দেশ কি লুটেরাদের খপ্পরে পড়েছে?

টাকা পাচারকারীদের আসকারা দেওয়ার সুযোগ নেই। টাকা পাচারের অবারিত সুযোগ দেশে দুর্নীতি, অবৈধ উপার্জন উৎসাহিত করছে। একটি শ্রেণি লুটের টাকা পাচার করে বিদেশে অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়ছে, পাচারকৃত টাকায় বিভিন্ন দেশ সমৃদ্ধ হচ্ছে- এটি চলতে দেওয়া যায় না।
দেশ কি লুটেরাদের খপ্পরে পড়েছে?

ক্ষমতাসীন আওয়ামী জোটের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি গত ২৯ ফেব্রম্নয়ারি রাজশাহীতে বলেছেন, ' যারা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে তাদের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে। তাহলে অনেক পরিচিত মুখও দেখা যাবে। যত টাকা পাকিস্তানিরা নিয়ে গেছে, তার চেয়েও বেশি টাকা এই ক'বছরে পাচার হয়ে গেছে। ২০১৪ সালে এক বছরে ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। আমি বলি, আজকে এ টাকার পরিমাণ ৫ লাখ হাজার কোটি টাকার ওপরে (১.০৩.২০২০ নয়াদিগন্ত)।' পাকিস্তান আমলের ২৩ বছর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের তথা আজকের বাংলাদেশের বাঙালিরা এ দেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের টাকা পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করেছে। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে যদি একথা শুনতে হয় যত টাকা পাকিস্তানিরা নিয়ে গেছে তার চেয়ে বেশি টাকা এই ক'বছরে দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে তাহলে পাকিস্তানিদের চেয়েও ভয়ঙ্কর লুটেরাগোষ্ঠীর খপ্পরে দেশ পড়ে গেছে- এমন সন্দেহ পোষণের অবকাশ থাকে।

দেশ থেকে টাকা পাচার কারা করছে? দেশে এখন ভিন জাতির শাসন-শোষণ নেই। পশ্চিম পাকিস্তানিরা ২৩ বছরে যে পরিমাণ টাকা এ দেশ থেকে পাচার করেছে তার থেকে বেশি টাকা মাত্র কয়েক বছরে যারা পাচার করেছে তারা এ দেশেরই সন্তান। পশ্চিম পাকিস্তানিরা ভিন জনগোষ্ঠী, তাদের কাছে পূর্ব পাকিস্তান ছিল পরদেশ স্বরূপ। পূর্ব পাকিস্তানকে পরদেশ গণ্য করে পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানে অর্থনৈতিক শোষণ চালিয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানের পণ্য রপ্তানি করে অর্জিত আয় পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করেছে। পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাছে পূর্ব পাকিস্তান স্বদেশ ছিল না। পূর্ব পাকিস্তান থেকে টাকা পাচার করে পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাদের স্বদেশ পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়েছে। ভিন জাতি বা ভিন দেশিরা এটাই করে। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় বিভিন্ন জাতি বিভিন্ন সময়ে পরদেশ লুণ্ঠন করে লুণ্ঠিত অর্থ-সম্পদ নিজ দেশে পাচার করেছে, পাচার করা অর্থ-সম্পদ নিজ দেশ সমৃদ্ধ করতে ব্যবহার করেছে। ফরাসি, ইংরেজ, পর্তুগিজরা বিভিন্ন দেশ লুণ্ঠন করে অর্থ-সম্পদ নিজ দেশে নিয়ে গেছে, লুণ্ঠিত অর্থ-সম্পদ দিয়ে নিজ দেশ সমৃদ্ধ করেছে। বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের বর্তমান প্রেক্ষাপট আর অতীতের প্রেক্ষাপটের মধ্যে পার্থক্য হলো অতীতে ভিন জাতি এ দেশ থেকে অর্থ পাচার করছে, বর্তমানে 'দেশ মাতার সন্তানরা' বিদেশে অর্থ পাচার করছে। নিজ দেশ লুণ্ঠন করে এ দেশের একটি শ্রেণি কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়ছে, পাচারকৃত অর্থ সুইস ব্যাংকসহ বিদেশি ব্যাংকগুলোতে জমা করছে চোখের সামনেই। পানামা পেপার্স, প্যারাডাইস পেপার্স, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিপুল অঙ্কের টাকা পাচার, পাচারকৃত টাকা বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ, সুইস ব্যাংকসহ বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে গচ্ছিত রাখার তথ্য বহুবার বেরিয়েছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে সিংহভাগ টাকা পাচার হয়। বাংলাদেশে বছরে যত টাকা কর আদায় হয় তার ৩৬ শতাংশের সমান টাকা বিদেশে পাচার হয়। বাংলাদেশ থেকে বৈধ পথে বিদেশে টাকা পাঠানোর সুযোগ নেই। আমদানির ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং, রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিং, বেআইনি পন্থা হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাচার ওপেনসিক্রেট।

আইন অনুযায়ী দেশ থেকে টাকা পাচার গুরুতর অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও নির্বিঘ্নেই কাজটি হচ্ছে। নির্দ্বিধায় বলা যায়, এ অপরাধ রাখ-ঢাক না রেখে সংঘটিত হচ্ছে সরকারের নমনীয়তায়। অর্থমন্ত্রী থাকাকালে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, 'দেশের উন্নতি হয়েছে। টাকা বেড়েছে। সে কারণে পাচার হচ্ছে। এটা উন্নতির সার্টিফিকেট (১৬.৪. ২০১৬ যুগান্তর)।' দেশে 'টাকা বাড়ছে' রাখার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না তাই টাকা বিদেশে পাচার ছাড়া উপায় নেই- এমনটাই মনে হয় আবুল মাল আবদুল মুহিতের কথায়। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে দেশের মানুষ অবগত হয়েছে ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে; দুর্নীতি, অবৈধ ব্যবসার টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। টাকা পাচারের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থের বড় অংশ ঘুষ-দুর্নীতি, অবৈধ কারবার, ট্যাক্স ফাঁকির মাধ্যমে আয় করা। আমদানির এলসি খুলে পণ্যের মূল্য পরিশোধ করার পরও পণ্য দেশে না এনে, যে পণ্যের মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে সে পণ্য না এনে কম দামি পণ্য এনে, মূল্য পরিশোধ করা পণ্যের বদলে বালু, পরিত্যক্ত লোহা-লক্কর এনে, রপ্তানি পণ্যের টাকা দেশে না এনে টাকা পাচারের তথ্য সংবাদ মাধ্যমে প্রায়ই পাওয়া যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গেস্নাবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ১৫১ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা) পাচার হয়েছে। গত ৭ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৫ হাজার ২৭০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা)। এ অর্থ চলতি বছরের (২০১৯-২০২০) জাতীয় বাজেটের প্রায় সমান।

বাংলাদেশের অর্থনীতি খুব বড় নয়। বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশ থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে- বন্ধের কার্যকর উদ্যোগ নেই। পশ্চিম পাকিস্তানিরা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান থেকে টাকা নিজেদের দেশে নিয়েছে অন্য দেশে নেয়নি, পক্ষান্তরে এ দেশের একটি গোষ্ঠী নিজ দেশ থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। এতে বিদেশি লুটেরারাও লজ্জা পাওয়ার কথা। অনেকেরই অভিমত, সরকার টাকা পাচারকারীদের প্রতি নমনীয়তা দেখিয়ে প্রকারান্তরে টাকা পাচার উৎসাহিত করছে। বাংলাদেশ দরিদ্র জনবহুল দেশ। এমন দেশের একটি শ্রেণি নির্বিঘ্নে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করে বিনিয়োগ করছে, বিদেশের মাটিতে বিলাসবহুল জীবনযাপন নিশ্চিত করছে। টাকা পাচার বন্ধে কঠোর না হয়ে সরকার দর্শকের মতো কেন দেখছে তা বোধগম্য নয়। পশ্চিম পাকিস্তানিদের পূর্ব পাকিস্তান থেকে টাকা পাচারের বিরুদ্ধে ২৩ বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে এ দেশের মানুষ। পাকিস্তানি শাসনামলের ২৩ বছর বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিল। আজকে দুর্ভাগ্য এটাই যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি টাকা পাচার হচ্ছে যখন-তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। সরকারে থাকাবস্থায় আওয়ামী লীগ কোনো দায়বদ্ধতা থেকে টাকা পাচারকারীদের প্রতি নমনীয়তা দেখাতে হচ্ছে তা জানার কৌতূহল স্বাভাবিকভাবেই জনমনে রয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হওয়ার বড় কারণ ঋণের টাকা বিনিয়োগ না করে বিদেশে পাচার। বাংলাদেশি মুদ্রায় আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুযোগ নেই। বিদেশে বাংলাদেশি মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ না থাকায় টাকা পাচার করা হয় বৈদেশিক মুদ্রায়। বেশির ভাগ টাকাই পাচার হয় মার্কিন মুদ্রা ডলারে। টাকা পাচারের জন্য পাচারকারীরা স্থানীয় বাজার থেকে ব্যাপক মাত্রায় মার্কিন ডলার কিনতে হয়। এ কারণে স্থানীয় বাজারে ডলারের সংকট ও মূল্য বৃদ্ধির কথা প্রায়ই শোনা যায়। স্থানীয় বাজারে ডলার সংকট ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব বিভিন্ন ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে। দেশ থেকে টাকা পাচারের বহুমাত্রিক ক্ষতি দেশ-জাতির ঘাড়ে বর্তাচ্ছে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সম্প্রতি বলেছেন, 'অর্থপাচারে অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে'।

টাকা পাচারকারীদের আসকারা দেওয়ার সুযোগ নেই। টাকা পাচারের অবারিত সুযোগ দেশে দুর্নীতি, অবৈধ উপার্জন উৎসাহিত করছে। একটি শ্রেণি লুটের টাকা পাচার করে বিদেশে অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়ছে, পাচারকৃত টাকায় বিভিন্ন দেশ সমৃদ্ধ হচ্ছে- এটি চলতে দেওয়া যায় না।

এ দেশের প্রায় সোয়া কোটি মানুষ বিভিন্ন দেশে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠায়। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার প্রবাসী আয়ের কারণেই সমৃদ্ধ। প্রবাসে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে একটি শ্রেণি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার সমৃদ্ধ করছে, আরেকটি শ্রেণি দেশে থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় টাকা পাচার করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার উজাড় করছে- এটা হতে পারে না। টাকা পাচার বন্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে জাতীয় স্বার্থে। পাকিস্তানি শাসনামলে যে পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে তার চেয়ে বেশি পরিমাণ টাকা কয়েক বছরে পাচারের অভিযোগ ক্ষমতাসীন জোটের নেতার কাছ থেকে এসেছে। টাকা পাচার কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। টাকা পাচার বন্ধ, টাকা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাগ্রহণ, পাচারকৃত অর্থ দ্রম্নত দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যকর ব্যবস্থা-পদক্ষেপ সরকারের কাছ থেকে আশা করে দেশের মানুষ। ক্ষমতাসীন জোটের শীর্ষ নেতাদের অন্যতম বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। এ নেতার 'যত টাকা পাকিস্তানিরা নিয়ে গেছে তার চেয়েও বেশি টাকা এ ক'বছরে পাচার হয়ে গেছে ' মন্তব্যের প্রেক্ষিতে স্বাধীন বাংলাদেশ পাকিস্তানি লুটেরাদের চেয়েও ভয়ঙ্কর লুটেরাদের খপ্পরে পড়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের উদ্রেক করেছে জনমনে।

জহির চৌধুরী: কলাম লেখক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে