রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে হবে

নতুনধারা
  ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫১ বছর। স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই একটি উন্নত ও সফল দেশ গঠনের প্রত্যয় নিয়ে কৃষি, শিল্প, সেবা ইত্যাদি খাতের আগের তুলনায় ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য জাতিকে শিক্ষিত করার বিকল্প নেই এটা সবারই জানা। এ লক্ষ্যে সরকারও নানা সময়ে নানারকম পদক্ষেপ পূর্বেও নিয়েছে এবং এখনো নিচ্ছে। আমাদের দেশে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। বিশাল এ জনগোষ্ঠীর চাহিদার কথা ভেবে দেশের সর্বত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি জেলায় অসংখ্য স্কুল, কলেজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও নেহাত কম নয়- সম্প্রতি দেশের সব জেলায় একটা করে প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেশি হলে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী পড়ার সুযোগ পাবে। বর্তমানে দেশের শিক্ষিত মানুষের হার প্রায় ৭৫ শতাংশ। এর পাশাপাশি দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখের মতো। এর প্রধান কারণ হলো গুণগত শিক্ষার অভাব। মুখস্থ শিক্ষার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সৃজনশীল পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে কিন্তু সেই শিক্ষা দেওয়ার মতো সৃজনশীল শিক্ষক তৈরি করা হয়নি। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধির আরও একটা বড় কারণ হচ্ছে এক শ্রেণির চাকরিপ্রত্যাশী। এদিক থেকেও দায় সরকারকেই নিতে হবে। কেননা দেশে শিক্ষিত যুবক ছেলেমেয়েদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মতো পস্ন্যাটফর্মও নেই। যাই হোক আসল কথা হলো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে চরম বৈষম্য রয়েছে তা এবার পরিষ্কার হয়ে গেছে। স্বাধীনতার এত বছর পরে এসেও দেশে শিক্ষার গুণগত মানের দিকে লক্ষ্য না দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রেজাল্টের বিনিময়ে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বানিয়ে ফেলেছি। প্রথমত দেশের স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষাকে জাতীয় ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এ দুটি স্তরে ভাগ করে ফেলেছি আমরা। এ দেশে মনে করা হয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মানেই উন্নত শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া, এটাই আসল শিক্ষা এবং জীবনও সফল। অন্যদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মূল্য নেই। এতে জীবনে কিছু করা সম্ভব নয়। অথচ পাবলিকের তুলনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েই অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এটা ভাগ নয় এটা শিক্ষা ব্যবস্থার স্তর। যেটা দেশের শিক্ষার মানোন্নয়নের পথে অনেক বড় একটা বৈষম্য। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে এই বৈষম্য খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয় তথা সরকারই তৈরি করেছে। তার একটা বড় প্রমাণ হলো শিক্ষার্থীদের মাথাপিছু ব্যয়ের পরিমাণ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসির তথ্যমতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজ আছে ২ হাজার ২৫৭টি। এগুলোতে শিক্ষার্থী পৌনে ৩০ লাখ। মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে স্নাতক সম্মানে প্রায় ১৫ লাখ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীপিছু ব্যয় করে থাকে নিজস্ব আয় থেকে। তবে এই নিজস্ব আয়টি হয় মূলত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই নেওয়া ফির মাধ্যমে। এখানে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে বছরে খরচ হয় মাত্র ১ হাজার ১৫১ টাকা। এর বিপরীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপিছু ব্যয় ২, ১২০০০ টাকা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১,০৪,০৯৬ টাকা, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৩,৯৪, ৬৬৩ টাকা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় ব্যয় করে ৭,৫২,৬৯৭ টাকা। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সরকার শিক্ষার্থীপিছু সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে নতুন প্রতিষ্ঠিত এই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। যেহেতু এটা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, তাই শিক্ষার্থীও কম কিন্তু মোট বরাদ্দ বেশি হওয়ায় শিক্ষার্থীপিছু ব্যয় বেশি হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে বরাদ্দের কমবেশির কারণে ব্যয়ের পার্থক্য হতেই পারে তাই বলে এত পার্থক্য কীভাবে সম্ভব! আরও যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আছে সেগুলোর ব্যয়ের সঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয়ের যে আকাশ-পাতাল বৈষম্য তা সত্যি মেনে নেওয়া যায় না। আমার মতে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীরা। দেশের শিক্ষার সার্বিক উন্নতিতে বড় একটা বাঁধা ব্যয়ের এই বৈষম্য। শিক্ষা ক্ষেত্রে সব শিক্ষার্থীকে সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত। শুধু যে পাবলিক বা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দিয়েই বাংলাদেশের শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে বা শুধু তারাই দেশের উন্নয়নে কাজে লাগবে এমনটা কেউ বলতে পারবে না। আমাদের দেশে চাকরিকে শিক্ষার পূর্বশর্ত হিসেবে ধরা হয়। স্নাতক, স্নাতকোত্তর পাস করে সবাই চাকরির পেছনেই ছোটে। আর চাকরির পরীক্ষায় পাবলিক, জাতীয় সবাই সমান। ৪১তম বিসিএসে যে কজন ক্যাডার হয়েছে তাদের প্রায় সবাই বুয়েটের শিক্ষার্থী। দেশের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বাংলাদেশ অনেক কিছু আশা করে। গবেষণা করে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটিয়ে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। তা-না করে তারা প্রশাসনের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। এটা সত্যি দুঃখজনক। তাহলে এদের প্রতি সরকারের এত বেশি ব্যয় করে লাভ কী? শুধু শুধু বৈষম্য রেখে শিক্ষা সংকট তৈরি ছাড়া কিছু না। বছরের পর বছর এভাবে চলছে, জরিপে শিক্ষিতের হার বৃদ্ধি পেলেও গুণগত মানের কোনো উন্নতি নেই। ফলে প্রতি বছর শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় সব কলেজেরর্ যাংকিং করে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় এভাবে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিযোগিতা অবশ্যই ভালো। কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রথম হওয়া আর সেরা হওয়া আক্ষরিক অর্থে এক বিষয় নয়। কেননা পরীক্ষায় প্রথম হওয়া এখন আহামরি কোনো বিষয় নয়। আর আমাদের দেশে শিক্ষার সঙ্গে রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাওয়ায় প্রায় সব কার্যক্রমই প্রশ্নবিদ্ধ। অন্যদিকে সেরা হতে গেলে কঠোর পরিশ্রম, সাধনা আর যথাযথ শিক্ষার দরকার হয়। তাই স্তর না করে পিছিয়ে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে রিকোভার করতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য প্রথমেই শিক্ষার্থীপিছু ব্যয়ের এই বৈষম্য বা ফারাক দূর করতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশ যেখানে শিক্ষার সংকট কাটিয়ে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশে পাহাড়সম বৈষম্য তৈরি করে শিক্ষার অগ্রগতির কফিনে পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী হিসেবে সবার দাবি যে সবাইকে সমান সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। ব্যয়ের এই বৈষম্য দূর করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে নতুন নতুন পদক্ষেপ নিতে হবে। শাকিবুল হাসান শিক্ষার্থী, বরেন্দ্র কলেজ রাজশাহী
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে