ঢাকায় ফের বেড়েছে ট্রাফিক আইন ভাঙার প্রবণতা

জেব্রা ক্রসিংয়ের সামনে যানবাহনের গতি কমিয়ে আনার নিয়ম থাকলেও চালকরা তার কেয়ার করছেন না। তারা তীব্র গতিতেই জেব্রা ক্রসিং অতিক্রম করছেন। ট্রাফিক পুলিশও এ ব্যাপারে কোনো ভ্রম্নক্ষেপ করছে না
ঢাকায় ফের বেড়েছে ট্রাফিক আইন ভাঙার প্রবণতা

ঢাকা মহানগরীতে পরিবহণ চালকদের পাশাপাশি হাঁটা পথচারীদের ট্রাফিক আইন ভাঙার প্রবণতা ফের বেড়েছে। ফলে রাজধানীতে অহরহ ঘটছে ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা। ট্রাফিক পুলিশ এজন্য পরিবহণচালক ও পথচারীদের ধর্যহীনতা ও ট্রাফিক আইনের ব্যাপারে অজ্ঞতাকে দায়ি করলেও পরিবহণবিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা।

তারা এজন্য ট্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতাকে বিশেষভাবে দায়ী করে বলেন, ঢাকা মহানগরীতে যানবাহনের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়লেও ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বাড়ছে না। এছাড়া পরিবহণচালক ও পথচারীদের ট্রাফিক আইন মেনে চলার ব্যাপারে বাধ্য করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো বিশেষ কৌশল গ্রহণ করতে পারছে না। যানবাহনের পাশাপাশি পথচারীর সংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে গতানুগতিক কৌশলে সাধারণ মানুষকে ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করা অনেকটাই অসম্ভব বলে মনে করেন পরিবহণ বিশেষজ্ঞরা।

সরেজমিনে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তা পারাপারের জন্য জেব্রা ক্রসিং থাকলেও পথচারীরা সেখান দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন না। তারা তাদের সুবিধামতো যে যেখান দিয়ে পারছেন, সেখান দিয়েই রাস্তা পার হচ্ছেন। আবার জেব্রা ক্রসিংয়ের সামনে যানবাহনের গতি কমিয়ে আনার নিয়ম থাকলেও চালকরা তার কেয়ার করছেন না। তারা তীব্র গতিতেই জেব্রা ক্রসিং অতিক্রম করছেন। ট্রাফিক পুলিশও এ ব্যাপারে কোনো ভ্রম্নক্ষেপ করছে না। বেশকিছু ব্যস্ত সড়ক রাস্তা পার হওয়ার জন্য আন্ডারপাস এবং ওভারব্রিজ থাকলেও পথচারীরা তা এড়িয়ে চলছে।

রাজধানীর শাহবাগ মোড়, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেটসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ট্রাফিক পুলিশ জেব্রা ক্রসিংয়ের আগে গাড়ি থামতে সিগন্যাল দিলেও যানবাহনগুলো তা পার হয়ে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। আবার কোনো কোনো সময় বাস, মিনিবাস, অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারগুলো ক্রসিংয়ের ওপর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকছে। ফলে পথচারীদের এর মধ্য দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে হচ্ছে।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) সামনের ওভারব্রিজ থেকে শুরু হয়ে হাসপাতাল গেট পর্যন্ত বাস স্টপেজ হলেও কোনো বাসই সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে না। অধিকাংশ বাসই শাহবাগ মোড় থেকে যাত্রী তুলছে। ফলে বেশিরভাগ যাত্রী বাসস্টপেজে না দাঁড়িয়ে বাসে চড়ার জন্য শাহবাগ মোড়েই অপেক্ষা করছে। কেউ কেউ চলন্ত গাড়িতে লাফিয়ে চড়তে নিয়ে রাস্তায় ছিটকে পড়ছে।

এ প্রসঙ্গে বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিচার্স ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, 'রাস্তার যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে বাসে ওঠার জন্য বাস দাঁড় করানো যেমন বন্ধ করতে হবে, তেমনি যেখানে সেখানে চালকদের বাস দ৭াড় করানোটাও বন্ধ করতে হবে। সড়কে প্রাণহানি ঠেকাতে পথচারী পারাপারে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া দরকার।

ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার পদমর্যদার একজন কর্মকর্তা বলেন, 'শুধু ট্রাফিক পুলিশের ওপর দায় দিলে চলবে না। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ সড়কের জন্য বিআরটিএ, সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। জনসাধারণকেও সচেতন করতে হবে। ট্রাফিক আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তাহলে পরিবহণ খাতে শৃঙ্খলা আসবে।

দেশে করোনার প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার পর রাজধানীতে যানবাহনের চাপ কম থাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও গত কয়েক মাস ধরে পরিস্থিতি কিছুটা অনিয়ন্ত্রিত বলে স্বীকার করেন ট্রাফিক পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তারা এজন্য অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে করোনাকালে মানুষের অস্থিরতা বৃদ্ধির বিষয়টিকেও সমভাবে দায়ী করেন।

পরিবহণবিশেষজ্ঞরা জানান, করোনাকালীন বিপুলসংখ্যক গণপরিবহণ চালক দীর্ঘদিন ধরে বেকার থাকায় তাদের মধ্যে ব্যাপক অর্থ সংকট দেখা দেয়। এছাড়া অন্যান্য পেশার লাখ লাখ মানুষ করোনার ঊর্ধ্বমুখী গতি থাকাকালীন কর্মহীন হয়ে পড়ায় তাদের মধ্যেও এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। যার নেতিবাচক প্রতিফলন ট্রাফিক ব্যবস্থার উপর পড়েছে। এ কারণে ট্রাফিক আইন মেনে না চলার প্রবণতা বেড়েছে।

এছাড়া ট্রাফিক আইনের ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণেও পরিবহণচালক ও পথচারীরা অনেকে তা মানছেন না বলে পরিবহণবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাই এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়তে ট্রাফিক পুলিশের নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি বলে তারা পরামর্শ দিয়েছেন।

তাদের এ ধারণা যে অমূলক নয়, তা নগরীর বিপুলসংখ্যক যানবাহন চালক ও পথচারীর সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। গত কয়েক মাস আগে ঢাকায় এসে রিকশা চালনা পেশার সঙ্গে যুক্ত হওয়া এক যুবককে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে তিনি কী জানেন তা জানতে চাইলে তার কাছ থেকে কোনো সদুত্তোর পাওয়া যায়নি। একাধিক অটোরিকশা, প্রাইভেটকার, এমনকি গুপরিবহণ চালকও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা দিতে পারেননি।

বিষয়টি স্বীকার করে ট্রাফিক পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পরিবহণচালক ও পথচারীদের অবহিত করতে তারা শিগগিরই বিশেষ কার্যক্রম হাতে নেবে। এছাড়া ট্রাফিক আইন সম্পর্কে লিফলেট বিলির চিন্তাভাবনাও রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ওই ট্রাফিক কর্মকর্তা।

১৯৮৩ সালের 'মোটরযান আইন' অনুযায়ী নিষিদ্ধ হর্ন/হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করলে জরিমানা গুনতে হবে ১০০ টাকা। এটি ১৩৯ ধারার শাস্তি।

আদেশ অমান্য, বাধা সৃষ্টি ও তথ্য প্রদানে অস্বীকৃতি জানালে ১৪০(১) ধারায় জরিমানা হবে ৪০০ টাকা। ওয়ানওয়ে সড়কে বিপরীত দিকে গাড়ি চালালে ১৪০(২) ধারায় গুনতে হবে ২০০ টাকা জরিমানা। অতিরিক্ত গতি বা নির্ধারিত গতির চেয়ে দ্রম্নতগতিতে গাড়ি চালিয়ে গেলে জরিমানা ৩০০ টাকা। এ অপরাধ আবার করলে জরিমানা ৫০০ টাকা। দুর্ঘটনাসংক্রান্ত যেসব অপরাধ থানায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেসব অপরাধে জরিমানা হবে ৫০০ টাকা। একই অপরাধ আবার করলে জরিমানা দিতে হবে ১ হাজার টাকা। নিরাপত্তাবিহীন অবস্থায় গাড়ি চালানো ১৪৯ ধারায় ২৫০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হবে। কালো বা অতিরিক্ত ধোঁয়া বের হওয়া মোটরযান সড়কে ব্যবহার করলে ১৫০ ধারায় জরিমানা ২০০ টাকা। মোটরযান আইনের সঙ্গে সংগতিবিহীন অবস্থায় গাড়ি বিক্রয় বা ব্যবহার, গাড়ির পরিবর্তন করলে মোটরযান আইনে ১৫১ ধারায় জরিমানা দিতে হবে দুই হাজার টাকা। রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট বা ফিটনেস সার্টিফিকেট অথবা রুট পারমিট ব্যতীত মোটরযান ব্যবহার করলে জরিমানা ১ হাজার ৫০০ টাকা। আবার একই অপরাধ করলে জরিমানা ২ হাজার ৫০০ টাকা। প্রকাশ্য সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে ১৫৭ ধারায় জরিমানা ৫০০ টাকা। যেসব অপরাধের জন্য মোটরযান আইনে সুনির্দিষ্ট কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নেই, সে ক্ষেত্রে ১৩৭ ধারায় জরিমানা ২০০ টাকা। অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে জরিমানা ৪০০ টাকা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে