দর্শক নয়, লক্ষ্য শুধুই পুরস্কার

দর্শক নয়, লক্ষ্য শুধুই পুরস্কার
অমিতাভ রেজা পরিচালিত 'রিকশা গার্ল' চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে নভেরা চৌধুরী

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ও প্রযুক্তির কল্যাণে অনেকটাই উল্টোস্রোতে ভাসছে ঢাকাই সিনেমা। দর্শকের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে এখন বিকল্প পথ বেছে নিয়েছেন এখনকার চলচ্চিত্র নির্মাতারা। সিনেমা বানানোর আগেই কিংবা চিত্রনাট্য তৈরির আগেই পুরস্কারকে টার্গেট করে সিনেমা বানানোর ভাবনায় যাচ্ছেন তারা। আর এ বিষয়টি দেখা যাচ্ছে, দর্শক সিনেমা হল বিমুখ হয়ে পড়ার পর থেকেই। বিশেষ করে দর্শক একটানা পোশাকি-ফ্যান্টাসি ধারার একঘেয়ে ক্লান্তিকর সিনেমা দেখে বিরক্ত হয়ে পড়ে। তখন থেকে কিছু তরুণ নির্মাতা অফ ট্র্যাকের সিনেমা নির্মাণে এগিয়ে আসেন।

এক সময় এ তালিকায় গুটিকয়েক নির্মাতার নাম ছিল; যাদের সিনেমা দর্শকের কাছে সমাদৃত হওয়ার পাশাপাশি সুধীমহল ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবেও সুনাম অর্জন করত। সে সঙ্গে পুরস্কারও অর্জন করত সেসব সিনেমা। কিন্তু হাল সময়ের নির্মাতারা যেন স্রোতের একেবারেই উল্টো পথে হাঁটছেন। দর্শক নয়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসব এবং সেখান থেকে পুরস্কার বাগিয়ে আনাই যেন একমাত্র লক্ষ্য হয়ে গেছে তাদের। বর্তমান সময়ের অনেক পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কেবলমাত্র কান কিংবা বিভিন্ন দেশে প্রদর্শনের জন্যই তারা সিনেমা বানাচ্ছেন। অনেক সিনেমাই আছে, যেগুলোকে ছাড়পত্র দিতে আপত্তি জানিয়ে আটকে রেখেছে সেন্সরবোর্ড। আবার কিছু সিনেমা এখনও সেন্সরবোর্ডে জমা দেওয়া এমনকি বাংলাদেশে এখনও মুক্তিই পায়নি, সেগুলোও বিদেশের বিভিন্ন উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে। এসব সিনেমা নিয়ে মৃতু্যর কিছুদিন আগে নায়করাজ রাজ্জাক এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, 'যে সিনেমা দর্শক দেখে না, সে সিনেমা উৎসবে গেলেই কী, আর অস্কার পেলেই কী।'

আবার এ বিষয়ে ভিন্নমতও পোষণ করেছেন অনেকে। বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা গাজী রাকায়েতের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি অনেকটা বিরক্ত হয়ে বলেন,

''দর্শক যা চায় আমি কি তাই বানাব? দর্শক আমাকে আগুনে ঝাঁপ দিতে বললে আমি কি আগুনে ঝাঁপ দেব? সারা বিশ্বেই সিনেমা তিনটি ধারায় বানানো হয়। এক শিক্ষামূলক, দুই বাণিজ্যিক আর বিনোদনমূলক। আপনি চাইলে এর যে কোনো ধারাতেই সিনেমা বানাতে পারেন। এখন আপনি কি দর্শকের রুচির পরিবর্তন করবেন, শিক্ষার পরিবর্তন করবেন নাকি দর্শক যা চায় তাই দেবেন? ইরানে এক সময়ে কমার্শিয়াল সিনেমা হতো, তাদের সিনেমায় গান ছিল আজকে ওদের সিনেমা বিশ্বের প্রেক্ষাপটে কোথায় দাঁড়িয়ে গেছে? ওদের ছবি কি দর্শক নিচ্ছে না? ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড অব ইন্ডিয়া তো শুরু থেকেই আছে। জাতি গঠনে একটি চরিত্রের ভূমিকা আছে, সেই ছবিগুলো কি? আগে আমাদের যে ছবিগুলো হয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সে ছবিগুলোর মান কোন পর্যায়ের? 'মৃত্তিকা মায়া' যদি এক কোটি টাকার হতো এবং দশ কোটি টাকা ব্যবসা হতো তাহলে সবাই 'মৃত্তিকা মায়া'র মতো সিনেমা বানাতো কিনা বলেন? তাহলে কমার্শিয়াল কথাটি আপেক্ষিক। কিন্তু যে দেশের একটা বেসিক ডেভেলপমেন্টই তৈরি হয়নি সেখানে দর্শক হবে কি হবে না বা দর্শক যা চায় তাইতো আমি করতে পারি না। অনুদানের টাকায় তো দুটো ছবিও বানানো যায়। ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, অনুদান এগুলো ভিন্ন জিনিস। কথা হচ্ছে, ছবির মান কে নির্ধারণ করবে, দর্শক? রবীন্দ্রনাথের বিচার হবে কিসের ওপরে? জনপ্রিয় হলেই ছবি হবে সেটাও ঠিক নয়। আর জীবনঘনিষ্ঠ সিনেমা বানালেই পুরস্কৃত হবে সেটাও ঠিক নয়। এখন কথা হচ্ছে, আমরা চলচ্চিত্রকে একটা স্ট্যান্ডার্ডে নিয়ে যাব আর আপনারা কতটা নামাবেন সেটা আপনাদের বিষয়।''

গত দু'দশকে এমন কিছু উৎসবকেন্দ্রিক অফ ট্র্যাকের সিনেমা হয়েছে, যেগুলো কোনো পুরস্কার পাওয়ার পরও দর্শক হয়নি বা হচ্ছে না। তার মানে তাদেরও কি আগ্রহ নেই প্রেক্ষাগৃহে দর্শক আবার আগের মতো ভিড় করুক? এই ধারার প্রথম পরিচালক হিসেবে আলমগীর কবিরকে বিবেচনা করা যায়। তবে তার সিনেমা কিছুটা হলেও দর্শক বিনোদনমুখী ছিল। দর্শকের ব্যাপারে নির্মোহ এরকম সিনেমা বলতে গেলে তারেক মাসুদের হাত ধরেই শুরু হয়। সম্পূর্ণ পুরস্কারমুখী সিনেমা বানানো নির্মাতার মধ্যে আরও যারা আছেন, তানভীর মোক্কাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, গাজী রাকায়েত, আবু সাইয়ীদ, অমিতাভ রেজা চৌধুরী, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী অন্যতম।

এ দেশে শিক্ষামূলক ও জীবনঘনিষ্ঠ সুস্থ বিনোদন ধারার সিনেমা সব সময়েই ছিল। জীবনঘনিষ্ঠ সিনেমা যারা বানিয়েছেন সুভাষ দত্ত, নারায়ণ ঘোষ মিতা, মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, সত্য সাহা, আমজাদ হোসেন, চাষী নজরুল ইসলাম, এ জে মিন্টু, কামাল আহমেদ, আলমগীর কবির, শেখ নিয়ামত আলী, মসিহউদ্দিন শাকের, আবদুলস্নাহ আল মামুন, সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী, বুলবুল আহমেদ, কাজী হায়াৎ, কোহিনুর আক্তার সুচন্দা, বাদল রহমান, আখতারুজ্জামান, হুমায়ূন আহমেদ, মোরশেদুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, গিয়াস উদ্দিন সেলিম অন্যতম। যৌথ প্রযোজনায় হওয়া সিনেমার মধ্যে রয়েছে ঋত্ত্বিক ঘটকের 'তিতাশ একটি নদীর নাম', গৌতম ঘোষের 'পদ্মা নদীর মাঝি' অন্যতম। তাদের সিনেমা দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সময়ে পুরস্কৃতও হয়েছে। আবার অনেক জীবনঘনিষ্ঠ ভালো সিনেমাও আছে যেগুলো পুরস্কৃত হয়নি। কিন্তু তারপরও তারা কখনোই একমাত্র 'পুরস্কার'মুখী হয়ে সিনেমা বানাননি। একটা উৎসবমুখর দর্শকও ছিল তাদের লক্ষ্য।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে