একুশের গানের রচয়িতা আব্দুল গাফফার চৌধুরীর চিরবিদায়

একুশের গানের রচয়িতা আব্দুল গাফফার চৌধুরীর চিরবিদায়

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি - অমর গানের রচয়িতা, কিংবদন্তি সাংবাদিক, গল্পকার ও ঔপনাস্যিক আব্দুল গাফফার চৌধুরী আর নেইতার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।

বৃহস্পতিবার সকালে লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় বলে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাই কমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম জানন।

তিনি জানান, ‘গত কিছুদিন ধরে গাফফার চৌধুরী হাসপাতালে ছিলেন। বৃহস্পতিবার সকাল ৭টার দিকে উনার মৃত্যু হয়েছে বলে উনার মেয়ে আমাকে জানান। আমরা গভীরভাবে শোকাহত।’

বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা বাঁক বদলের সাক্ষী গাফফার চৌধুরী ছিলেন একাত্তরের মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক জয়বাংলার নির্বাহী সম্পাদক। ১৯৭৪ সাল থেকে লন্ডনে বসবাস করলেও মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষে তার কলম সোচ্চার ছিল বরাবর।

প্রবাসে থেকেও ঢাকার পত্রিকাগুলোতে তিনি যেমন রাজনৈতিক ধারাভাষ্য আর সমকালীন বিষয় নিয়ে একের পর এক নিবন্ধ লিখে গেছেন, তেমনি লিখেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, স্মৃতিকথা ও প্রবন্ধ।

তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এক শোক বার্তায় তিনি বলেছেন, কালজয়ী গান ও লেখনীর মাধ্যমে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চির অম্লান হয়ে থাকবেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী।

‘তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ প্রগতিশীল, সৃজনশীল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন অগ্রপথিককে হারাল।’

প্রধানমন্ত্রী তার শোকবার্তায় বলেন, ‘আব্দুল গাফফার চৌধুরী তার মেধা-কর্ম ও লেখনীতে এই দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখেছেন। তিনি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক মননকে ধারণ করে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়কে সমর্থন করে জাতির সামনে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন।’

ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগে আক্রান্ত গাফ্ফার চৌধুরীকে মাস দুই আগে লন্ডনের নর্থ উইক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই এপ্রিলে মারা যান তার মেয়ে বিনীতা চৌধুরী।

গাফফার চৌধুরীর চার মেয়ে এবং এক ছেলের মধ্যে বিনীতা ছিলেন তৃতীয়। বাবার সাথেই তিনি লন্ডনের এজওয়ারের বাসায় থাকতেন, তার দেখাশোনা করতেন। তার বয়স হয়েছিল ৫০ বছর।

হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টার আশিকুন্নবী চৌধুরী জানান, ‘আমরা উনার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। উনার ছেলের সাথেও কথা হয়েছে। শেষ কাজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে পরে জানিয়ে দেব।’

১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর বরিশাল জেলার উলানিয়া গ্রামে আবদুল গাফফার চৌধুরীর জন্ম। হাজী ওয়াহিদ রেজা চৌধুরী ও মোসাম্মত্‍ জহুরা খাতুনের তিন ছেলে পাঁচ মেয়ের মধ্যে গাফফার চৌধুরী ছিলেন তৃতীয়।

উলানিয়া জুনিয়র মাদ্রাসায় ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়ে হাইস্কুলে ভর্তি হন গাফফার চৌধুরী। ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকা কলেজ থেকে পাস করেন ইন্টারমিডিয়েট। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি পান।

বাবার মৃত্যুর পর ১৯৪৬ সালে গ্রাম ছেড়ে বরিশাল শহরে চলে এসেছিলেন গাফফার চৌধুরীরা। তখন থেকেই লেখালেখির শুরু। স্কুলে পড়ার সময় কংগ্রেস নেতা দুর্গা মোহন সেন সম্পাদিত ‘কংগ্রেস হিতৈষী’পত্রিকায় কাজ শুরু করেন। ১৯৪৯ সালে তার প্রথম গল্প ছাপা হয় সওগাত পত্রিকায়।

পরে দৈনিক ইনসাফ, দৈনিক সংবাদ, মাসিক সওগাত, মাসিক নকীব পত্রিকায় তিনি কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেফাকে।

দুবছর পর মানিক মিয়া তার নতুন রাজনৈতিক পত্রিকা ‘চাবুক’ এর দায়িত্ব দেন আবদুল গাফফার চৌধুরীকে। সামরিক শাসন জারি হলে সেটা বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর দৈনিক আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী, দৈনিক জেহাদ, সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় বিভিন্ন পদে কাজ করেন গাফফার চৌধুরী। ১৯৬৪ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে ব্যবসা করার চেষ্টায় অনুপম মুদ্রণ নামে একটি ছাপাখানা খোলেন।

দুবছর পর আবার সাংবাদিকতায় ফিরে ১৯৬৬ সালে বের করেন ৬ দফা আন্দোলনের মুখপত্র ‘দৈনিক আওয়াজ’। পরে আবার দৈনিক আজাদ হয়ে ফেরেন ইত্তেফাকে। ১৯৬৯ সালে মানিক মিয়ার মৃত্যুর পর অবজারভার গ্রুপের দৈনিক পূর্বদেশে যোগ দেন গাফফার চৌধুরী।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তিনি কলকাতায় চলে যান সপরিবারে। মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক জয়বাংলায় লিখতে শুরু করেন। কলকাতার আনন্দবাজার ও যুগান্তরেও কলাম লিখতে থাকেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দৈনিক জনপদ বের হয় গাফফার চৌধুরীর সম্পাদনায়। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যাওয়ার সুযোগ হয় তার।

দেশে ফেরার পর গুরুতর অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য প্রথমে কলকাতায় যান গাফফার চৌধুরী। পরে ১৯৭৪ সালে স্ত্রীকে নিয়ে পাড়ি জমান লন্ডনে। তখনই তাদের প্রবাস জীবনের শুরু।

১৯৭৬ সালে লন্ডনে বসেই ‘বাংলার ডাক’ নামে এক সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন গাফফার চৌধুরী। ১৯৮৭ সালে বের করেন ‘নতুন দিন’। এরপর ১৯৯০ সালে ‘নতুন দেশ’ এবং ১৯৯১ সালে ‘পূর্বদেশ’ বের করেন। এই পুরোটা সময় বাংলাদেশের শীর্ষ দৈনিকগুলোতে নিয়মিত লিখে গেছেন।

ছয় দশকের বেশি সময় ধরে ভীমরুল, তৃতীয় মত, কাছে দূরে, একুশ শতকের বটতলায়, কালের আয়নায়, দৃষ্টিকোণ শিরোনামে নিয়মিত কলাম লিখেছেন তিনি।

যাযাদি/এস

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে