ভোলার অপ্রীতিকর ঘটনা

দেশকে শান্তিময় এবং নিরাপদ রাখতে হলে ধর্মান্ধগোষ্ঠীর বিষয়ে সরকারকে যেমন আরও কঠোর হতে হবে, তেমনি সমগ্র দেশবাসীকেও ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

প্রকাশ | ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

আবু আফিয়া আহমদ
ফেসবুকে একটি বিভ্রান্তিকর পোস্টের সূত্র ধরে গতকাল রোববার (২০ অক্টোবর) ভোলার বোরহানউদ্দিনে ঘটে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক যুবকের বিচারের দাবিতে 'তৌহিদী জনতা'র ব্যানারে বিক্ষোভ থেকে পুলিশের সঙ্গে এলাকাবাসীর ব্যাপক সংঘর্ষ বাধে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ভোলা ইসু্যতে আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ধৈর্য ধারণ ও গুজবে কান না দিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একটি মিথ্যা অপপ্রচার বা গুজব কত সহজেই যে জনগণের কোনো কোনো অংশকে উত্তেজিত করে ভয়ঙ্কর কান্ড তথা লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে পারে তার অসংখ্য দৃষ্টান্ত আমাদের দেশেই রয়েছে। যেমন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার জেলার রামুতে হামলা চালিয়ে লুটপাটসহ ১২টি বৌদ্ধমন্দির ও ৩০টি বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে রসরাজ নামে এক মৎস্যজীবীর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ এনে লোকজনকে খেপিয়ে তুলে ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলা চালানো হয়। আমরা প্রায় দেখতে পাই এসব ধর্মীয় উগ্রবাদী ও স্বার্থান্বেষী মহল বিভিন্ন সময়ে মিথ্যা অপপ্রচার এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং সরকার ও প্রসাশনের ওপর পেশিশক্তি দেখিয়ে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করে থাকে। বিশেষ করে দেশে যখন কোনো ক্রান্তিকাল উপস্থিত হয় আবার যখন কোনো ইসু্য থাকে না তখন ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের লক্ষ্যে এরা কখনও ধর্ম অবমাননা বা আহমদিয়া ইসু্যসহ নানা ইসু্য সামনে এনে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। আসলে খতমে নবুয়ত বলুন আর তৌহিদী জনতা আর ঈমান রক্ষা কমিটি বা তাহফুজে খতমে নবুয়ত, যে নামেই তারা মাঠে নামে এরা মূলত জামায়াতে ইসলামেরই ভিন্নরূপ। এরা একেক সময় একেক নাম দিয়ে মাঠে নামে আর রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে। পাকিস্তানে যেমন ধর্মকে ব্যবহার করে দেশটাকে বারটা বাজিয়ে ছেড়েছে- ঠিক একইভাবে এ দেশকেও চাচ্ছে উগ্রধর্মান্ধদের কেন্দ্রে পরিণত করতে। ১৯৭১ সালে এ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমনভাবে জামায়াতিরা বিরোধিতা করেছে একই কায়দা এ দেশকে আবার পাকিস্তান বানানোর লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন সময় মাঠে নামে আর ভোলার ঘটনাটিও যে তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ীই হয়েছে তাও ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়। কেননা, ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, পুলিশের ওপরও তারা গুলি ছুড়ছে, পুলিশ মসজিদে আশ্রয় নিয়েও রক্ষা পায়নি। শান্তিপ্রিয় মুসলমান তো কখনও এ ধরনের কাজ করতে পারে না। 'তৌহিদী জনতার' কর্মকান্ডই প্রমাণ করেছে তারা কতটুকু শান্তিপ্রিয়। কয়েক বছর পূর্বে চট্টগ্রাম নগরীর লালখানবাজার এলাকায় তথাকথিত হেফাজতে ইসলামির নেতা মুফতি ইজাহারুল হক চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রসার ছাত্রাবাসে গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনার মধ্য দিয়ে জাতির সামনে স্পষ্ট হয়েছিল যে, ধর্মের নামে এদের কর্মকান্ড। মাদ্রাসায় বোমা তৈরির ঘটনা আমাদের দেশে নতুন নয়। আমরা জানি, বিগত সরকারের আমলে এ দেশে কত ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার এদিক থেকে অবশ্যই প্রশংসারযোগ্য, বর্তমান সরকারের আমলে পরিচালিত জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযান জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক নানা সংস্থার পক্ষ থেকে প্রশংসা ও সমর্থন লাভ করেছে। মাদ্রাসা হচ্ছে ধর্মীয় শিক্ষারপ্রতিষ্ঠান আর সেখানেই যদি জঙ্গি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে নামধারী লেবাসিদের কাছ থেকে জ্বালানো পোড়ানো এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ছাড়া কি বা আশা করা যায়। যারা ধর্মের নামে এসব গর্হিত কাজে লিপ্ত তারা কখনো শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারী হতে পারে না। এর পূর্বে আমরা দেখেছি, ধর্ম অবমাননার কথা বলে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা। ধর্মের নামে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কখনও ইসলাম সমর্থন করে না। আজ যারা বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের নামে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করছে এবং বড় ধরনের নাশকতার চিন্তাভাবনা করছে তাদের বলতে চাই, মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা কি জ্বালাও পোড়াও করে অর্জিত হবে, নাকি মহানবী (সা.)-এর উত্তম আদর্শ স্থাপন করার মাধ্যমে অর্জিত হবে? যেখানে পবিত্র কুরআনে আলস্নাহপাক স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, 'তিনিই তার রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য ধর্মসহ পাঠিয়েছেন, যেন তিনি সব ধর্মের ওপর একে বিজয়ী করে দেন, মুশরিকরা তা যতই অপছন্দ করুক' (সুরা তাওবা:৩২)। কে ইসলাম ধর্মকে পছন্দ করল বা অপছন্দ করল তা দেখার জন্য কাউকে আলস্নাহ মনোনীত করেননি। ইসলাম সত্য ধর্ম আর এই ধর্মকে সব ধর্মের ওপর বিজয়ী করার ঘোষণা স্বয়ং আলস্নাহতায়ালারই। এটা স্পষ্ট যে, ইসলাম ধর্মের আদেশ এবং নীতির মাহাত্ম্য বা পরমোৎকর্ষ ইতোমধ্যেই ক্রমশ স্বীকৃতি লাভ করে চলছে এবং সেদিন বেশি দূরে নয় যখন ইসলাম অন্যান্য সব ধর্মবিশ্বাসের ওপর বিজয় লাভ করবে এবং সেইসব ধর্মের অনুসারীরা দলে দলে ইসলামের শান্তির ছায়াতলে সমবেত হবে। অবশ্যই সবাই এই শান্তির ধর্মে আশ্রয় নেবে তবে তা জঙ্গি কার্যক্রমের মাধ্যমে নয়- তা হবে কুরআনের উন্নত শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে এবং ঐশী একক নেতৃত্বের সুবাদে। ইসলাম পরিপূর্ণ একটি ধর্ম। এই ধর্মের কোনো ক্ষতি করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। যেভাবে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে 'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত পরিপূর্ণ করলাম। আর আমি ইসলামকে তোমাদের জন্য ধর্মরূপে মনোনীত করলাম' (সুরা মায়েদা:৩)। ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব হলো, এটা প্রত্যেক মানুষকে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করে। এই স্বাধীনতা কেবল ধর্ম-বিশ্বাস লালন-পালন করার স্বাধীনতা নয় বরং ধর্ম না করার বা ধর্ম বর্জন করার স্বাধীনতাও এই ধর্মীয় স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কুরআনে আলস্নাহতায়ালা বলেছেন, 'তুমি বল, তোমার প্রতিপালক-প্রভুর পক্ষ থেকে পূর্ণ সত্য সমাগত, অতএব, যার ইচ্ছা সে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছা সে অস্বীকার করুক' (সুরা কাহাফ: ২৮ )। সত্য ও সুন্দর নিজ সত্তায় এত আকর্ষণীয় হয়ে থাকে যার কারণে মানুষ নিজে নিজেই এর দিকে আকৃষ্ট হয়। বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রশক্তি নিয়োগ করে সত্যকে সত্য আর সুন্দরকে সুন্দর ঘোষণা করানো অজ্ঞতার পরিচায়ক। যেমন সূর্যোদয়ই সূর্যের অস্তিত্বের প্রমাণ। এই নিয়ে গায়ের জোর খাটানোর বা বিতন্ডার অবকাশ নেই। সূর্যোদয় সত্ত্বেও কেউ যদি সূর্যের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তাকে বোকা বলা যেতে পারে কিন্তু তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কিছুই নেই। ঠিক তেমনি কে আলস্নাহকে মানলো বা মানলো না, কে ধর্ম করল বা করল না এটা নিয়ে এ জগতে বিচার বসানোর কোনো শিক্ষা ইসলাম ধর্মে নেই। বরং এর বিচার পরকালে আলস্নাহ নিজে করবেন বলে তার শেষ শরিয়ত গ্রন্থ আল কুরআনে বারবার জানিয়েছেন। এ স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে সমাজে আস্তিকও থাকবে, নাস্তিকও থাকবে। মুসলমানও থাকবে হিন্দুও থাকবে এবং অন্যান্য মতাবলম্বীরাও থাকবে। বর্তমান পৃথিবীতে হঠাৎ গজিয়ে উঠা যুদ্ধংদেহী জেহাদিদের উত্থানের পেছনে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীর-দর্শন কতটা ভূমিকা পালন করছে তা তলিয়ে দেখার যথেষ্ট অবকাশ আছে। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছে: 'লা ইকরাহা ফিদ্দীন' অর্থাৎ 'ধর্মের বিষয়ে কোনো ধরনের বল প্রয়োগ নাই' (সুরা বাকারাহ)। অপর দিকে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মওদুদী তার 'হাকিকাতে জেহাদ' নামক পুস্তিকায় বলেছেন, 'রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা ছাড়া নেকি বা পুণ্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না, আর মন্দ কাজ থেকে মানুষকে বিরতও রাখা যায় না। তাই এই উদ্দেশ্য সাধনে সব চেষ্টা-সংগ্রামের নাম প্রকৃত জেহাদ।' তাই আমরা বলতে পারি ভোলার নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে মূলত উগ্রধর্মান্ধগোষ্ঠীর মদদ রয়েছে। কেননা, তাদের দাবি আর খতমে নবুয়ত, হেফাজতে ইসলাম এবং তৌহিদী জনতরা দাবি একই, শুধুমাত্র ভিন্ন নামে মাঠে নেমেছে। এরা চায় শান্তিপূর্ণ এ দেশটাকে পাকিস্তানের মতো ব্যর্থ রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে। জামায়াতিরা যেমন ক্ষমতা দখল ও বলপ্রয়োগের ইসলামে বিশ্বাসী ঠিক তেমনি আফগানিস্তানের তালেবানরাও এই একই পথ অবলম্বন করেছিল। সমগ্র বিশ্বে ধিকৃত ও নিন্দিত এই তালেবানদের সখ্যতা ছিল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে। শেষে এটাই বলবো, দেশকে শান্তিময় এবং নিরাপদ রাখতে হলে ধর্মান্ধগোষ্ঠীর বিষয়ে সরকারকে যেমন আরও কঠোর হতে হবে, তেমনি সমগ্র দেশবাসীকেও ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আবু আফিয়া আহমদ: কলাম লেখক