শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

গণপরিবহণের নৈরাজ্য, অনিয়ম রুখবে কে?

বর্তমানে যে বিষয়টি বেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তা হলো গণপরিবহণে নারীর নিরাপত্তাহীনতা। এই বিষয়টিও নতুন নয়। কিন্তু পুরাতন বিষয় হলেও এই সমস্যার সমাধান যেন কোনো কালেই হবে না।
আজহার মাহমুদ
  ০৬ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০
জনগণের স্বার্থে গণপরিবহণ। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে গণপরিবহণ। বাংলাদেশের মানুষ অতটা ধনি নয় যে, প্রত্যেকে চাইলে একটা করে প্রাইভেট গাড়ি ব্যবহার করবে। দু'বেলা দুমুঠো ভাত জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে আবার প্রাইভেট গাড়ি! কথাটা একটু হাস্যকরই বটে। কিন্তু এই হাস্যকর কথা বলার কারণ হচ্ছে গণপরিবহণে সাধারণ মানুষের অসন্তুষ্টি। গণপরিবহণের অনিয়ম, অসঙ্গতি, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলাসহ নানা সমস্যায় যাত্রী, পথচারী থেকে সবাই অতিষ্ঠ। গণপরিবহণের এসব নৈরাজ্য বর্তমান সময়ে আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। পরিবহণের এই সেক্টরে শৃঙ্খলা কখন ছিল সেটাও সাধারণ মানুষ মনে করতে পারে না। এ সেক্টর একটি অপরিকল্পিত সেক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমানে। প্রতিনিয়ত কোটি কোটি মানুষ গণপরিবহণের দারস্থ হচ্ছে। উচ্চ মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে একদম নিচের শ্রেণির মানুষেরও এই গণপরিবহণের মাধ্যমে যাতায়াত করতে হয়। গণপরিবহণ বলতে আমরা যেসব বুঝে থাকি তার মধ্যে অন্যতম হলো বাস, টেম্পু। সারাদেশের রাস্তায় বিভিন্ন নামে চলাচল করে থাকে এই পরিবহণ। সিটি সার্ভিস, সিটিং সার্ভিস, বিরতিহীন সার্ভিস, স্পেসাল সার্ভিস, সুপ্রভাত পরিবহণ, ৪ নাম্বার বাস, ৭ নাম্বার বাস, আরো কত বাহারি নামের নানান ধরনের পরিবহণ আমাদের দেশের নানান জেলায় চলাচল করে থাকে তার হিসাব হয়তো যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছেও নেই। এসব পরিবহণের মান কতটুকু তা কিন্তু সবারই কমবেশি জানা আছে। জোড়াতালি, রং মালিশ করে গাড়ির নাম্বার এবং রুট পরিবর্তন করে ঠিকি এসব পরিবহণ আমাদের চোখের সামনে নিত্যদিন চলাচল করছে। এসব পরিবহণের সবচেয়ে বড় অনিয়ম হচ্ছে অদক্ষ ড্রাইভার ও অদক্ষ হেলফার। ছোট ছোট বাচ্চাকে হেলফারের কাজ দিয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে এসব পরিবহণের মালিকগণ। থাকে না ড্রাইভার কিংবা হেলপারের কোনো বৈধ লাইসেন্স। অনেক সময় ড্রাইভার থাকে নেশাগ্রস্ত। পরিবহণগুলোর যথাযথ ফিটনেস যে নেই সেটাও খালি চোখে দেখা যায়। এতসব সমস্যার পরেও আইনের নাকের ডগায় চলাচল করে এসব পরিবহণ। আইন আছে, ট্রাফিক পুলিশও আছে কিন্তু তার কোনো ধরনের প্রয়োগ নেই। তাই গণপরিবহণের শৃঙ্খলা দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। বেড়ে যাচ্ছে গণপরিবহণের অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা। সকাল-বিকাল অফিস টাইমে গণপরিবহণের অনিয়মের কারণে অসহ্য হয়ে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষ। শিশু থেকে বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ সবারই ভোগান্তির শেষ নেই। অসহায় এবং নারীযাত্রীরা এক শ্রেণির সন্ত্রাসী পরিবহণের হাতে লাঞ্ছিত হয় প্রতিনিয়ত। বর্তমানে যে বিষয়টি বেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তা হলো গণপরিবহণে নারীর নিরাপত্তাহীনতা। এই বিষয়টিও নতুন নয়। কিন্তু পুরাতন বিষয় হলেও এই সমস্যার সমাধান যেন কোনো কালেই হবে না। যাতায়াতের জন্য গণপরিবহণে উঠতে হবে সবার। তাই বলে নারীর সম্মানহানি করবে কিছু পরিবহণ শ্রমিক, তা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। আজকাল দেখা যায় গণপরিবহণে নারী ধর্ষণ কোনো ব্যাপরই না। এসব নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে উঠছে আমাদের জন্য। খবরের কাগজে রোজ একটা না একটা ধর্ষণের ঘটনা পড়ছি আমরা। আমাদের মাঝে এখন বিষয়টি নিত্যদিনের খবর হয়ে উঠেছে। এ লজ্জা কোথায় রাখব তা ভেবে পাই না। গণপরিবহণের এই নৈরাজ্য ঠেকাতে যাত্রী কল্যাণ ফাউন্ডেশন নামক একটি সংগঠন থাকলেও কাজের কাজ কিছুই করছে না তারা। সারা বছর তাদের ঘুমিয়ে থাকা আর মাঝে মাঝে কয়েকটা সংবাদ সম্মেলন করা ছাড়া তেমন কিছুই তাদের কাছ থেকে পায়নি সাধারণ যাত্রীরা। অথচ তারা নাকি যাত্রীদের কল্যাণে কাজ করে। একটা বিষয় মাথায় রাখবেন, এভাবে যদি আমরা সবাই সিনেমা দেখার মতো দর্শকের ভূমিকা পালন করি, তবে অদূর ভবিষ্যতে আপনাকেও এই সিনেমার চরিত্রে অন্যকেউ দেখবে সেটা মনে রাখবেন। এই গণপরিবহণের অনিয়ম, অন্যায় ঠেকাতে এখনি সবার এক হতে হবে। কিছু কিছু পরিবহণ শ্রমিক রয়েছে- যারা সন্ত্রাসীর মতো করে টাকা হাতিয়ে নেয় যাত্রীদের কাছ থেকে। এসব দুর্ভোগে প্রশাসনের কোনো কার্যকারী পদক্ষেপ দেখা যায় না। অনেকের মতে প্রশাসনের সঙ্গে পরিবহণ মালিকদের সখ্যতা থাকে সব সময়। তাই এসব অনিয়ম নৈরাজ্যের কোনো সমাধান আশা করা অলীক স্বপ্ন বলা যায়। কিন্তু এ সেক্টরকে দিন দিন আরও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে কেন সেটাই এখন জনসাধারণের প্রশ্ন। আজকাল গণপরিবহণে কোনো ভদ্রতা নেই। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, মুরুব্বী কিংবা বয়স্ক মানুষের সঙ্গেও তাদের ব্যবহার হয় মারমুখী। আচরণ আর বৈশিষ্ট্যে নেই কোনো শৃঙ্খলা। ক্রমান্বয়ে এ সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। কিন্তু আইনের কোনো প্রয়োগ দেখা যায় না। এ ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রশাসনের সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্র এই সেক্টরের প্রতি একটু গভীর নজর দিলে আমার মনে হয় এই সেক্টরের অনিয়ম কিছুটা হলেও দূর করা সম্ভব। মালিক, শ্রমিক, প্রশাসন সবাই যদি এক হয়ে সমঝোতার মাধ্যমে কাজ করি তবেই এ সমস্যা থেকে উত্তরণ কোনো কঠিন কিছু নয়। তবে এর জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে। গণপরিবহণকে গড়ে তুলতে হবে একটি সেবামূলক খাতে। আর এ সবকিছুর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সবার এক হওয়া- তাই অতীব জরুরি। আজহার মাহমুদ : প্রাবন্ধিক এবং কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে