সাংবাদিক কর্মশালায় জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা

উচ্চ রক্তচাপ ঝুঁকিতে দেশের তরুণরা

প্রকাশ | ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৭:৫৮ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৮:০০

যাযাদি রিপোর্ট

পৃথিবীর অন্যদেশ গুলোর তুলনায় বাংলাদেশের তরুণ বা কম বসয়সীরা বেশি উচ্চ রক্তচাপ ঝুঁকিতে রয়েছেন। এছাড়াও দেশের প্রতি ৫ জনের একজন অর্থাৎ ২১ শতাংশ মানুষ এই রোগে ভুগছেন। প্রায় ৫১ শতাংশ নারী ও ৬৭ শতাংশ পুরুষ জানেই না তাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। ফলে কম বয়সে স্ট্রক, ডায়বেটিক ও কিডনীসহ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে অনেকেই।

এদিকে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সরকারের বেশকিছু নীতি ও কর্মপরিকল্পনা থাকলেও এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি নেই। এছাড়াও ওষুধের দাম ও চিকিৎসা সেবাও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় ব্যয়বহুল।

বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানারস কনফরেন্স রুমে ‘হাইপারটেনশন অ্যান্ড হার্ট হেলথ’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী সাংবাদিক কর্মশালায় এসব তথ্য জানান জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর(জিএইচএআই) এর সহায়তায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা এই কর্মশালা আয়োজন করে।

কর্মশালায় আলোচকরা বলেন, উচ্চ রক্তচাপ বর্তমানে নিরব ঘাতক হিসেবে আমাদের দেশে বিরাজ করছে। কারণ দেশের প্রায় ৬০ ভাগ মানুষই জানে না তারা এতে আক্রান্ত। বিশেষ করে দেশের তরুণরা যাদের বয়স ২৫-৪০ তাদের বেশিভাগই অসচেতনতা ও না জানার কারণে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ পর্যন্ত করছে। তবে একটু সচেতনতা ও লাইফ স্টাইলে সামান্য পরিবর্তন আনলে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।

বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে, ২০১৮ এর তথ্য দিয়ে কর্মশালায় জানানো হয় উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের মধ্যে ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে প্রতি ৭ জনে একজনেরও কম। গ্লোবাল বারডেন অফ ডিজিজ স্টাডি, ২০১৯ এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে মৃত্যু এবং পঙ্গুত্বের প্রধান তিনটি কারণের একটি উচ্চ রক্তচাপ। আর দেশে উচ্চ রক্তচাপ বিষয়ে প্রশিক্ষিত কর্মী রয়েছে মাত্র ২৯ শতাংশ স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে।

কর্মশালায় জানানো হয় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সরকারের বেশকিছু নীতি ও কর্মপরিকল্পনা থাকলেও এ বিষয়ে দেশব্যাপী উল্লেখযোগ্য কোন কর্মসূচি নেই। যদিও সরকার বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অনুসরণ করে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ২০২৫ সালের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলকভাবে ২৫ শতাংশ কমানোর (রিলেটিভ রিডাকশন) জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের এই অঞ্চলে ৪০ বছরের পরই উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি থাকে কিন্তু ইদানিং কালে কম বয়সীদের অনিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন খাদ্য অভ্যাসের কারণে তারাও এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ হৃদরোগ জনিতে কারণে মৃত্যুবরণ করছে মূলত  জানেনই তারা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে তাই প্রতি মাসে অন্তত একবার প্রেসার মাপার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ডাক্তরা

এছাড়াও উচ্চ রক্তচাপের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে আলোচকরা বলেন, এই রোগে একবার কেউ আক্রান্ত হলে তাকে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়। তবে সবচেয়ে ভালো যদি খাদ্য অভ্যাস ও জীবন-যাপনে নিয়ন্ত্রণ এনে রোগ প্রতিরোধ করা। দেশে প্রায় ৩ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারি বেসরকারি ও গণমাধ্যম গুলোকে প্রান্তিক পর্যায়ে এই রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে।

খাবারে রান্নার বাইরে লবন না খেলেই এই রোগ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। জাপানে সম্প্রতি একটি গবেষণা বলছে কেবল লবন খাওয়া নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব। এছাড়াও স্বাস্থ্যসম্মত জীবন-যাপন যেমন: অতিরিক্ত লবণ না খাওয়ার পাশাপাশি, ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা, তামাক ও মদ্যপান পরিহার করা, অতিরিক্ত ওজন কমানো এবং নিয়মিত ব্যায়াম ও শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকলে অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। উল্লেখ্য, বিশ্বে প্রতিবছর ১ কোটিরও বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপের কারণে মারা যায়, যা সকল সংক্রামক রোগে মোট মৃত্যুর চেয়েও বেশি। আলোচকরা বলেন, মায়ের গর্ভথেকেই শিশুরা উচ্চ রক্তচারে ঝুঁকি নিয়ে জন্মায়। তাই মায়েদের প্রথম থেকেই এই বিষয়ক সচেতনা প্রয়োজন।  

এদিকে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের বেশিভাগেরই ডায়েবেটি , স্ট্রক ও কিডনী রোগের ঝুঁকি থাকে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। তাই নিয়মিত চিকিৎসেবা নেয়া অত্যান্ত জরুরি। কিন্তু এক্ষেত্রে অসচেতনা ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা পায় না  বেশিভাগ নাগরিক। বিশেষ করে তৃণমূলের নাগরিকরা। তাই সব সরকারি হাসপাতালে বিশেষ ইউনিট স্থাপন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন না করা ও আক্রন্তদের  নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তবে দেশে এই রোগের চিকিৎসা ও ওষুধের দাম অনেকটা ব্যয়বহুল উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, অন্যান্য দেশে রোগীকে তার চিকিৎসার মাত্র ২০ শতাংশ খরচ বহন করতে হয় কিন্তু আমাদের দেশে রোগীকেই প্রায় ৮০ শতাংশ খরচ বহন করতে হয়।  এছাড়াও এই রোগে আক্রান্তদের নিয়মিত অর্থাৎ লাইফ টাইম ওষুধ সেবন করতে হয়। সে ক্ষেত্রে ওষধের দাম সহনীয় ও সরকারি পর্যায়ে ওষুধের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির তাগিদ দেওয়া হয়। দেখা গেছে পাশ্ববর্তি দেশ ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের দাম প্রায় ৫ গুন বেশি।

এছাড়াও নীরবে উচ্চ রক্তচাপ শরীরের বিভিন্ন অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ বিষয়ে গণসচেতনতা বৃদ্ধি ও চিকিৎসাসেবা বৃদ্ধির জন্য দেশের সকল কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে রক্তচাপ পরীক্ষা ও উচ্চ রক্তচাপের ঔষধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজনের উপর জোড় দেনে আলোচকরা।

কর্মশালায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার (এনসিডি) ডা. সৈয়দ মাহফুজুল হক, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের রোগতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এস এম মোস্তফা জামান, ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্টস স্কুল অব পাবলিক হেলথ এর সেন্টার ফর নন কমিউনিকেবল ডিজিজ অ্যান্ড নিউট্রিশন বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মলয় কান্তি মৃধা, জিএইচএআই বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মো. রূহুল কুদ্দুস, এনটিভির হেড অফ নিউজ অ্যান্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স জহিরুল আলম, অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া এলায়েন্স- আত্মার কনভেনর মর্তুজা হায়দার লিটন, কো-কনভেনর নাদিরা কিরন ও মিজান চৌধুরী, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মাহফুজুর রহমান ভূঁইয়া এবং প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের।

যাযাদি/এস