জঙ্গিরা জামিন নিয়ে পলাতক

পলাতকদের মধ্যে অন্তত দুই ডজন জঙ্গি রয়েছে যারা সমরাস্ত্র পরিচালনাসহ শক্তিশালী বিস্ফোরক তৈরিতে পারদর্শী। দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে জঙ্গি সংগঠনের সাম্প্রতিক উত্থানের নেপথ্যে এসব দুর্ধর্ষ জঙ্গি কলকাঠি নাড়ছে। আবার কেউ কেউ কারাগারে আটক থেকেও তৎপরতা চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
জঙ্গিরা জামিন নিয়ে পলাতক

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় লাল কালিতে পাঁচ কলামব্যাপী শিরোনাম দেখে আঁতকে না উঠে পারি না। শিরোনামে অত্যাধিক গুরুত্বসহকারে লেখা আছে 'দুইশ' জঙ্গি লাপাত্তা আটকদের ৭২ শতাংশই জমিনে বেরিয়ে গেছে।

খবরটিতে বলা হয়েছে, সারা দেশে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের ৭২.৪০ শতাংশই জামিন নিয়ে বের হয়ে গেছে। কারাগারে আটক আছে মাত্র ২৭.৬০ শতাংশ। জামিনপ্রাপ্ত অন্তত দুই শতাধিক জঙ্গির হদিস পাচ্ছে না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পৌনে তিন বছরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক ৭৭৯ জন জঙ্গির মধ্যে ৫৬৪ জনই জামিনে বের হয়ে গেছে। বছরের পর বছর ঝুলে আছে প্রায় ৮০০ মামলা। আদালতে বিচারাধীন মামলা সংখ্যা ৫৫০। অজানা কারণে মন্থরগতিতে চলছে ২৫০ মামলার তদন্ত কাজ। আলোচ্য সময়ে এসব মামলায় আটক প্রায় চার হাজার জঙ্গি। এদের মধ্যে দুই শতাধিক জামিন নিয়ে আত্মগোপনে চলে গেছে। তিন শত জঙ্গি জামিন নিয়ে আর আদালতে হাজির হচ্ছে না।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জঙ্গিদের জামিন পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। গোয়েন্দা রিপোর্টে চিহ্নিত জঙ্গিদের অকালীন জামিন পাওয়া বন্ধ করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে উদ্যোগ নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এ বিষয়ে এখনই প্রশাসনিক বা আইনিব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। তদন্তে গাফিলতি ও বিচারে দীর্ঘসূত্রতায় মূলত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এসব মামলা আসামিদের যথাসময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করা হলে জঙ্গি হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে বলে গোয়েন্দা রিপোর্টে উলেস্নখ করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গিরা জামিন নিয়ে পলাতক হলেও তাদের জামিনদারদের বিরুদ্ধে নেই কার্যকর যথাযথ জবাবদিহিতা। তাদের কারও বিরুদ্ধেই আজ পর্যন্ত কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জঙ্গিরা নির্বিশেষ জামিন নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।

পলাতকদের মধ্যে অন্তত দুই ডজন জঙ্গি রয়েছে যারা সমরাস্ত্র পরিচালনাসহ শক্তিশালী বিস্ফোরক তৈরিতে পারদর্শী। দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে জঙ্গি সংগঠনের সাম্প্রতিক উত্থানের নেপথ্যে এসব দুর্ধর্ষ জঙ্গি কলকাঠি নাড়ছে। আবার কেউ কেউ কারাগারে আটক থেকেও তৎপরতা চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে চিরুনি অভিযান চালিয়েও জামিনে পলাতক জঙ্গিদের চিহ্নিত করতে পারছে না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। জামিনে মুক্ত এসব দুর্বৃত্ত কোথায় আছে সে বিষয়ের কোনো তথ্য নেই পুলিশ ও গোয়েন্দাদের কাছে।

এসব পলাতক জঙ্গিকে দ্রম্নত গ্রেপ্তার করা না গেলে দেশে নিরাপত্তা হুমকির আশঙ্কা থাকবে।

সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী বলেন, প্রচলিত আইনে জঙ্গিদের ঝুঁকির বিষয়টি সেভাবে কভার করে না। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে মামলা হয় অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে। এ বিষয়ে আইন সংশোধন করা জরুরি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষ আদালতের মাধ্যমে জঙ্গি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়। ওরা গ্রেপ্তার হয় জঙ্গি হিসেবে আর মামলা হয় অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে। এভাবে কোন জঙ্গিকে কতদিন আটকে রাখা যায়?

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্যান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গি দমন ও এসংক্রান্ত মামলা তদন্তে পুলিশের আন্তরিকতার অভাব নেই। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে সময় লাগার চার্জশিট দিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেরি হয়। তবে খুব বেশি দেরি করার সুযোগ নেই। প্রত্যেক মামলার তদন্তে সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। ওই সময়সীমার মধ্যে অনেক সময় প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা যায় না। আবার যথাযথ তথ্য প্রমাণ ছাড়া চার্জশিট দাখিল করলে জঙ্গিদের ছাড়া পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ত্রম্নটিহীন চার্জশিট দিতে সময় বেশি লাগলে আবার জবাবদিহিতার আওতা দিয়ে যেতে হয়।

জঙ্গিদের বিষয়ে কাজ করেন ঢাকা মহানগর আদালতের এমন একজন আইনজীবী বলেন, অনেক সময় সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না। সাক্ষী হাজিরের জন্য আদালত থেকে অজামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও পাঠানো হচ্ছে। তবুও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আদালতে সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হচ্ছে। জঙ্গিসংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রম্নত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ট্রাইবু্যনাল গঠন অত্যন্ত জরুরি। যে সব জঙ্গি জামিন নিয়ে পলাতক, সে সব মামলায় তাদের জামিনদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে। জামিনদারদের জবাবদিহিতার সৃষ্টি না হলে জঙ্গিদের জামিন নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা থামবে না।

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, জামিন নিয়ে যে সব জঙ্গি পালিয়ে গেছে তার অন্তত দুই শতাধিক জঙ্গির তালিকা তৈরি করেছে গোয়েন্দা সংস্থা। যারা পালিয়ে গেছে তাদের মধ্যে আছে আইএস দাবিদার ব্রিটিশ নাগরিক সামিউন রহমান ইবনে হামদান। ২০১৪ সালে ঢাকায় মুজাহিদ সংগ্রহ করতে এসে গ্রেপ্তার হয় সে। জামিনে ছাড়া পেয়ে সে লাপাত্তা।

এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে জামিন নিয়ে পলাতক দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হচ্ছে কাওছার হোসেন, কামাল উদ্দিন, আজমীর, গোলাম সরওয়ার, মুফতি আবদুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম, নূর ইসলাম, আমিনুল মুরসালিন, মহিবুল মুস্তাকিন, রফিকুল ইসলাম। সিরাজ ও মসিউর রহমান, তানভীর, তৌহিদুল, সাইদুল, সাইফুল, রেজাউল, নাঈম, জুম্মন, আমিনুল, জঙ্গি আবদুল আকরাম, জুনায়েদ রহমান, মানিক, মজিদ, সাজেদুর। ফারুক, শফিক, মিলন, কফিলউদ্দিন ওরফে রব মুন্সী, আজিবুল ইসলাম ওরফে আজিজুল, শাহান শাহ, হামিদুর রহমান, বজলুর রহমান, বাবর, শরিফ খাইরুল ইসলাম, ওয়ালিউলস্নাহ, হামি, জাকেরিয়া, সবুজ, নাদিম, ময়েজউদ্দিন, মহব্বত ওরফে তিতুমীর ওরফে নাহিদ।

র্

যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পরর্ যাবের হাতে গ্রেপ্তার ৫১২ সন্দেহভাজন জঙ্গির মধ্যে ৩০০ জনই জামিন পেয়েছে। এই ৩০০ জয়ের মধ্যে জামিন নিয়ে যাওয়ার অর্ধেকই এখন পলাতক। জঙ্গি সন্দেহে আটকের পর জামিনে থাকলে তাদের ওপর কতটা নজরদারি সম্ভব হচ্ছে? জামিন পাওয়া সন্দেহভাজনদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

দেখা যাচ্ছে যে পুলিশ,র্ যাব প্রভৃতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী 'সন্দেহভাজন' জঙ্গি ফারদেরকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়ে থাকে তাদের মধ্যকার একটি বড় অংশের জামিন পাওয়ার জঙ্গি দমনে একটি বড় সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। আবার জামিন দেওয়ার মালিক হলেও আদালতকে তো কিছু বলা যায় না- তবে গ্রেপ্তাররা পর জামিন দিলে স্বভাবতই যারা কষ্ট করে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানোর পর জামিন পেয়ে উধাও হয়ে গেল বা নতুন করে জঙ্গিপনা শুরু করলে নিশ্চিতই তা পুলিশের জঙ্গিবিরোধী অভিযানকে দুর্বল করে ফেলতে পারে।

এ ক্ষেত্রে আদালতেরও জবাব আছে। পুলিশ যদি 'সন্দেহভাজন' বলে ফরোয়ার্ডিংযে লিখে ৫৪ ধারার মতো ধারা দিয়ে জেলে পাঠান তাহলে সেই আসামিকে বেশিদিন আটকে রাখা আইনসিদ্ধ নয়। পুলিশের বর্ণনায়ও এজাতীয় বিষয়ে কিছু উলেস্নখ না করায় বিষয়টি অস্বচ্ছ থেকে যাচ্ছে। তবে সুনির্দিষ্টভাবে বলা চলে 'সন্দেহভাজন' জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করার সময় যদি তার হাতে অস্ত্র, গুলি, বিস্ফোরক এবং অন্যান্য গুরুতর কিছু পাওয়া না যায় কোনো কিছু যদি জব্দ (ঝরবমব) করা না হয় এবং ৫৪ ধারা জাতীয় ধারা উলেস্নখ করা হয়- তবে জামিনের এ সমস্যা থেকেই যাবে।

দ্রম্নত আইন মন্ত্রণালয়কে জঙ্গিদের বিচারের জন্য পৃথক কঠোর আইন প্রণয়ন এবং বিশেষ ট্রাইবু্যনালে তাদের বিচার করার ব্যবস্থা করার পক্ষে পুলিশ ওর্ যাব কর্তৃপক্ষ যে আবেদন জানিয়েছেন তা দ্রম্নত আমলে নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়কে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন ও বিশেষ ট্রাইবু্যনাল গঠনের পদক্ষেপ গ্রহণও জরুরি।

অন্যপক্ষের্ যাবপ্রধান যে উলেস্নখ করেছেন জামিনপ্রাপ্ত জঙ্গিদের প্রতি উপযুক্ত নজরদারি তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বাস্তবতায় বিবেচনায়র্ যাবপ্রধানের এই উক্তি সমর্থনযোগ্য নয়। তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেখা প্রয়োজন,র্ যাব-পুলিশ এমন কথা কেন বলছেন এবং তাদের কি কি সমস্যা আছে তাও জানা দরকার। যদি জনবলের অভাব থাকে তবে সেটা দ্রম্নত দূর করা এবং জামিনপ্রাপ্তদের নজরদারি যথাযথভাবে যাতে করতে পারে তার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করতে হবে। কারণ দেশের জনগণের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জঙ্গি দমন, জঙ্গি উৎখাত, জঙ্গি নির্মূলের অভিযানকে যেমন অব্যাহত রাখতে হবে, তেমনি তার পথে সব প্রতিবন্ধকতাকেও কার্যকরভাবে দ্রম্নত দূর করতে হবে। আমাদের গোয়েন্দা বাহিনীর সম্প্রসারণ, জঙ্গিবিরোধী অভিযানের প্রশিক্ষণ প্রভৃতির ব্যবস্থাও করতে হবে।

পুলিশকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার, বিরোধী রাজনীতি দমনে ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করে তাদের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জঙ্গি উত্থান বন্ধ প্রভৃতি কাজে বেশি বেশি করে নিয়োজিত করা প্রয়োজন।

জঙ্গিবাদ দেশের কোনো সমস্যা নয়- এমন করা বলে আত্মতৃপ্তি বিধান সর্বদা পরিত্যাজ্য। জঙ্গিবাদের প্রতি 'নো টলারেন্স'-এর কথা বলেও আশ্বস্ত থাকার কারণ নেই। প্রয়োজন তাদের সব গোপন আস্তানা, সব উৎসাহও প্রশ্রয়দাতা এবং তাদের সব আর্থিক ও অস্ত্রের উৎসব খুঁজে বের করা এবং তার বিরুদ্ধে নিরস্তর কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

জঙ্গি বাংলাদেশের কোথায় নেই-কোথায় আছে- তাও বুঝে ওঠা দুষ্কর কারণ পুলিশ বার্ যাব আজ কয়েকটি বছর ধরে বাংলাদেশের পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ, মধ্য-যেখানেই হাত দিয়েছে-অভিযান চালিয়েছে সেখানেই জঙ্গিদের সন্ধান পেয়েছে গ্রেপ্তারও করেছে। তাই বিষয়গুলোকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

জঙ্গি দমনে অন্যতম উলেস্নখযোগ্য বিষয় হলো- তাদের লালিত আদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই নিরন্তর লড়াই পরিচালনা করা। নইলে ওই আদর্শের নামে তাদের রিক্রুটিং, মানুষকে বিভ্রান্ত করা, বাহিনী গঠন করা, গোপন আস্তানা তৈরি করা, অর্থ সংগ্রহ করা সুযোগ ও ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকবে। তারা ইসলাম প্রতিষ্ঠাকে তাদের আদর্শ বলে প্রচার করে, বিশেষ ধরনের পোশাক-পরিচ্ছদ ব্যবহার, বিশেষ ধরনের বই-পুস্তক লাখে লাখে ছেপে বিলি করে- কখনো গোপনে কখনো প্রকাশ্যে। মাদ্রাসা-মসজিদগুলোকেও তেমন-শিক্ষণ প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করে। এমনকি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তাদের নজরের বাইরে নয়- তারা সর্বত্র বিরাজমান 'জেহাদি দাওয়াত' নিয়ে।

বাংলাদেশ এমন কর্মকান্ডের অন্যতম উপযুক্ত ক্ষেত্রে পরিণত হতে বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী মারফত 'বিসমিলস্নাহ' সংযোজন, জামায়াতে ইসলামী হেফাজতে ইসলামীসহ সব ধর্মাশ্রয়ী দলকে বৈধতা প্রদান এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংরক্ষণ। ভারতের সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি যেমন 'হিন্দুত্ববাদ' প্রতিষ্ঠা করার কথা সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে অধিষ্ঠিত থেকে বারবার উচ্চারণ করে থাকেন এবং ফলে সেখানে হিন্দু ধর্মীয় সন্ত্রাসী ও জঙ্গি সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ দৃশ্যমানভাবে রচিত হয়েছে। বাংলাদেশেও তেমনি ৭২ সংবিধানের ওই সব প্রতিক্রিয়াশীল সংশোধনী বর্তমান সরকার পাস করায়, এখানেও ইসলামী সন্ত্রাসীও জঙ্গি তৈরির আদর্শিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। এবং ইসলামের প্রতি (অপরাপর ধর্মের প্রতি নয়) এক ধরনের দুর্বলতা সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মহল থেকেও মাঝেমধ্যে প্রচারিত হয়। উচ্চারিত হয়। অথচ কোনো ধর্মই রাষ্ট্রের ধর্ম হতে পারে না- আবার কোনো রাষ্ট্রের ধর্ম আছে বলে প্রচার বা সংবিধান উলেস্নখ করলে সে দেশের সমাজ মানসে সাম্প্রদায়িকতা এবং ইসলাম ও জেহাদের নামে নানাবিধ সন্ত্রাস ও জঙ্গিপনার গড়ে ওঠার সুযোগ থাকবেই। হেফাজতে ইসলাম তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

এ প্রসঙ্গে 'দেশ রূপান্তর' নামক পত্রিকা গত ২ জানুয়ারি, ২০২০-এর সংখ্যায় 'হেফাজতের ৬২ মামলা থেকে রেহাই চায় পুলিশ' শিরোনামে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তা পাঠ করলে আমাদের বহু আলোচিত আইনের শাসন ও তার দাবির অসারত্ব কতটা ব্যাপক তা অনুমান বা উপলব্ধি করা যায়। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে-

রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘর্ষের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়ের করা মামলাগুলো নিয়ে বিপাকে পড়েছে পুলিশ। কারণ সাড়ে ছয় বছর আগের ওই আলোচিত ঘটনার পর ঢাকাসহ সাতটি জেলায় ৮৩টি মামলা হয়। সেগুলোর মধ্যে মাত্র একটির বিচার হয়েছে। তদন্ত শেষে ১৮টি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার পাশাপাশি দুটি মামলার ফাইনাল রিপোর্টও দিয়েছে পুলিশ। তবে বাকি ৬২টি মামলার তদন্ত কার্যক্রম ও থমকে আছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই ৬২ মামলার কোনোটিরই তদন্ত হচ্ছে না 'রাজনৈতিক কারণে'। এ নিয়ে পুলিশের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। মামলাগুলোর দ্রম্নত সুরাহা চাচ্ছে পুলিশ। এ ধরনের প্রস্তুতি সেরে পুলিশের হাই কম্যান্ড সরকারের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করেছে। তবে সেগুলোর ফাইনাল রিপোর্ট বা চার্জশিট দেওয়ার গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া যায়নি।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, মামলাগুলোর অনেক আসামি জামিনে আছেন। তবে সেগুলোর তদন্ত হচ্ছে না। এসব নিয়ে পুলিশের ভিতরে সমালোচনা হচ্ছে। পুলিশ চায় এগুলোর দ্রম্নত সুরাহা। সুরাহার জন্য পুলিশ সদর দপ্তর স্বরাষ্ট্র। মন্ত্রণালয়ে কয়েক দফা যোগাযোগ করেছে। তারা পুলিশকে অপেক্ষা করতে বলেছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এমনকি ঘটনার পর পরই জুনায়েদ বাবুনাগরিসহ (হেফাজতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা) শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এক পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ায় ঘটনায় বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদ, এমনকি আনোয়ার ও রফিকুল ইসলাম মিয়াকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালে কথিত নাস্তিক বলগারদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবিতে হঠাৎ সক্রিয় হয়ে উঠেছিল কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। ওই দাবি আদায়ে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকা নগরীর ছয়টি প্রবেশ পথ অবরোধ করে। ঢাকা ঘেরাও করে সরকারের পদত্যাগের দাবিতে। পদত্যাগ না করলে সরকার উচ্ছেদের ডাক দেবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে হেফাজত। একপর্যায়ে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয় এবং নানাস্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘাত সংঘর্ষেও লিপ্ত হয়। তারা নানাস্থানে যানবাহন ভাংচুর করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এসব ঘটনায় অনেকে হতাহতও হন। একপর্যায়ে গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে মতিঝিল থেকে তাদের তাড়িয়ে দেয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এই ঘটনাগুলোকেই কেন্দ্র করেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ৮৩টি মামলা করে পুলিশ এবং তার মধ্যে ৬২টি কেসের কোনো তদন্তই হয়নি গত সাড়ে ছয় বছরে।

এই বিষয়গুলো দেখার পর স্বভাবতই পুলিশ হেফাজতিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর চার্জশিট দিতে অত্যন্ত দ্বিধাগ্রস্ত।

আইনের শাসন না থাকলে জঙ্গি নির্মূল, সন্ত্রাসী নির্মূল কোনোটাই হবে না। বরং রাজনৈতিক কারণে হেফাজতের মতো উগ্র সাম্প্রদায়িক, সন্ত্রাসী ও জঙ্গি উৎপাদনকারী সংগঠনের প্রতি দুর্বলতা দেখালে তা রাষ্ট্রের এবং সরকারি দলের চরম দুর্বলতা ও অনৈতিকতা হিসেবেই সর্বত্র বিবেচিত হবে।

মুজিববর্ষে কামনা করব এ সব দুর্বলতার, দোদুল্যমানতার অবসান ঘটিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে একদিকে পঞ্চদল সংশোধনী বাতিল করে এবং অন্যদিকে জঙ্গি দমনের পথের সব প্রতিকূলতা এবং কঠোরভাবে আইন অনুযায়ী হেফাজতিদের বিরুদ্ধে মামলাগুলোর বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করে দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ দেশে পরিণত করে এবং আইনের শাসন চালু করে বঙ্গবন্ধু অনুসারে চলার দাবিকে যৌক্তিক বলে তুলে ধরা হোক।

রণেশ মৈত্র: সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে