বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড এবং স্বাধীন বাংলাদেশে এর প্রভাব

আমি পরিষ্কার বলতে চাই, বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে সেদিন জাতির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল তার খেসারত জাতিকে একটা দীর্ঘ সময় ধরে দিতে হয়েছিল। আশা করি, বর্তমান প্রজন্মের সচেতনতা এ ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।
বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড এবং স্বাধীন বাংলাদেশে এর প্রভাব

৩ ডিসেম্বর যখন ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল তখন যতই দিন গড়াতে লাগল পাকিস্তানি সেনারা বিশেষ করে যারা পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধরত ছিল তারা বুঝে গেল এ যাত্রা তাদের আর পরাজয় এড়ানোর কোনো সুযোগই অবশিষ্ট থাকছে না। তবু তারা মরিয়া হয়ে উঠল পরাজয় এড়াতে। কিন্তু আমেরিকা-চীন-পাকিস্তান অক্ষ ঠিকমতো কাজ করছিল না চীনের দোটানার কারণে। যতই দিন গড়াতে লাগল মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় বাহিনীর সর্বাত্মক আক্রমণে সপ্তাহ না পেরোতেই পাকিস্তানি বাহিনীর নাভিশ্বাস উঠে যায়। দশই ডিসেম্বরের পর তারা মোটামুটি মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকে পরাজয় বরণের। তবে পরাজয়ের ক্ষতিকে কমিয়ে আনার জন্য তারা আঁটতে থাকে ভিন্ন এক পরিকল্পনা। যদি একান্তভাবেই পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে যায় তাহলেও যেন এ ভূখন্ডটি উদারপন্থি চেতনা নিয়ে আগামীতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে তার জন্য কিছু বন্দোবস্ত করার জন্য তারা অস্থির হয়ে যায়। আর এ অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাদের পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের সূর্যসন্তানদের গণহত্যার মধ্যদিয়ে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী মূলত ১১ ডিসেম্বর থেকে শুরু করে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা এ হত্যাকান্ড চালায়। সারাদেশের প্রায় এক হাজারেরও অধিক বুদ্ধিজীবী এ হত্যাকান্ডের শিকার হয়। এদের মধ্যে শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিত্রশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, গায়ক, অভিনেতারা অন্তর্ভুক্ত ছিল। বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা ফরমান আলীর নামই আসে সর্বাগ্রে যদিও তিনি এ ধরনের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছেন। এমনকি তার লেখা বইয়েও তিনি এ ব্যাপারে তার সব দায়-দায়িত্ব অস্বীকার করেছেন। এ দেশীয়দের পক্ষে সর্বাগ্রে নাম আসে আল-বদরের। সারাদেশে অনেক পাকিস্তানিদের দোসর এ কাজে জড়িত থাকলেও বুদ্ধিজীবী হত্যার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে দেশীয় দোসরদের মধ্যে বারবার উচ্চারিত নাম দুটো হলো আশরাফুজ্জামান ও চৌধুরী মাইনুদ্দিন। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য মতে এ দুজনই মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত। যদিও আরও কয়েকজনের নামও এদের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চারিত হয়। এ ইতিহাস এবং এর সঙ্গে জড়িত অনেক খুঁটিনাটি বারবার বিভিন্নভাবে আলোচিত হয়েছে ইতিমধ্যে। আগামী দিনেও হবে। কিন্তু আজকের এ সামান্য প্রবন্ধে আমি আলোকপাত করতে চাই অন্য একটি বিষয়ের ওপর।

বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকান্ড কোনো সাময়িক বা তড়িৎ ফলাফলের আশায় করা হয়নি বরং এর পিছনে ছিল এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে দাঁড়াতে না দেওয়া। দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও তা যেন হয় ধীরগতির আর সেই দুর্বল বাংলাদেশকে আবারও সুযোগ বুঝে কব্জায় নিয়ে নেয়া। এক কথায় স্বাধীন বাংলাদেশকে একটা মেরুদন্ডহীন দেশে আর বাঙালি জাতিকে একটা মেধাহীন জাতিতে পরিণত করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ছিল এটা।

এবার আমরা আলোচনা করব আরও একটা ভিন্ন বিষয়ের ওপর। শত্রম্নর নানামুখী পরিকল্পনা থাকতেই পারে। থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যেন তাদের সেই জ্বালানো আগুনে ঘি ঢেলে দিয়ে তাকে আরও বহুগুণে জ্বলতে সাহায্য করেছিলাম প্রথমত, বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় সাহায্য করে। দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতার পর নিজেদের সৃষ্ট কলহ-বিবাদে ষড়যন্ত্রকারীদের পরিকল্পনা কল্পনাতীত দ্রম্নততম সময়ের মধ্যে সফল হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়ে। আমার সব সময়ই মনে হয় এত তাড়াতাড়ি তাদের পরিকল্পনা ফল দিতে শুরু করবে তা তারাও স্বপ্নেও ভাবেনি।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর পরই শুরু হয়ে গেল ষড়যন্ত্রের জাল বোনা। ঘাপটি মেরে থাকা স্বাধীনতার বিরোধীরা ছদ্মবেশে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিজেদের গুছিয়ে নেয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও বঙ্গবন্ধুর খুব কাছাকাছি চলে এলো। তারপর তারা এমন সব কর্ম করতে লাগল যাতে সরকার ব্যর্থ হতে বাধ্য হয়। তা ছাড়া অন্তর্দ্বন্দ্বও এ ষড়যন্ত্রকে সফল হতে অনেকটা সাহায্য করছিল। এ ঘটনাপ্রবাহের প্রথম ফলাফলটা ছিল বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের মধ্যে সৃষ্ট দূরত্ব। দূরদর্শী তাজউদ্দীনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ভুল বোঝাবুঝি পরবর্তীতে অনেক ক্ষতির কারণ হয়েছিল।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, এ সময়কালটা যা সাফল্যের সোনালি অর্জনে নিজস্ব মহিমায় উদ্ভাসিত হতে পারত- নানামুখী ষড়যন্ত্র তাকে পুরোপুরি ব্যর্থ করে দিল। অরাজকতার পাশাপাশি সৃষ্টি হলো দুর্ভিক্ষের। এর সবকিছুই ছিল মানবসৃষ্ট। সামরিক বাহিনীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়া অসন্তোষ ভালোভাবেই জানত মোশতাক। তিনি পাকিস্তানপন্থি সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে পূর্ব থেকেই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ষড়যন্ত্র কতটা গভীরে পৌঁছেছিল যে ষড়যন্ত্রকারীরা স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মধ্যেই একটি জাতির জনক, স্বাধীনতার স্থপতি, বঙ্গবন্ধুর মতো জনপ্রিয় নেতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত করতে সক্ষম হয়েছিল। শুধু তাই নয়- হত্যাকান্ডের পর তারা ক্ষমতাও দখল করতে সক্ষম হয়। হত্যাকারীদের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসন করতে সক্ষম হয়। তিন মাসের মাথায় খালেদ মোশাররফ বিপস্নব সংঘটিত করলেও একটি সাজানো প্রতিবিপস্নবের মাধ্যমে ভারত প্রীতির ধোয়া তুলে তাকেও ব্যর্থ করে দেয়া হয়। জেলখানায় বন্দি জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে কারাপ্রকোষ্ঠেই হত্যা করা হয়। আর বিদ্রোহী খালেদ মোশাররফকে বরণ করতে হয় করুণ পরিণতি।

এ ঘটনার পর স্বাধীনতাবিরোধীরা আরও শক্তভাবে তাদের আসন গাড়তে সক্ষম হয়। প্রতিবাদ করার মতো কেউ না থাকায় ধীরে ধীরে সর্বস্তরে তারাই ক্ষমতা দখল করে নেয়। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ যেমন ভূলুণ্ঠিত হয় তেমনি নিদারুণ একটা অসহায় পরিস্থিতিতে পতিত হয় দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা। ৭ নভেম্বরের ঘটনায় মোশতাক ক্ষমতাচু্যত হলেও দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন জেনারেল জিয়া। তিনিই মূলত ছিলেন রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার উৎস। অবশ্য ১৫ আগস্টের পরপরই সেনাপ্রধান কেএম শফিউলস্নাহকে সরিয়ে তিনি সামরিক বাহিনীর প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। পরে ৩ নভেম্বরের অভু্যত্থানে খালেদ মোশাররফ কর্তৃক পদচু্যত হলেও ৭ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিহত হলে তিনি আবারও স্বপদে বহাল হন। ১ ডিসেম্বর ১৯৭৮ সালে এইচএম এরশাদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেয়ার আগ পর্যন্ত তিনি স্বপদে বহাল ছিলেন। অবশ্য ইতিমধ্যে ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি এএসএম সায়েমকে সরিয়ে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও গ্রহণ করেন। এ পদে তিনি ৩০ মে ১৯৮১ সালে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত বহাল ছিলেন। তার মৃতু্যর পর উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

কিন্তু তিনিও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। ২৭ মার্চ ১৯৮২ সালে এরশাদের ষড়যন্ত্রেই তাকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। পুতুল রাষ্ট্রপতি হন এএফএম আহসানউদ্দীন চৌধুরী। আর অবশেষে ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সালে এ পুতুল রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে শেষ ক্ষমতাটুকুও কেড়ে নেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এইচএম এরশাদ। ক্ষমতার এ ঘৃণ্য পালাবদল চলেছিল ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বরে গণআন্দোলন এরশাদের পতনের সময়কাল পর্যন্ত। আর এভাবেই দীর্ঘ ১৫টি বছর আমাদের সোনালি সম্ভাবনাকে অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াতে হলো।

এ ছোট্ট ইতিহাসটুকু আলোচনা করার প্রয়োজন হলো এ জন্য, এতকিছু ঘটত না যদি আমাদের সূর্যসন্তানরা বেঁচে থাকত। ষড়যন্ত্রকারীরা এটা খুব পরিষ্কারভাবেই বুঝতে পেরেছিল। তাই জাতিকে যেন বিভ্রান্ত করা যায় তার অগ্রিম ব্যবস্থা করে রেখেছিল বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে। আর জাতির এ অপূরণীয় ক্ষতির কারণেই জাতির দুর্যোগের সময় তাকে পথ দেখানোর মতো কেউই অবশিষ্ট ছিল না।

আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে সেদিন জাতির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল তার খেসারত জাতিকে একটা দীর্ঘ সময় ধরে দিতে হয়েছিল। আশা করি বর্তমান প্রজন্মের সচেতনতা এ ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে