​মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে বিনিয়োগ প্রয়োজন : গোলকিপার্স প্রতিবেদন

​মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে বিনিয়োগ প্রয়োজন : গোলকিপার্স প্রতিবেদন

করোনাভাইরাসের অসম প্রভাব উঠে এসেছে গেটস ফাউন্ডেশন’র বার্ষিক গোলকিপার্স প্রতিবেদনে। নতুন তথ্য বলছে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মানুষের ঐকান্তিক প্রচষ্টোর ফলে প্রবল অঘটন এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এখন বৈশ্বকি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং সার্বিকভাবে অতিমারির ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।

মঙ্গলবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিল এবং মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন (বিএমজিএফ) তাদের পঞ্চম বার্ষিক গোলকিপার্স প্রতিবেদন এই তথ্য প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণের ক্ষেত্রে কোভিড অতিমারি কীভাবে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েয়েছে, তা তথ্যসহকারে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। বিল এবং মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের কো-চেয়ার বিল গেট্স এবং মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেট্স যৌথভাবে এবারের প্রতিবেদনটি তৈরী করেছে। করোনাভাইরাস মহামারী সমাজে যেসব অসম প্রভাব ফেলেছে তা ধরা পডছে এই প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই অতিমারিতে যারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ছে তাদের এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সবচেয়ে বেশি সময় লাগবে। কোভিডের কারণে ২০১৯-এর তুলনায় ২০২১ সালে আরও ৩ কোটি ১০ লখি মানুষ চরম দারিদ্রের মুখোমুখি হয়েছেন। আর্থিক দিক থেকে উন্নত ৯০ শতাংশ দেশের নাগরিকের মাথাপিছু আয় আগামী বছরের মধ্যে অতিমারির আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। কিন্তু আর্থিক ভাবে দুর্বল নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলির মাত্র এক তৃতীয়াংশই আগের অবস্থায় ফিরতে পারবে। তবে আশার কথা হল, বিশ্বের মানুষ এই ধ্বংসলীলা মোকাবিলা করেছে, তাই আরও খারাপ কিছু হওয়া আটকানো গেছে।

গত বছরের গোলকিপার্স প্রতিবিদেনে ‘ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন’ (আইএইচএমই) অনুমান করেছিল, বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন (টিকা) প্রদান ১৪ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। যার ফলে মাত্র ২৫ সপ্তাহে ২৫ বছরের অগ্রগতি হারিয়ে যাবে। তবে আইএইচএমই-র নতুন বিশ্লেষণ অনুযায়ী লেখচিত্র নিম্নমুখী হলেও পরিস্থিতি যতটা খারাপ হবে বলে অনুমান করা হয়েছিল, বাস্তবে ঘটেছে তার অর্ধেক।

এ বছরের প্রতিবেদনে ‘যুগান্তকারী উদ্ভাবন’ এর উপর অধিক আলোকপাত করেছেন প্রতিবেদন প্রণয়নকারী বিল গেট্স এবং মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস। গত কয়েক দশক ধরে বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা, প্রতিশ্রুতিপূরণ এবং বিনিয়োগের ফলেই এ যুগান্তকারী উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে। তবে খুব খারাপ কিছু হওয়া যে আটকানো গিয়েছে, তা প্রশংসনীয় হলেও যথেষ্ট নয় বলে তারা প্রতিবদেনে উল্লেখ্য করেছেন।

প্রতিবেদনে, যেভাবে দ্রুততার সঙ্গে বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ টিকা তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল ঠিক সেভাবেই অতিমারির ধাক্কা সার্বিকভাবে কাটিয়ে উঠতে স্বাস্থ্য এবং আর্থিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আহবান জানিয়েছেন তারা। এর মধ্যদিয়েই জাতিসংঘের টকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পুরণের পথে বিশ্বকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করনে গেটস ফাউন্ডেশনের কো চেয়ারগণ।

প্রতিবেদনে তারা লিখেছেন, ‘গত বছরে আমাদের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে যে, অগ্রগতি অপরিহার্য এবং সম্ভব । বিগত ১৮ মাসে যে বিষয়গুলিতে আমরা ভাল করেছি, সেগুলিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তাহলে আমরা অতিমারির ধাক্কা কাটিয়ে স্বাস্থ্য, খাদ্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো মৌলিক বিষয়গুলির অগ্রগতি তরান্বিত করতে পারব।’

এ প্রতিবেদনে আরও একটি বিষয় গুরুত্বসহকারে তুলে ধারা হয়েছে। অতিমারির প্রভাবে সারা বিশ্বে আর্থিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মহিলারা। উচ্চ আয়ের দেশ হোক বা নিম্ন আয়ের দেশ, অতিমারির ফলে যে আর্থিক মন্দা তৈরি হয়েছে তাতে পুরুষদের তুলনায় মহিলারা অনেক বেশিই ক্ষতিগ্রস্থ হয়ছে।

মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস বলেন, ‘এমনিতেই বিশ্বের নানা স্থানে মহিলারা নানা ধরনের বাঁধার সম্মুখীন হন। অতিমারি সেই বাধা-বিপত্তিগুলিকে আরও জোরালো করেছে।’ তার মতে, ‘বিভিন্ন দেশের সরকারের উচিত ক্ষতিগ্রস্থ মহিলাদের উন্নয়নে জোর দেওয়া, যাতে তাদের সামনের বাঁধা এবং বৈষম্য দূর করা যায়। এতে যে শুধু সার্বিক উন্নয়নের পথ প্রশস্ত হবে তাই নয়, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজ হবে। এটা করা যে শুধু ঠিক তাই নয়, বরং এমনটা করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ এবং এতে সকলে লাভবান হবে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে দ্রুত গতিতে কোভিড-১৯ টিকা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে তা কোনো আশ্চর্য ব্যাপার নয় বরং গত কয়েক দশক ধরে চলমান বিনিয়োগ, ভ্যাকসিন নীতি এবং সহযোগিতার মাধ্যমে যে পরিকাঠামো, পরিবেশ এবং প্রতিভার উন্মেষ ঘটেছে, এ হল তারই ফল। তবে যে পরিকাঠামোয় ভর করে অভূতপূর্ব গতিতে কোভিড-১৯ এর টিকা তৈরি করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া গিয়েছে তা মূলত রয়েছে বিত্তশালী দেশগুলিতে। ফলে সারা বিশ্বের মানুষ সমানভাবে লাভবান হয়নি।

বিল গেটস লিখেছেন, কোভিড-১৯ টিকার অসমন বণ্টন জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বিপর্যয়। ফলে আগামী দিনে বিত্তশালী দেশগুলির কাছে কোভিড-১৯ দরিদ্রের রোগ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘দেশ, আয় নির্বিশেষে সকলের কাছে এ টিকা না পৌঁছানো পর্যন্ত এই অতিমারিকে অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না।’

প্রতিবেদনে উল্লেখ্য করা হয়েছে, বর্তমানে ৮০ শতাংশের বেশি কোভিড টিকা উচ্চ এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত আয়ের দেশগুলির নাগরিকদের কাছে পৌঁছেছে। কোথাও কোথাও প্রয়োজনের চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ টিকা পৌঁছেছে যাতে বুস্টার ডোজও দেওয়া যায়। অথচ নিম্ন আয়ের দেশগুলিতে মাত্র ১ শতাংশ টিকা পৌঁছনো গিয়েছে। কারা কোভিড-১৯ টিকা পাবে আর কারা পাবে না, তার অনেকটাই নির্ভর করেছে কোথায় টিকা নিয়ে গবেষণা এবং উৎপাদন হচ্ছে তার উপর। বিশ্বের জনসংখ্যার ১৭ শতাংশের বাস আফ্রিকা মহাদেশে, কিন্তু বিশ্বের টিকা উৎপাদন কেন্দ্রের মাত্র ১ শতাংশ সেখানে রয়েছে।

সব শেষে এ প্রতিবেদেন বিশ্বের কাছে সেই সব জায়গায় গবেষণা ও উন্নয়ন, পরিকাঠামো এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে যেখানে মানুষের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।

গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক সুজম্যান বলেন, ‘নিম্ন আয়ের দেশগুলিতে প্রয়োজনীয় টিকা এবং ওষুধ তৈরির জন্য সেখানে গবেষক এবং উৎপাদনকারী সংস্থার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। স্থানীয় সংস্থাগুলির সঙ্গে সমন্বয় করলেই তা করা সম্ভব হবে। সারা বিশ্বের উদ্ভাবন এবং প্রতিভাকে একযোগে কাজে লাগানো গেলে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলিও মোকাবিলা করা যাবে।’

যাযাদি/ এস

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে