শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

অপরাধীদের কঠোর হাতে দমন করতে হবে

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবশ্য বলেছেন সার্বিক দিক বিবেচনায় তুলনামূলকভাবে দেশে অপরাধপ্রবণতা অনেকটা কম। তবে ফৌজদারি অপরাধ কমলেও বেড়েছে পারিবারিক নির্যাতন।
দয়াল কুমার বড়ুয়া
  ০৬ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০
দেশে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রায়ই অভিযান চালিয়ে আটক করছে অবৈধ অস্ত্র। এর হোতাদেরও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তারপরও অবৈধ অস্ত্রধারীদের দৌরাত্ম্য থামছে না। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত ডিঙিয়ে আসছে অস্ত্রের চালান। দেশেও তৈরি হচ্ছে ছোটখাট আগ্নেয়াস্ত্র। নির্বাচনকে সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান বাড়ছে। অতি সম্প্রতি বেনাপোল সীমান্তে ধরা পড়েছে ৭টি বিদেশি পিস্তল, ৪টি ম্যাগাজিন ও ১০ রাউন্ড গুলি। ভারত থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদের চালান আসছে এমন সংবাদ পেয়ে বিজিবি সদস্যরা শুক্রবার রাত ১২টায় অগ্রভুলাট ও দৌলতপুর সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৭টি নাইন এমএম পিস্তল, ৪টি ম্যাগাজিন ও ১০ রাউন্ড গুলিসহ এক অস্ত্র ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে। বিজিবির ধারণা দেশে নাশকতা সৃষ্টি করতে ও সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এসব অস্ত্র ভারত থেকে আনা হচ্ছিল। আটক অস্ত্র ব্যবসায়ী বিজিবির কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তা স্বীকার করেছেন। অস্ত্র আইনে মামলা দিয়ে তাকে বেনাপোল পোর্ট থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। গত বছর ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার গাবতলী থেকে একটি প্রাইভেট কারসহ পাঁচজনকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ। তাদের কাছ থেকে ম্যাগাজিন, গুলিসহ ৮টি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। ৩০ আগস্টর্ যাব-৭ বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল ইউনিয়নের পূর্ব জঙ্গল চাম্বল গ্রামের একটি পাহাড়ে অস্ত্র তৈরির কারখানার সন্ধান পায়। এ কারখানার উৎপাদিত অস্ত্রগুলো ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে সরবরাহ করা হতো। অবৈধ অস্ত্র দেশের রাজনীতিকে কলুষিত করছে। অস্ত্রধারী মানুষবেশী শকুনদের দাপটে প্রতিটি জনপদ অনিরাপদ হয়ে উঠছে। টেন্ডার বাণিজ্যের ভাগ্য নির্ধারিত হচ্ছে অস্ত্রবাজদের হাতে। অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। সততার সংকট থেকে তাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কোন এলাকায় কারা অবৈধ অস্ত্রধারী এটি সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রায় শতভাগ লোকেরই জানা। নতজানু মনোভাব পোষণ না করলে অস্ত্রধারীদের আইনের আওতায় আনা কঠিন হওয়ার কথা নয়। এক শ্রেণির মানুষ পুলিশ প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, মানবিক মূল্যবোধ কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করছে না। সামান্য কারণেই যখন খুনের ঘটনা ঘটছে তখন বলতে হবে, মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বেড়ে গেছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং অপরাধপ্রবণতা প্রতিরোধের দায়িত্ব মূলত পুলিশ বাহিনীর। পুলিশ দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবশ্য বলেছেন, সার্বিক দিক বিবেচনায় তুলনামূলকভাবে দেশে অপরাধপ্রবণতা অনেকটা কম। তবে ফৌজদারি অপরাধ কমলেও বেড়েছে পারিবারিক নির্যাতন। অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে পারিবারিক বন্ধনে ছন্দপতন ও প্রযুক্তির অপব্যবহারকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন ঢিলে হয়ে গেছে অনেক আগেই। সমাজের ভেতর পরিবার, প্রতিবেশী, এলাকাভিত্তিক সংস্কৃতির চর্চা ও বন্ধনগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। অনুশাসন বলতে কিছু নেই। আগে সামাজিকভাবে প্রতিরোধের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা ইদানীং দেখা যায় না। আগের সামাজিক অনুশাসনগুলো আর কাজ করছে না। উচ্চাভিলাষী জীবনযাপনে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হত্যা বা আত্মহত্যা যেটিই হোক, প্রতিটি ঘটনার পেছনে প্ররোচনাকারী আছে। তাদের যথাযথভাবে শনাক্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত এগুলো কমবে না। এক খবরে বলা হয়েছে, আগের দুই দিনে দেশের ১১ জেলায় ১৩ খুনের ঘটনা ঘটেছে। গাজীপুরে এক শ্রমিকের পাঁচ টুকরা লাশ উদ্ধার হয়েছে। সিরাজগঞ্জে শয়নকক্ষ থেকে মা ও দুই ছেলের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নরসিংদীর পলাশে এক দিনমজুরকে নিজ বাড়ির উঠানেই হাত-মুখ বেঁধে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। মানিকগঞ্জের শিবালয়ে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে বাড়ির সীমানা নিয়ে বিরোধের জের ধরে একজনকে গলা টিপে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। বগুড়ার ধুনটে মাদক সেবনের টাকা না পেয়ে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নির্যাতনের পর বিষ খাইয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার স্বামীর বিরুদ্ধে। ময়মনসিংহের ফুলপুরে স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে তার স্বামীকে আটক করেছে পুলিশ। কুমিলস্নার চৌদ্দগ্রামে এক নববধূকে যৌতুকের জন্য শ্বশুরবাড়ির লোকজন হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রংপুরের পীরগাছায় ভাবির লাঠির আঘাতে দেবরের মৃতু্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নারায়ণগঞ্জের বন্দরে নিখোঁজের চারদিন পর একটি ডোবা থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এক অটোরিকশা চালকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে বহু আলোচনা হচ্ছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে বলা যায়, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় চরমে পৌঁছেছে। কিছু মানুষের মধ্যে নৈতিকতা বলতে কিছু নেই। এক শ্রেণির মানুষ পুলিশ প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, মানবিক মূল্যবোধ- কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করছে না। কাজেই দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলোকে আরও সক্রিয় ও তৎপর হতে হবে। অপরাধীদের কঠোর হাতে দমন করতে হবে। আশা করি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের প্রতি রাষ্ট্র সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করবে। দয়াল কুমার বড়ুয়া : কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ, কো-চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টি
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে