পাঠক- মত

শিক্ষার্থীদের অসহায়ত্ব দূর করুন

শিক্ষার্থীদের অসহায়ত্ব দূর করুন

করোনার ঢেউয়ে ভাসছে জনগণ, তেমনি হতাশার সাগরে ভাসছে শিক্ষার্থীরা। করোনার এ গল্পে সাধারণ জনগণ হয়েছে যাযাবর আর শিক্ষার্থীরা হয়েছে দিশাহীন পথিক। দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে জন্ম নিয়েছে অশিক্ষা, অনৈতিক কর্মকান্ডসহ নানা অসামাজিক কার্যকলাপ। দীর্ঘদিন দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় উচ্চশিক্ষায় নেমে এসেছে স্থবিরতা। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা। তাদের কেউ টিউশন করে, কেউবা পার্টটাইম কাজ করে পড়াশোনার খরচ জোগাড় করে এবং অনেকে বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। করোনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বাড়িতে থাকায় শিক্ষার্থীরা যেমন আর্থিক কষ্টে দিনাতিপাত করছেন, তেমনি তাদের পড়াশোনার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। সরকার শিক্ষার্থীদের অনলাইনভিত্তিক পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিলেও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা ল্যাপটপ ও ব্যয়বহুল ইন্টারনেটের কারণে অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। আবার স্কুল-কলেজের শিশু শিক্ষার্থীরা অত্যধিক অনলাইন ব্যবহারে আসক্ত হয়ে পড়ছে। অনেকে বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধে নিজেদের জড়িয়ে ফেলছে। এতে সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা নামক বই-খাতাকে আলমারিতে তুলে রেখে বাবার সঙ্গে ক্ষেতে-খামারে জন দিচ্ছে। অনেকে হতাশার খাতিরে আত্নহত্যাকে সঙ্গী বানিয়ে ফেলেছে আর মেয়ে শিক্ষার্থীরা যেন বিয়ের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। যেখানে করোনাকে দোহাই দিয়ে একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আর যানবাহন, গার্মেন্ট, শিল্প কারখানা, শপিংমল সব চলছে সেখানে করোনার প্রভাব একমাত্র শিক্ষার্থীরা ভোগ করছে।

করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষা ক্ষেত্রে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলো শিক্ষার্থীরা। সব শিক্ষার্থীরই বড় হয়ে কিছু করার স্বপ্ন থাকে। সবাই যে লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য গুছিয়ে কাজ করতে পারে এমন নয়। তবে কিছু শিক্ষার্থী তো এমন আছেই যারা ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন পূরণে আন্তরিক অঙ্গীকার নিয়ে অগ্রসর হয়। তাদের অধিকাংশই পৌঁছে যায় স্বপ্নের ঠিকানায়। করোনা পরিস্থিতিতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় এসব শিক্ষার্থীই হতাশায় ভুগছে বেশি। বদ্ধ পরিবেশে বেকার বসে থাকা স্বপ্নবাজ এসব তরুণ স্বভাবের সঙ্গে মেলে না। তাই তাদের মানসিক অস্থিরতায় ভোগাটাই স্বাভাবিক। তবে শুধু এসব উচ্চাকাঙ্ক্ষী শিক্ষার্থী নয়, সবাইকে মনে রাখতে হবে যে জীবন সব সময় একভাবে যায় না। তাই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়লে চলবে না। মহান আলস্নাহতাআলার ওপর ভরসা রেখে আর তার দেওয়া বিধিবিধানগুলোকে মেনে মনকে চাঙা রাখতে হবে। লক্ষ্যে পৌঁছার কাজ কোনোমতেই থামিয়ে বসে থাকলে চলবে না। প্রয়োজনে শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজের বাসায় বসেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। এখন তো যোগাযোগের অনেক সহজ ও শক্তিশালী মাধ্যম আছে। তবে এসব মাধ্যমকে অপব্যবহার না করে ভালো কাজে লাগাতে হবে।

প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার্থী এবং পরিবারের নিবিড় যোগাযোগ থাকলে ছাত্রছাত্রী এবং পিতা-মাতা উভয়েরই মানসিক দুশ্চিন্তা কমিয়ে আনা যায়। বহির্বিশ্বে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করোনার এই সময়ে প্রায় প্রতি সপ্তাহে সরাসরি ছাত্রছাত্রীদের কাছে ইমেইল করে হালনাগাদ তথ্য জানাচ্ছে, কোন পরিস্থিতে কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে তা বলছে এবং চলমান সংকট মোকাবিলার জন্য কী কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা-ও বিস্তারিত লিখছে। ক্ষেত্রবিশেষে অভিভাবককেও অবহিত করা হচ্ছে। এদিকে বাংলাদেশের অধিকাংশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের সরাসরি কোনো যোগাযোগ হয় না। এতে ছাত্রছাত্রীরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকে। নানারকম অসত্য তথ্যও ছড়িয়ে পড়ে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্য-ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে মাঝেমধ্যে ছাত্রছাত্রীদের বিরক্তি প্রকাশ পেতে দেখা যায়। অলস সময় কাটাতে হওয়ায় উচ্চশিক্ষা তথা স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন নানামুখী চাপের মুখে। বিশেষ করে যারা শিক্ষাজীবনের শেষ পর্যায়ে ছিলেন, তারা সেশন জটসহ কর্মজীবনে প্রবেশ করার অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল নয়- এমন পরিবারের শিক্ষার্থীদের পারিবারিক চাপও মোকাবেলা করতে হচ্ছে। সামাজিকভাবেও অনেককে সহ্য করতে হচ্ছে গঞ্জনা, লাঞ্ছনা। অনেককে এই করোনাকালে বিভিন্ন ধরনের কাজে নিয়োজিত হয়েছেন। কিন্তু সেটিও তারা নির্বিঘ্নে করতে পারছেন না।

স্কুল-কলেজে অভ্যন্তরীণ কিছু পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে অনলাইনে। কিন্তু তাতে বলা যাচ্ছে না যে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। অনিশ্চয়তা বাড়ছে। দফায় দফায় পিছিয়ে যাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার তারিখ। সব মিলে পৌনে ৪ কোটি ছাত্রছাত্রীর শিক্ষাজীবন এখন বিপর্যস্ত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থী, সবার জন্যই বড় চাপ এখন এই বন্ধ সময়। করোনার সঙ্গে যুদ্ধ, তার সঙ্গে সিলেবাস বনাম সময়ের যুদ্ধ। সময় নষ্ট না করতে, নতুন পথে ভাবতে হচ্ছে শিক্ষক-ছাত্র সবাইকেই। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকরাও নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। তাই সার্বিক শিক্ষা পুনরুদ্ধারে সুচিন্তিত পরিকল্পনা নিতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। আমরা বুঝতে পারছি করোনা দীর্ঘকালীনভাবে জীবনযাত্রার সঙ্গী হয়ে পড়বে। তাই বলে আর বসে থাকা চলবে না। একবারও কি ভাবছি, শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রসার স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে? আসলে এই নতুন জটিলতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে শিক্ষাদানের নতুন পদ্ধতি খুঁজে নেওয়াই হবে এর সমাধানের পথ। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে দ্রম্নত ১৮ বছরের বেশি সবার টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠান খোলার কোনো বিকল্প নেই।

সুরাইয়া ইয়াসমিন তিথি

শিক্ষার্থী ও ডিবেটর

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে