ণধার তরুণদের তাদের উত্তরাধিকারটা বুঝিয়ে দেন। দায়িত্বটা বুঝিয়ে দেন। শুধু হারমোনিয়ামের তালে 'আমার সোনার বাংলা' গানের রেওয়াজ নয় এর মাহাত্ম্যটা বুঝিয়ে দেন। 'সোনার বাংলা' উত্তরাধিকার, 'সোনার বাংলা' দায়িত্ব এটার রেওয়াজ করান। তবে তার জন্য আপনার নিজেকে শুদ্ধ হতে হবে। আজকে মাদকবিরোধী আন্দোলনের আহ্বায়ক নির্বাচিত হয়ে কালকে মাদকের দায়ে গ্রেপ্তার হওয়ার মতো অভিভাবক আমার চাই না। কোনো পিতা যদি তার সন্তানকে বলে, সিগারেট খেওনা। এটা ভালো না। কিন্তু যখন উপদেশ দিচ্ছেন তখন আপনার মুখ থেকে সিগারেটের বিশ্রি গন্ধ বের হচ্ছে। আপনার সন্তান আপনার উপদেশ শুনবে ঠিকই কিন্তু নীতিগতভাবে ধারণ করবে না। ঠিক তেমনিভাবে আগামীর নেতৃত্বকে নিজের চরিত্রের ত্রম্নটিপূর্ণতায় নয় সংশোধিতরূপে গড়ে তুলুন। অন্য তরুণদের প্রতি আহ্বান, দেশপ্রেম কোনো নিছক আবেগ নয়- এটা দায়বদ্ধতা। তাই নিজেকে না বিকিয়ে, যে কাজই করেন না কেন, যে স্থানেই থাকেন না কেন দায়বদ্ধতা সম্পূর্ণ করুন। এ স্বাধীনতা, এ বিজয় আমাদের তারুণ্যের জন্য উত্তরাধিকার। এ উত্তরাধিকার থেকে জন্ম নিক, দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ববোধ। পূর্ণতা পাক আমাদের পবিত্র দেশপ্রেম। সার্থক ও অর্থবহ হয়ে উঠুক অগণিত শহীদের আত্মত্যাগ ও শুকনো গাঁদা ফুলের প্রতিটি পাপড়ি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে