শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১

কোরিয়া, জাপান ও ভিয়েতনামের মানুষ কেনো ধর্ম পরিবর্তন করছে?

যাযাদি ডেস্ক
  ২৪ জুন ২০২৪, ১৪:২৪
আপডেট  : ২৪ জুন ২০২৪, ১৪:৪০
ছবি-সংগৃহিত

দক্ষিণ কোরিয়ার একটি খ্রিস্টান বাড়িতে বেড়ে উঠেছিলো জুন। কিন্তু দেশটির অনেকের মতো তার ধর্মীয় বিশ্বাসও এখন ছোটবেলার চেয়ে অনেক আলাদা। সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব আছে কী না সেটি নিয়ে তার মনে সন্দেহ আছে।

“আমি জানি না সেখানে কী আছে। সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। তবে অতিপ্রাকৃত কিছু আছে,” দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সউল থেকে ফোনে বলছিলেন জুন।

জুনের বাবা-মা এখনও খ্রিস্টান ধর্ম পালন করেন। সেজন্য জুন বলেন যে তার বাবা-মা যদি জানতে পারেন যে তিনি আর ধর্মে বিশ্বাসী নন, তাহলে তারা “ভীষণ কষ্ট” পাবেন।

জুন তার বাবা-মাকে কষ্ট দিতে চান না। তাই তিনি আমাদেরকে এই প্রতিবেদন লেখার সময় তার নামের পরিবর্তে ভিন্ন কোনও নাম ব্যবহার করতে বলেছেন।

জুনের এই অনুভব যে কতটা বাস্তব, তার প্রমাণ মেলে যুক্তরাষ্ট্রের জনমত জরিপ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিচার্স সেন্টারের সাম্প্রতিক জরিপেও।

জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ধর্ম ত্যাগ ও পরিবর্তন করা মানুষের হার সবচেয়ে বেশি।

১০ হাজারেরও বেশি লোককে তাদের বিশ্বাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল এবং তাদের অনেকেই বলেছিল যে তারা যে ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে বড় হলেও এখন তারা আলাদা ধর্মীয় পরিচয় ধারণ করে।

তবে হংকং ও দক্ষিণ কোরিয়া এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে। জরিপে প্রতিটি দেশের ৫৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন যে তারা তাদের ধর্মকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়াসসহ তাদের ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তন করেছেন।

তাইওয়ানে ৪২ শতাংশ লোক তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তন করেছিলো এবং জাপানে এই হার ছিল ৩২ শতাংশ।

এবারের জরিপ ফলাফলকে ২০১৭ সালে ইউরোপের ওপর করা জরিপের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় যে ঐসময় এমন কোনও দেশ খুঁজে পাওয়া যায়নি, যেখানে ধর্ম পরিবর্তনের হার ৪০ শতাংশ অতিক্রম করেছে।

অথবা, গত বছর সংগ্রহকৃত তথ্য থেকে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ২৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক যে বিশ্বাসের মাঝে বেড়ে উঠেছে, বড় হওয়ার পর তাদের সেই ধর্মের কোনও যোগসূত্র নেই।

জুনের ক্ষেত্রে, তিনি বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পরই তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে এবং নতুন ধারণার সাথে পরিচিত হন। তার যখন বেড়ে ওঠার সময়, তখন তার পরিবার “প্রতিদিন সকাল ছয়টার দিকে ঘুম থেকে উঠতো এবং পরিবারের সকলে বাইবেল পড়তো।”

“প্রতিদিন সকালবেলা সেটি একটি উপাসনালয়ের মতো হয়ে উঠতো,” বলেন জুন।

জুন বাড়ি ছাড়ে ১৯ বছর বয়সে এবং সউল- এর অন্যতম বৃহত্তম গির্জাতে যাওয়া শুরু করেছিলেন। ওই গির্জা এত বড় ছিল যে সেটির সদস্য ছিল কয়েক হাজার।

সেখানে বাইবেলের খুব আক্ষরিক ব্যাখ্যা ছিল। যেমন- বিবর্তন তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করা। জুন যে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব শিখেছিলো, এটি তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল না। ফলে, এরপর তার বিশ্বকে দেখার চোখও অন্যভাবেও পরিবর্তিত হয়েছে।

“আমি মনে করি, খ্রিস্টধর্মে কালো ও সাদা, সঠিক বা ভুল সম্পর্কে খুব স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। কিন্তু সমাজকে পর্যবেক্ষণ করার পর এবং বিভিন্ন পরিবেশ থেকে আসা মানুষের সাথে মেশার পর আমি অনুভব করতে শুরু করি যে পৃথিবীতে শুধু সাদা-কালো না, এর মাঝামাঝি ধূসর জায়গাও আছে।"

জুন বলেন যে তার প্রায় অর্ধেক বন্ধু যে ধর্মে লালিত-পালিত হয়েছে, সেই ধর্মে আর বিশ্বাস করে না। বিশেষ করে যারা খ্রিস্টান হিসাবে বেড়ে উঠেছে।

তবে শুধুমাত্র খিস্টান ধর্মের প্রতিই মানুষ আস্থা হারাচ্ছে না। যারা বৌদ্ধ ধর্মের ছায়াতলে বেড়ে উঠেছেন, তাদের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ এখন আর বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাস করেন না। হংকং ও জাপানে এই হার ১৭ শতাংশ।

তবে ওই অঞ্চলের মানুষ নতুন ধর্ম বা বিশ্বাসকে গ্রহণ করছে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কোরিযায় ১২ শতাংশ মানুষ খ্রিস্টান ধর্মে রূপান্তরিত হয়েছে এবং বৌদ্ধ ধর্মে নতুন বিশ্বাস স্থাপনকারী পাঁচ শতাংশ। হংকং-এর ক্ষেত্রে নতুন করে খ্রিস্টান এবং বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণকারীদের হার যথাক্রমে নয় ও চার শতাংশ।

ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তন করা বা ধর্মকে অস্বীকার করা মানুষের সংখ্যা বিশ্বের অন্যান্য অংশের তুলনায় পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে তুলনামূলক বেশি।

হংকং-এর ৩৭ শতাংশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার ৩৫ শতাংশ মানুষ তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন এবং নরওয়েতে এই হার ৩০ শতাংশ ও যুক্তরাষ্ট্রে ২০ শতাংশ।

আপাতদৃষ্টিতে ধর্ম অস্বীকার করার প্রবণতা বাড়লেও ঐ অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক মানুষ বলেন যে তারা এখনও আধ্যাত্মিক আচার-অনুষ্ঠান ও অনুশীলনে অংশ নেয়।

যেসব দেশে জরিপ করা হয়েছে, সেসব দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত নয়। কিন্তু তারপরেও তারা বলছেন যে পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের প্রতি সম্মান জানানোর জন্য তারা বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিল। এটা ছিল শুধুই সম্মান দেখানোর জন্য। এর সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক ছিল না।

এই জরিপে এই অঞ্চলের যারা অংশগ্রহণ করেছিলো, তাদের বেশিরভাগ মানুষই বলেন যে তারা সৃষ্টিকর্তা বা অদৃশ্য কিছুতে বিশ্বাস করেন।

ধর্ম শিক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. সে-উং কু’র কাছে এর কোনোটাই অবাক হওয়ার মতো নয়। সউল থেকে বিবিসির সাথে কথা বলার সময় তিনি বলেন যে বিভিন্ন ধর্মে অংশগ্রহণ করার ক্ষমতা এই অঞ্চলের ইতিহাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

“ঐতিহাসিকভাবে বলতে গেলে,পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে কোন একটি ধর্মের লোক যে শুধু সে ধর্মেই বিশ্বাস করে বিষয়টি সেরকম নয়। আপনি যদি তাওবাদি হন, তবে এর অর্থ এই নয় যে আপনি একই সাথে বৌদ্ধ বা কনফুসিয়ান হতে পারবেন না"।

ধর্মের বিষয়টি পাশ্চাত্যে যেভাবে পরিষ্কার চিহ্নিত করা যায়, পূর্ব এশিয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি সেরকম পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করা যায়না।

আজ আমরা ধর্মের যে ধারণাটি বুঝি, ১৯ শতকে পাশ্চাত্যের সাথে যোগাযোগ এবং মিথস্ক্রিয়া বৃদ্ধির পর তা পূর্ব এশিয়ায় বিস্তার লাভ করেছিলো।

এবং, একইসাথে একাধিক পরিচয় এবং ঐতিহ্যকে ধারণ করতে সক্ষম হওয়া বিষয়টি আসলে এই অঞ্চল থেকে কখনও হারিয়ে যায়নি, ডা. কু বলেন।

তিনি নিজেও এই বিষয়টি সম্বন্ধে নিজের বাড়ি থেকেই প্রথম পরিচিত হয়েছিলেন। ডা. কু বলেন যে তার মা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার ধর্মীয় অনুষঙ্গ পরিবর্তন করেছেন।

যাযাদি/ এস

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে