অতীত থেকে আমরা কতটুকু শিক্ষা নিচ্ছি?

প্রকাশ | ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

কাজী আশফিক রাসেল শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
'ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না' কথাটি প্রখ্যাত ব্রিটিশ লেখক-নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ তার নিজ দেশের ও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বললেও আমাদের দেশ ও সমাজব্যবস্থার বর্তমান প্রেক্ষাপটে কথাটির গ্রহণযোগ্যতা অনস্বীকার্য। আমরা যেন ভয়ঙ্কর এক মৃতু্যর ফাঁদে পড়েছি। দেশের বাসাবাড়ি, সুউচ্চ বহুতল ভবন, সড়ক, মহাসড়ক, রাজপথ, নৌপথ, সেতু- সব যেন সাক্ষাৎ মৃতু্যর ফাঁদ। সড়কে বের হলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবরারের মতো গাড়ির চাপায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারাতে হবে আর অফিসে কিংবা বাসায় থাকলে আগুনে পুড়ে মরতে হবে। কখনো পুরান ঢাকার নিমতলীতে, আবার কখনো আশুলিয়ার তাজরিন ফ্যাশনে। একবার সাভারের রানাপস্নাজা, আরেকবার চকবাজার। আবার চকবাজারের শোক কাটাতে না কাটাতেই বনানীর অগ্নিকান্ডে ২৫ জনের অঙ্গার হওয়া লাশ। এভাবে একের পর এক অগ্নিকান্ড বা সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন শবযাত্রায় যুক্ত হচ্ছে নতুন লাশ। বাতাসে লাশের গন্ধ আর স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে চারদিক প্রতিনিয়ত ভারী হয়ে উঠেছে। মৃতু্যর মিছিল শুধু দীর্ঘতরই হচ্ছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে ২০ থেকে ২১ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বুয়েটের হিসেবে মৃতু্য সংখ্যা ১১ থেকে ১২ হাজারের মধ্যে। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসেবে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৭ হাজার থেকে সাড়ে ৮ হাজার মানুষ। আর পুলিশের তথ্য বলছে, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার মানুষ। অন্যদিকে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শুধু ২০১৮ সালে সারা দেশে ছোট-বড় মিলে প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুসারে, সারা দেশে ২০১৫ সালে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে ১৭ হাজার ৪৮৮টি, আর ২০১৬ সালে ঘটেছে ১৭ হাজার ১৭৩টি, ২০১৭ সালে ঘটেছে ১৮ হাজার ১০৫টি এবং ২০১৮ সালে ঘটেছে সবচেয়ে বেশি ১৯ হাজার ৬৪২টি। আর এসব অগ্নিকান্ডে মৃতু্য হয়েছে, ২০১৫ সালে ২৪২ জনের, ২০১৬ সালে ৮৮ জনের, ২০১৭ সালে ৪৫ জনের এবং গত বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে ১৩০ জনের। এক হিসেবে দেখা গেছে, গত ৫ বছরে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি গুনতে হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর সারা দেশে গড়ে ১৬ হাজার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে এবং গড়ে ২৩৩ জন মৃতু্যর শিকার হচ্ছেন। সব মৃতু্যই বেদনাদায়ক; কিন্তু এ ধরনের অপমৃতু্য মেনে নেয়া অত্যন্ত কঠিন। প্রত্যকটা হৃদয়বিদারক মর্মান্তিক ঘটনা সংঘঠিত হওয়ার পর পুরোদেশ শোকের গভীরতায় আচ্ছন্ন হয়; কিন্তু এটা আমাদের জাতীয় দুর্ভাগ্য যে এমন রোমহর্ষক ঘটনাগুলো আমাদের অনেকের কাছে নিতান্তই শোকের বিষয়, শিক্ষণীয় নয়। অতীতের উদাহরণগুলো থেকে শিক্ষালাভ করে আমরা একটু সচেতন হলেই অধিকাংশ সংঘটিত দুর্ঘটনা এড়াতে সক্ষম হতাম। তাই, অতীতের মর্মস্পর্শী ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারব ততক্ষণ পর্যন্ত এরকম ঘটনা অনবরত ঘটবে তা নিঃসংকোচে বলা যায়।