কোন দিকে মোড় নিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট?

ইসরাইল একদিকে হামাস, হিজবুলস্নাহ ও হুতিকে মোকাবিলা করছে, সেই সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর ও আমেরিকার অবারিতভাবে সমর্থন ক্রমহ্রাসমান। এমতাবস্থায় ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ বাঁধলে কতক্ষণ টিকতে পারবে? সেই সঙ্গে ইরান কতটা বিচক্ষণতার সঙ্গে আসন্ন যুদ্ধ ঠেকাতে পারে সেটাই এখন প্রশ্ন!

প্রকাশ | ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ০০:০০

আব্দুলস্নাহ আল হিমেল
সিরিয়ায় দামেস্কে ইরানের দূতাবাসে গত ১ই এপ্রিল ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামরায় ওজএঈ-এর তিন শীর্ষ ব্যক্তিসহ ৮ জন ইরানি কর্মকর্তা নিহত হয়। এতে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, সিরিয়া এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলে, এমন বর্বরতা কখনো মেনে নেওয়া হবে না। এ হামলার প্রতিবাদে ইসরাইলে পাল্টা হামলা করার চাপ অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিকভাবে বাড়তে থাকে তেহরানের ওপর। হামাসের ইসরাইল আক্রমণের পর থেকেই ইরান-ইসরাইলের মধ্যে উত্তাপ ক্রমান্বয়ে বাড়ছিল। গত নভেম্বরে ইসরাইল প্রশাসন- হামাস, হিজবুলস্নাহ, হুতিকে তিনপ্রান্তে মোকাবিলায় কূল-কিনারা করতে না পেরে বলে ঘোষণা দেয়, 'এ সবার অভিভাবক সাপের মাথা ইরানকে দেখে নেওয়া হবে।' তারই একটি বহিঃপ্রকাশ ছিল দূতাবাসে হামলা। এর জবাবে বহু হুশিয়ারি ও হুমকি এবং উত্তপ্ত বার্তা বিনিময়ের পর অবশেষে গত শনিবার রাতে ইসরাইলের আকাশসীমায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রবেশ করে, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আইরন ড্রোনকে মোকাবিলা করে আঘাত হানতে শুরু করে তেল আবিবসহ ইসরাইলের গুরুত্বপূর্ণ শহরের স্থাপনাগুলোতে এবং দু'টি বিমানবন্দরে। উলস্নখ্য, আক্রমণে মধ্যে ৩৭টি ত্রম্নুজ মিসাইল ও ৫০০ শতাধিকের অধিক ড্রোন ব্যবহৃত হয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ইসরাইল গোপন রেখেছে। তবে জানা যায়, আকাশ প্রতিরক্ষায় মিসাইলগুলো ঠেকাতে ১ বিলিয়নেরও বেশি ডলার ব্যয় হয়েছে এক রাতেই। এ প্রতিবাদী হামলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গণমানুষের কাছে হিরো বনে গেছে ইরান। ইউক্রেনে যুদ্ধ হেরে ধীরে ধীরে লেজ গুটিয়ে পালাতে থাকা আমেরিকা ও তাদের জোট, ইসরাইলকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অস্ত্র সহায়তা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য একটা যুদ্ধ বাঁধিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। তবে দীর্ঘ ৬ মাসের যুদ্ধে ও গাজায় স্থল অভিযানের পরও নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বদলে হামাসের হাতে পড়ে কুপেকাত ইসরাইলি বাহিনী ক্রমশ কাগুজে বাঘের মতো গুটিয়ে পড়ে পরাজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে লোহিতসাগরে হুতিদের বিরামহীন আঘাতে নৌপথে পতু হয়ে এবং ফিলিস্তিনের নিরপরাধ বেসামরিক মানুষ বিশেষ করে নারী ও শিশু হত্যার জন্য বিশ্বব্যাপী তীব্র নিন্দা ও তাদের কোম্পানিগুলো বয়কটের সম্মুখীন হয়েছে, যা অর্থনীতিতে ধস নামিয়ে এনেছে। এমতাবস্থায় যুদ্ধ আর বাড়ানোর দৌড় থেকে বিপরীত দিকে হাঁটা শুরু করেছে নেতানিয়াহু প্রশাসন। তাই আমেরিকা তাদের অস্ত্র ব্যবসার জন্য নতুন যুদ্ধের বাজার হিসেবে ইরানকে যুদ্ধে নামাতে চাইছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ই একমাত্র শক্তি যারা আমেরিকার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে পারার ক্ষমতা রাখে এবং তেলের খনিগুলোও আমেরিকার নিয়ন্ত্রণহীন, সেই সঙ্গে রাশিয়ার সুহৃদ বন্ধু। ইরানের সিরীয় দূতাবাসে হামলায় ইসরাইলকে যে জবাব দিয়েছে তা ছিল নামমাত্র ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ব্যবহার। শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বে ২০১৬ সালে সিরিয়ার শহর আলেপ্পোকে এমনভাবে ধ্বংস করেছিল ইরান যে বসবাসযোগ্য একটা উন্নত শহর থেকে বিরান ভূমিতে পরিণত করেছিল। হাজার হাজার মানুষকে অবারিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল, লাখ লাখ মানুষ বাস্তচূ্যত হয়েছিল। সময় গড়িয়েছে অস্ত্রগুলো আরও অত্যাধুনিক হয়েছে অথচ ইসরাইলে তার শতকরা ৫ ভাগ শক্তিও প্রয়োগ করেনি, যা ইঙ্গিত দেয় ইরান কখনো যুদ্ধে জড়াতে চায় না। জেনারেল কাশেম সুলেমানি হত্যাকান্ডের পর যেমনি আমেরিকার সেনাঘাটি আক্রমণের লোক দেখানো জবাব দিয়েছিল, ইসরাইলকে তেমনি নামমাত্র জবাব দিয়েছে। আক্রমণের আগেই ইরান তার মিত্র রাশিয়া ও তাদের জোটের দ্বারা সমর্থিত হয়েছে। পুতিন সর্তক করে বলেন, যদি ইরানে মার্কিনিরা কোনো হামলা চালায় রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে, যা বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিবে। সেই সঙ্গে ইরানের নিরাপত্তার জন্য নৌ-মহড়ার অজুহাতে ভূ-মধ্যসাগরে কিনজাল ক্ষেপণাস্ত্র ধারণকারী নৌ-বহর মোতায়েন করেছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসন ইসরাইলকে সমর্থন দিচ্ছে, আবার ইরানের সঙ্গে ঝামেলায় জড়াবে না বলছে। মার্কিন প্রশাসন ইরানে হামলার বৈধতার বদলে রাফাতে হামলার অনুমতি দিয়েছে যেখানে বাস্তুচূ্যত দেড় মিলিয়ন ফিলিস্তিনি অবস্থান করছে। ফলে এরা নিশ্চিত গণহত্যার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান তার পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর কাজক্রম সাময়িক বন্ধ রখেছে এবং আকাশকে নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে ইসরাইল যে কোনো মুহূর্তে আক্রমণ করতে পারে এমন ঘোষণা দিয়েছে। ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে বলে দাবি করে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো। ইস্পাহানসহ আর বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করেছে বলে জানায় ইরান। ইরান ইসরাইলকে ঘিরে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং উভয়েই সর্তক অবস্থানে রয়েছে। ইসরাইল একদিকে হামাস, হিজবুলস্নাহ ও হুতিকে মোকাবিলা করছে, সেই সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর ও আমেরিকার অবারিতভাবে সমর্থন ক্রমহ্রাসমান। এমতাবস্থায় ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ বাঁধলে কতক্ষণ টিকতে পারবে? সেই সঙ্গে ইরান কতটা বিচক্ষণতার সঙ্গে আসন্ন যুদ্ধ ঠেকাতে পারে সেটাই এখন প্রশ্ন! আব্দুলস্নাহ আল হিমেল : নবীন কলাম লেখক