পাঠক মত

মোবাইল ফোনের আদ্যোপান্ত ও বাস্তবতা

মোবাইল ফোনের আদ্যোপান্ত ও বাস্তবতা

আদিমকালে মানুষ গুহার ভিতরে বর্বর জীবন-যাপন করত। তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র পথ ছিল পশু শিকার ও বনের ফলমুল সংগ্রহ। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করত আগুনের ধোঁয়া এবং মশাল, এমনকি হেঁটেও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় তথ্য আদান-প্রদান করত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ মরিয়া হয়ে নিজেদের কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করেছে। সৃজনশীলতা আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করেছে যুগোপযোগী সব আবিষ্কার। ব্রিটেনে ১৮৫০ সালে শিল্পবিপস্নবের পর তৈরি হয়েছে বাষ্পীয় ইঞ্জিনসহ আজকের বিস্ময়কর সব আবিষ্কার। এত এত আবিষ্কারের মধ্যে মোবাইল ফোন অন্যতম। মোবাইল ফোনকে অনেকে মুঠো ফোনও বলে থাকে। কেননা এটা সহজেই হাতের ভিতরে নিয়ে ঘোরাঘুরি করাসহ তাৎক্ষণিকভাবে যে কোনো জায়গায় যোগাযোগ করা যায়। পৃথিবীতে প্রথম মোবাইল ফোন উদ্ভাবকের মর্যাদা দেওয়া হয় মোটোরোলা কোম্পানিতে কর্মরত ডা. মার্টিন কুপার এবং জন ফ্রান্সিস মিটেলকে। ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে প্রথম সফলভাবে প্রায় ১ কেজি ওজনের হাতে ধরা ফোনের মাধ্যমে কল করতে সক্ষম হন। মোবাইল ফোনের প্রথম বাণিজ্যিক সংস্করণ বাজারে আসে ১৯৮৩ সালে। ফোনটির নাম ছিল মোটোরোলা ডায়না টিএস ৮০০০এক্স। যুগের পরিক্রমায় আধুনিক থেকে আধুনিকতার স্পর্শে মোবাইল ফোন হয়ে উঠেছে ছোটখাটো একটা কম্পিউটার। কেননা কম্পিউটারের অনেক ছোট ছোট কাজ এখন স্মার্ট ফোন দিয়ে করা যায়। মোবাইল ফোনের উন্নয়ন ও বিকাশ লাভের জন্য পরিবর্তনের হাত ধরে এসেছে মোবাইল ফোনের এক একটা প্রজন্ম (এবহবৎধঃরড়হ)। মোবাইল ফোনের প্রজন্মকে চারভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন- প্রথম প্রজন্ম (১ংঃ এবহবৎধঃরড়হ, ১৯৭৯-১৯৯০), দ্বিতীয় প্রজন্ম (২হফ এবহবৎধঃরড়হ, ১৯৯১-২০০০), তৃতীয় প্রজন্ম (৩ৎফ এবহবৎধঃরড়হ, ২০০১-২০০৮) এবং চতুর্থ প্রজন্ম (৪:য এবহবৎধঃরড়হ, ২০০৯-বর্তমান)। যাকে সংক্ষেপে ১এ, ২এ, ৩এ, ৪এ বলা হয়ে থাকে। একটা প্রজন্ম আরেকটা প্রজন্ম থেকে বৈশিষ্ট্য ও কর্মদক্ষতার দিক থেকে ভিন্ন। আশির দশকে ১এ ফোনগুলো ছিল সেলুলার নেটওয়ার্ক নির্ভর এবং এগুলো অ্যানালগ সিস্টেমের উপর ভিত্তি করে কাজ করে। এ দশকের ফোনগুলো থেকে কথা বলা ছাড়া বাড়তি কোনো সুবিধা পাওয়া যেত না। ১৯৯০ সালে এঝগ স্ট্যান্ডার্ড প্রযুক্তি ব্যবহার করে ২এ ফোন বাজারে আসে। ডেটা সার্ভিসের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং নেটওয়ার্ককে আরও বেশি সমৃদ্ধশালী করতে জাপানে এনটিটি ডোকোমো প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি হয় ৩এ। ৩এ ফোনের ঘাটতি পূরণ করতে ৪এ উদ্ভাবন হয় যা ৩এ থেকে ৫০ গুণ বেশি শক্তিশালী। এই শক্তিশালী বলতে বাকি তিনটা প্রজন্ম থেকে এটার নেটওয়ার্ক কভারেজ, ইন্টারনেট ও অন্যান্য সুবিধা বেশি সেটা বোঝায়। বর্তমান মোবাইল ফোনগুলো পালা বদলের হাত ধরে অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল হয়েছে। অলঙ্কৃত হয়েছে স্মার্ট নামক শব্দ দ্বারা। স্মার্ট মানে চটপটে, বুদ্ধিমান, ছিমছাম, যা প্রতিটা স্মার্ট ফোনের ভিতরে পরিলক্ষিত। স্মার্ট ফোন দ্বারা শুধু কথা নয়, আরও অনেক সেবা সহজে গ্রহণ করা যায়। স্মার্ট ফোনের বদৌলতে আজকাল ঘরে বসেই গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, আলোচনা করাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস করে অনেকে নানান বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। কিন্তু মোবাইলের অপব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের তরুণ সমাজ। হুমকির মুখে তারুণ্যের দুরন্তপনা। আমেরিকার এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন কলেজ স্টুডেন্ট দৈনিক দশ ঘণ্টা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। হতে পারে ইন্টারনেট ব্রাউজিং করা, পিডিএফ ফাইল পড়া কিংবা মেসেজ করাসহ অন্য কাজ। এছাড়া ফেসবুক, পর্নো ভিডিও, পাফজি, ফ্রি ফায়ার নামক মারাত্মক ভিডিও গেমে আসক্ত অনেকে। এ তালিকায় তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের মানুষ বিদ্যমান। মোবাইলকে কেন্দ্র করে বহু মানুষের সংসার ভেঙেছে। অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের কিছু নেতিবাচক প্রভাব গবেষকদের গবেষণায় উঠে এসেছে। ইৎরঃরংয ঈযরৎড়ঢ়ৎধপঃরপ অংংড়পরধঃরড়হ-এর মতে, গত কয়েক বছরে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ব্যাকপেইন সমস্যা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। এছাড়া উদ্বিগ্ন ও হতাশা, চোখের সমস্যা, স্নায়ু সমস্যা, মানসিক চাপ, নেতিবাচক অনুভূতির প্রভাব সমান হারে বেড়েছে। এসব কারণে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে স্মার্ট ফোনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা। তাই কারোর ক্ষতির জন্য কোনো কিছুকে দায়ী না করে, ঘুণ ধরা চিন্তা-চেতনার সংশোধন দরকার। সবকিছুর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে দেশ ও জাতির কল্যাণ আবশ্যক।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে