রমজান সামনে রেখে জাল নোট প্রতিরোধে সতর্ক গোয়েন্দারা

আসল ব্যাংক নোট চিনতে ও জাল নোট প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বেশকিছু উদ্যোগ নিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় জাল নোট প্রতিরোধে বিভিন্ন নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালন কার্যকরভাবে নিশ্চিত করার জন্য তফসিলি ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে
রমজান সামনে রেখে জাল নোট প্রতিরোধে সতর্ক গোয়েন্দারা

রমজান মাসকে সামনে রেখে রাজধানীসহ সারা দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, খাদ্যদ্রব্য ও ইফতারসামগ্রী থেকে শুরু করে পোশাক-পরিচ্ছদ-আসবাবপত্র- সব ধরনের কেনাকাটা বেড়ে যায়। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতি বছর রমজানের আগেই সক্রিয় হয়ে ওঠে জাল নোট কারবারিরা। তারা এ সময় জাল নোট তৈরির পাশাপাশি তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে তৎপর হয়ে ওঠে। এ পরিস্থিতিতে এবার আগেভাগেই সতর্ক হয়ে উঠেছে গোয়েন্দারা।

তারা জামিনে থাকা চিহ্নিত নোট জালকারী চক্রের উপর নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি নতুন করে এ দলে কেউ যোগ দিয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে এরই মধ্যে জোরেশোরে মাঠে নেমেছে। এছাড়া এ চক্র কোথায় কীভাবে জাল নোট তৈরির কারখানা গড়ে তুলছে, কার কাছে কোন মাধ্যমে তা পৌঁছে দিচ্ছে সে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে।

এদিকে আসল ব্যাংক নোট চিনতে ও জাল নোট প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বেশকিছু উদ্যোগ নিচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জাল নোট প্রতিরোধে বিভিন্ন নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালন কার্যকরভাবে নিশ্চিত করার জন্য তফসিলি ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

জাল নোট প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে- আসল নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য সংবলিত হ্যান্ডবিল বিতরণ। ১০০, ৫০০ ও ১০০০ হাজার টাকা মূল্যমানের নোট যেহেতু বেশি জাল হয়, এ কারণে হ্যান্ডবিলের পাশাপাশি এসব নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যবিষয়ক পোস্টার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ইউএনও অফিস, ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের অফিসের নোটিশ বোর্ডে টানানোর ব্যবস্থা করা হবে। সচেতনতা বাড়াতে রমজান মাসজুড়ে প্রতি সপ্তাহে আসল ব্যাংক নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য সংবলিত বিজ্ঞাপন অন্তত পাঁচটি পত্রিকায় প্রচার করা হবে। এছাড়া টিভি চ্যানেলে এসংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত ভিডিওচিত্র প্রচারের উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অন্যদিকে ব্যাংক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর মাধ্যমে এবারও দেশের গুরুত্বপূর্ণ শপিং মলগুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জাল নোট শনাক্তকারী মেশিন দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে গত বছরের রমজানে ঢাকাসহ সারা দেশের বড় বড় মার্কেটে সরবরাহ করা জাল নোট শনাক্ত করা মেশিনগুলো কাজে লাগানোর জন্যও বলা হবে। সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বিভিন্ন সময়ে পাঁচ শতাধিক জাল নোট শনাক্তকারী মেশিন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব মেশিনের পাশাপাশি নতুন চাহিদা দিলে তাও সরবরাহ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এদিকে জাল নোটের কারবারিদের ধরতে চলতি মাসের শেষভাগ থেকে জোরদার অভিযান শুরুর ছক এঁটেছে গোয়েন্দারা। এর হোমওয়ার্ক হিসেবে এরই মধ্যে জামিনে থাকা জাল নোটের কারবারিদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে তারা। একই সঙ্গে এ চক্রের বিপুলসংখ্যক সদস্যকে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করা হলেও তারা কীভাবে জামিনে বের হয়ে আসছে- তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গোয়েন্দা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, জাল নোটের কারবারিদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও যথাযথ তদন্ত হয় না। কিছু মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও দুর্বল তদন্তের কারণে আসামিরা জামিন পেয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে আসামি শনাক্ত না হওয়ায় আদালত মামলা খারিজ করে দেয়। তাই এসব মামলার তদন্ত থানা পুলিশ করলেও তার ছায়াতদন্ত করে প্রকৃত চিত্র তুলে আনা যায় কিনা- সে বিষয়টিও এবার ভেবে দেখা হচ্ছে।

বিভিন্ন সময় গোয়েন্দা ও থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারকৃত জাল নোট প্রস্তুতকারীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এ কাজের মূলত তিনটি ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপে পুরান ঢাকা থেকে নির্দিষ্ট মাপের দিস্তা কাগজ কেনা হয়। এরপর তাতে সিকিউরিটি ব্যান তৈরির জন্য ফয়েল পেপার দিয়ে দুটি কাগজ জোড়া লাগিয়ে জলছাপ দেওয়া হয়। আর শেষ ধাপে বান্ডিল করে পাইকারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

এছাড়া ১০০ টাকার নোট সেদ্ধ করে ৫০০ টাকার ছাপ দিয়ে তা বাজারে ছাড়ছে জাল নোটের কারবারিরা। যা এতটাই নিখুঁতভাবে তৈরি হচ্ছে, অভিজ্ঞ ব্যাংকারও তা শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, গত ২১ বছরে সারা দেশে জাল নোটসংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৮ হাজার ৩৬৬টি। এর মধ্যে বিপুল সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি হলেও এখনো ২ হাজারের বেশি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। ১৯৭২ সালের সংশোধিত আইনে জাল নোটের কারবারিদের মৃতু্যদন্ডের বিধান ছিল। ১৯৭৪ সালে তা যাবজ্জীবন ও অর্থদন্ড করা হয়। পরে ১৯৮৭ সালে আইন সংশোধন করে আবারও জড়িতদের মৃতু্যদন্ড বা ১৪ বছরের সশ্রম কারাদন্ড বা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়। কিন্তু এরপরও জাল নোটের কারবারিদের দমানো যাচ্ছে না।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, ফেনী, বগুড়া, নীলফামারী, মেহেরপুরসহ ২৫ জেলায় জাল নোটের মামলা বেশি। এসব মামলায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাক্ষী আদালতে আসেন না। আবার এলেও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করেন। এতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন তারা। একপর্যায়ে আসামি পার পেয়ে আবারও একই পেশায় ফিরে আসে।

এদিকে রাজধানীতে জাল নোটের কারবারিরা বেশির ভাগ অভিজাত এলাকায় ভাড়া ফ্ল্যাটবাড়িতে তাদের আস্তানা গড়ে তোলে বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এ কারণে গোয়েন্দারা বাড়ির মালিকদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার তাগিদ দিয়েছে। এছাড়া প্রতিবেশীদেরও এ ব্যাপারে দায়িত্ব রয়েছে। পাশের বাসার ভাড়াটিয়ার কোনো কাজকর্ম সন্দেহজনক মনে হলে বিষয়টি দ্রম্নত থানা পুলিশকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাল টাকা তৈরি ও বিপণনের কাজে জড়িত চক্রের সদস্যরা ৩ ভাগে বিভক্ত। একটি গ্রম্নপ অর্ডার অনুযায়ী জাল নোট তৈরি করে, অপর গ্রম্নপ টাকার বান্ডিল পৌঁছে দেয়, আরেক গ্রম্নপ এসব টাকা বাজারে ছড়িয়ে দেয়।

বাজারে 'ওয়াশ নোট' সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়। এক লাখ টাকা মূল্যমানের এই জাল নোট বিক্রি হয় ৪০-৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া আর্ট পেপারে তৈরি জাল ১০০টি ১ হাজার টাকার নোট বিক্রি হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। খসখসে কাগজে তৈরি ১ লাখ টাকা মূল্যমানের ১ হাজার টাকার জাল নোট ২৫-৩০ হাজার টাকা বিক্রি করে কারবারিরা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে