মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯
walton1

উপকূলীয় জনজীবন বাঁচান

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় ব্যাপক তৎপরতা প্রয়োজন। নোনা পানি ও খরাসহিষ্ণু কৃষি গবেষণা এগিয়ে নিতে হবে। উপকূলীয় বেড়িবাঁধ শক্তিশালী করে ফসল, উপকূলীয় জনজীবন ও চাষাবাদ রক্ষা করতে হবে।
দয়াল কুমার বড়ুয়া
  ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, অধিক হারে মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে থাকা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের নানা অভিঘাত মোকাবিলা করছে সারা পৃথিবী। বাংলাদেশের মতো কিছু দেশে এই অভিঘাত অনেক ব্যাপক। এক হিসাবে দেখা যায়, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি শ্রম ও উৎপাদনশীলতা হারানো পাঁচটি দেশের একটি বাংলাদেশ। 'কপ-২৭' সম্মেলনে উপস্থাপিত 'ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন পস্ন্যান অব বাংলাদেশ (২০২৩-২০৫০)' শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের উপকূলীয় ১৯ জেলার আবাদযোগ্য জমির প্রায় অর্ধেক লবণাক্ততার শিকার হয়েছে। মৃত্তিকাসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, এর ফলে উপকূলীয় জেলাগুলোতে বছরে খাদ্যশস্য উৎপাদন কম হচ্ছে প্রায় ৩০ লাখ ২৭ হাজার টন। প্রতিনিয়ত বাড়ছে লবণাক্ততার শিকার জমির পরিমাণ। মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ যে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে জাতীয় গবেষণায় তো বটেই, আন্তর্জাতিক অনেক গবেষণায়ও তা উঠে এসেছে। এ ক্ষেত্রে ১০টি প্রধান ঝুঁকির অন্যতম হচ্ছে নোনা পানির ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন। উপকূলের বেশির ভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর। স্বাভাবিক জোয়ারেও এখন অনেক বেশি এলাকা তলিয়ে যায়। কৃষি জমি, মাছের ঘের তলিয়ে যায় নোনা পানিতে। ফলে মিঠা পানিনির্ভর ফসল তো বটেই, উদ্ভিদ, মাছসহ জলজ প্রাণীও টিকতে পারছে না। মানুষের স্বাস্থ্যেও মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বাগেরহাট জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, উপকূলীয় এলাকায় প্রতি লিটার পানিতে লবণাক্ততার গ্রহণযোগ্য মাত্রা হচ্ছে এক হাজার মিলিগ্রাম। কিন্তু মোংলায় প্রতি লিটার পানিতে লবণাক্ততা পাওয়া যায় চার থেকে সাড়ে ৯ হাজার মিলিগ্রাম পর্যন্ত। অর্থাৎ স্বাভাবিকের চেয়ে ৯ গুণ বেশি। ১৯৬২ সালে বাগেরহাটের মোংলা পয়েন্টে পশুর নদের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল দুই পিপিটি (পার্টস পার থাউজেন্ড), ২০০৮ সালে সেখানে পাওয়া গেছে ২০ পিপিটি। অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পান করে মানুষ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, পেটের পীড়াসহ নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়ছে। এমনকি সেই পানিতে গোসল বা হাঁটাচলা করলেও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের 'রিভার স্যালাইনিটি অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ এভিডেন্স ফ্রম কোস্টাল বাংলাদেশ' শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালে উপকূলের ১৯ জেলার ১৪৮টি উপজেলার মধ্যে অতি উচ্চমাত্রায় লবণাক্ততার শিকার হবে ১০টি উপজেলা। এ সময়ের মধ্যে লবণাক্ততা, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অন্যান্য জলবায়ুসংক্রান্ত বৈরী প্রভাবের কারণে এ অঞ্চলের এক কোটি ৩৩ লাখ মানুষ বাস্তুচু্যত হতে পারে। শুধু লবণাক্ততা নয়, একই কারণে বাড়ছে খরার প্রকোপও। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গড়ে প্রতি বছর খরায় ক্ষতির শিকার হচ্ছে প্রায় ৩৫ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ। ইউ জলবায়ু বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র দেশগুলোর জন্য 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড' নামে একটি তহবিল গঠনে সম্মত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর জোট 'জি-৭৭' এ তহবিলের দাবি জানিয়ে আসছিল। এবারের 'কপ-২৭' সম্মেলনে এটি অন্যতম প্রধান দাবি ছিল। এই তহবিলের অর্থ দরিদ্র দেশগুলোর ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামোর ওপর চরম জলবায়ুর ধ্বংসযজ্ঞ মোকাবিলা, উদ্ধার কাজ পরিচালনা ও পুনর্গঠনে ব্যয় করা হবে। এ বিষয়ে ফ্রান্স তিমারম্যানস জানান, এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা তহবিল গঠনের আগে সময় নিয়ে, ভেবেচিন্তে অগ্রসর হওয়া উচিত। তবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন চেয়েছে, দ্রম্নত 'জি-৭৭' এর দাবি মেনে নিতে। তাই তারা তহবিল গঠনে রাজি হয়েছেন। দাতাদের দ্বারা পরিচালিত এই তহবিল 'নিঃশর্ত' হবে না এবং অর্থ বহুজাতিক উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। ইইউ'র পক্ষ থেকে তহবিল গঠনের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন ক্যারিবীয় দেশগুলোর জোটের মহাসচিব কারলা বারনেট। তিনি জানান, জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র ও দ্বীপ দেশগুলোর জন্য আর্থিক সাহায্যের বিকল্প নেই। এই তহবিল এসব দেশের ভবিষ্যতের জন্য জরুরি। অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী ক্রিস বোয়েন ইইউ'র উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন যে, তার দেশ তহবিলে যোগ দেবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ইইউ'র এই উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করছেন অনেকেই। 'কপ-২৭' সম্মেলনে 'জি-৭৭' জোটভুক্ত দেশগুলোর একজন আলোচক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইইউ'র তহবিল গঠনের ঘোষণা অপ্রত্যাশিত ছিল না। এর মাধ্যমে তারা দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত দেশগুলোকে আলোচনার টেবিলে বসিয়েছে। তা গ্রহণযোগ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্র এর আগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য জলবায়ু তহবিল গঠনে আপত্তি জানিয়েছিল। তবে ইইউ'র পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়ার পর এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি ওয়াশিংটন। তবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের জলবায়ু উপদেষ্টা ও ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রগ্রেসিভ পলিসি ইন্সটিটিউটের জলবায়ু পরামর্শক পল ব্লেডসোয়ে জানান, দরিদ্র দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন প্রক্রিয়ায় খাপ খাওয়াতে এ তহবিল সহায়তা করবে। সর্বোপরি, এটি বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে অবদান রাখবে- যা প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অন্যতম শর্ত। এর আগে 'কপ-২৭' সম্মেলনে চীনের জলবায়ু বিষয়ক প্রতিনিধি ও কূটনীতিক শি জেনহুয়া জানান, জলবায়ু সংকটের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির তহবিলে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য অর্থ দিতে রাজি তার দেশ। চীন ধনী দেশগুলোকে যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বানের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে, কারণ তার দেশের এই ধরনের কার্যকলাপে যোগদানের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। \হবৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধে গত বছরের 'কপ-২৬' সম্মেলনের বিষয়গুলোই এবারের সম্মেলনেও গুরুত্ব পেয়েছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্যে জোর দেওয়া হয়েছে এবারও। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্যারিসে 'কপ-২১' নামের একটি সম্মেলনে জলবায়ু চুক্তির ব্যাপারে সম্মত হন বিশ্বনেতারা। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ২০০টি দেশ এতে স্বাক্ষর করেছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় ব্যাপক তৎপরতা প্রয়োজন। নোনা পানি ও খরাসহিষ্ণু কৃষি গবেষণা এগিয়ে নিতে হবে। উপকূলীয় বেড়িবাঁধ শক্তিশালী করে ফসল, উপকূলীয় জনজীবন ও চাষাবাদ রক্ষা করতে হবে। দয়াল কুমার বড়ুয়া : কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ, কো-চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টি
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে