স্বাগত ১৪২৬

অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে

প্রকাশ | ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক
আজ পহেলা বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। 'ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা সরিয়ে'- আজ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সূচিত হয়েছে একটি নতুন বছরের। 'তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে' উড়িয়ে দিয়ে 'আজি প্রাতে সূর্য ওঠা' সফল করতে প্রতিটি বাঙালি 'পহেলা বৈশাখ' বরণ করে নিচ্ছে অমেয় প্রাণের উৎসাহে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিও মেতে উঠেছে বর্ষবরণের নানা আয়োজনে। আবহমানকাল ধরে চলে আসা বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশই এই বর্ষবরণ। তবে এবারের বর্ষবরণ নানা কারণে ভিন্নমাত্রা যুক্ত করেছে। এর আগে বর্ষবরণে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়ে ভুবনপ্রিয় হয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতি বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা লাভ করেছে। সঙ্গত কারণে বিশ্বের সব বাঙালির কাছে আজকের দিনটি আনন্দের অন্যতম উপলক্ষ হিসেবে বিবেচিত। বাঙালি জাতি তার নববর্ষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে চলেছে দীর্ঘদিন। এ ধারা চলে আসছে গানে-কবিতায়। লোকাচারের নানা অনুষঙ্গে, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। দেশের বৃহত্তম অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে সর্বস্তরের মানুষের কাছে বাংলা নববর্ষ বহুকাল ধরে বরণীয়। চৈত্রসংক্রান্তির নানা লোকাচার আর নববর্ষবরণে কৃষিজীবী সমাজের বিচিত্র আয়োজনও লোকায়ত উৎসব হিসেবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও বৈশাখের গুরুত্ব যথেষ্ট। চৈত্রের প্রচন্ড দাবদাহে চৌচির মাঠঘাট বৃষ্টির আশায় উন্মুখ হয়ে থাকে। উন্মুখ বাংলার কৃষিজীবী সমাজও। নতুন বছরের কাছে তাদের প্রত্যাশা বৃষ্টিস্নাত মৃত্তিকায় বীজ ছড়িয়ে দেয়ার অনুকূল পরিবেশ প্রাপ্তির। বৈশাখ যেমন নব সৃষ্টির, তেমনি কাল বৈশাখীর ছোবলে ধ্বংসাত্মকও। লোকবিশ্বাস আছে প্রকৃতির ধ্বংস ক্রিয়ার মধ্যেই নিহিত আছে সব নবীন সৃষ্টির বীজ। ফলে সবার মনে আজ একটাই সুর, 'যাক পুরাতন স্মৃতি/যাক ভুলে যাওয়া গীতি,/অশ্রম্নবাষ্প সুদূরে মিলাক।' বলাই বাহুল্য, পহেলা বৈশাখের সঙ্গে বাঙালির সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক যেমন নিবিড়, তেমনি অর্থনৈতিক সম্পর্কও তাৎপর্যপূর্ণ। পহেলা বৈশাখ ও নববর্ষ ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বাঙালির সর্বজনীন উৎসব। দেশ স্বাধীনের আগে পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৯৬৭ সালে ছায়ানট রমনার বটমূলে বর্ষবরণ উৎসবের আয়োজন করেছিল। এতে হাজার হাজার বাঙালি যোগ দিয়েছিল। আজও রমনায় ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে মানুষের ঢল নামবে। তবে উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর নানা অশুভ কর্মকান্ডে উৎসবপ্রিয় বাঙালির মনে এক ধরনের সংশয় যে ক্রিয়াশীল নয় তেমনটিও নয়। স্বাধীনতার এতদিন পরও এ দেশে নববর্ষ উৎসবকে ঘিরে মৌলবাদী আস্ফালন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, যা আমাদের ব্যথিত করে। ওই গোষ্ঠী মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো মাঙ্গলিক আচার-অনুষ্ঠান যাতে না হয়, এ জন্য নানা কর্মকান্ড চালায়। বর্ষবরণ উৎসবে বোমা হামলা চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি এই অপশক্তি, উৎসবে নারী লাঞ্ছনার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটিয়েছে অতীতে। সুতরাং সংশ্লিষ্টদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে অপশক্তি নির্মূল করুন। দুষ্কৃতকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের অনন্য সব অর্জনকে সমুন্নত রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নিন। অত্যন্ত পরিতাপের হলেও সত্য যে, পহেলা বৈশাখের কয়েকদিন আগেই ফেনীতে নুসরাত রাফি নামের এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে পরিকল্পিতভাবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় ওঠে এসেছে মাদ্রাসা অধ্যক্ষের যৌনলালসা ও নানামাত্রিক দুর্নীতি। দেশের বিবেকবান প্রতিটি মানুষও এই নৃশংস ঘটনার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, নুসরাত হত্যাকারী কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রীর এই উচ্চারণ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আমরা মনে করি, নারী নিগৃহের যে কোনো ঘটনা জাতির সুস্থ সংস্কৃতি চর্চাকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। ফলে আমাদের আহ্বান থাকবে, মনুষ্যত্বের পক্ষে মেধা, মনন ও শক্তি নিয়ে রুখে দাঁড়ানোর। মনে রাখা দরকার, এই মহান উদ্দেশ্য নিয়েই অতীতে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের শুরু হয়েছিল। সুতরাং নববর্ষকে অগ্রগতির স্মারক করে তুলতে দেশে ক্রিয়াশীল সব ধরনের অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার শপথ নিতে হবে। দেশের অগ্রগতির সম্ভাবনার সব অমেয় দ্বার খুলে দিতে এবং সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধে শামিল হওয়ার কোনো বিকল্প থাকাও উচিত নয়। বছরের প্রথম দিনে যায়যায়দিনের অগণিত পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই অকৃত্রিম শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।